বৃষ্টির অভাবে আমন ও খরিফ চাষ মার খেয়েছে। এ বার রোদের ঝাঁঝে বাঁকুড়ায় গ্রীষ্মকালীন শাক-সব্জির খেতও শুকোতে বসেছে।
গত অগস্ট মাস থেকে এই জেলার মাটি ভারী বৃষ্টির স্বাদ পায়নি। জমির রসও তাই শুকিয়ে গিয়েছে। পুকুর, নদী খাল-বিলের জলও প্রায় শুকিয়ে যাওয়ায় সেচও কার্যত বন্ধ। এ বার এপ্রিলের গোড়া থেকেই পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে ব্যাট করতে থাকায় বোরো চাষে তাই ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তীব্র দাবদাহে শাক-সব্জি জমিতেই শুকিয়ে মরছে।
এই জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে চাষিদের কাছ থেকে খবর আসছে, জলের অভাবে শসা, করলা, টম্যাটো, বরবটি, ঝিঙে, উচ্ছে, কুমড়ো, লাউ, বেগুন গাছ ও বিভিন্ন শাক ঝলসে গিয়েছে। পানের বরজও শুকিয়ে নষ্ট হতে বসেছে। এতে মাথায় হাত পড়েছে বাঁকুড়া জেলার চাষিদের।
জেলা কৃষি দফতর ক্ষতির কথা মেনে নিলেও ক্ষতির পরিমাণ এখনও জানতে পারেনি। বাঁকুড়ার উপ-কৃষি অধিকর্তা আশিসকুমার বেরা বৃহস্পতিবার বলেন, “অনাবৃষ্টির জন্য ফসলের ক্ষতি তো আগেই হয়েছে। এ বার তাপ মাত্রাছাড়া বেড়ে যাওয়ায় গ্রীষ্মকালীন শাক-সব্জি থেকে পানের বরজ— সব কিছুর ক্ষতি শুরু হয়েছে। শসা, কুমড়ো, লাউ, করলা, উচ্ছে, ঝিঙে, লঙ্কা, ঢ্যাঁড়শ থেকে নানা রকমের লতানে ও ছোট গাছের পাতা রোদের তেজে ঝলসে গিয়েছে। বহু ফসল নষ্ট হচ্ছে।’’
উপ-কৃষি অধিকর্তা জানিয়েছেন, বাঁকুড়া ২, ওন্দা, সিমলাপাল, তালড্যাংরা, বিষ্ণুপুর, জয়পুর, কোতুলপুর, পাত্রসায়র, সোনামুখী ও বড়জোড়া ব্লকের বেশ কিছু মৌজায় শাক-সব্জির চাষাবাদ ভালই হয়। কিন্তু এ বার ওই সব ব্লকে জলের অভাবে বহু জমিই শুকিয়ে গিয়েছে। যে সব এলাকার চাষিরা অনেক কষ্টে জমিতে জলসেচের ব্যবস্থা করে ফসল ফলিয়েছেন, তাঁদের জমির ফসলও লাগাতার তাপপ্রবাহের জেরে নষ্ট হয়েছে। প্রতিটি ব্লক থেকেই ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্ট চেয়ে পাঠানো হয়েছে। সেই রিপোর্ট পেলেই ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে।
বাঁকুড়া ২ ব্লকের পুরন্দরপুর অঞ্চলের ধর্মদাসপুর গ্রামের চাষি গুরুপদ ঘোষ এ দিন দুপুরে আসনবনি এলাকায় নিজের পানের বরজ, শসা ও বেগুন গাছের জমিতে দাঁড়িয়ে ফসল নষ্টের জন্য হা-হুতাশ করছিলেন। গুরুপদবাবুর আক্ষেপ, “বৃষ্টির অভাবে গত বছর আমন ধান চাষ করে লোকসান হয়েছে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য লোকের কাছ থেকে টাকা ধার করে বিঘে খানেক জমিতে শসা, বেগুন চারা লাগিয়েছি। পাশেই পানের বরজ করেছি। প্রায় এক কিলোমিটার দূরের গন্ধেশ্বরী নদী থেকে পাম্প চালিয়ে, বাঁকে করে জল বয়ে নিয়ে এসে চারা গাছ বাঁচিয়ে রেখেছি। কিন্তু রোদের তেজে অধিকাংশ গাছের চারা, পানের বরজ ঝলসে গিয়েছে। ৩০-৪০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়ে গেল।’’ এখন মহাজনের দেনা কী ভাবে শোধ করবেন, সেই ভাবনায় তিনি আকূল।
ওই গ্রামের চাষি শুভেন্দু মণ্ডল, চিত্তরঞ্জন ঘোষ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “এলাকায় সেচের সুবিধা নেই। অনেক কষ্টে নেহাত জীবিকার তাগিদে এখনও আমরা চাষাবাদ করে পেট চালাচ্ছি। একে বৃষ্টি না থাকায় ধান, আলু চাষ মার খেল। এ বার প্রখর তাপে জমিতে উৎপন্ন ফসলের দফারফা হয়ে গিয়েছে। কুমড়ো, লাউ, ঝিঙে, শসা থেকে পুঁই শাক গাছও ঝলসে গিয়েছে। এই ক্ষতি কী ভাবে সামাল দেব?’’
একই আক্ষেপ বিষ্ণুপুরের মড়ার গ্রামের চাষি হামিদ গাজীর কথাতেও। তিনি এক বিঘা জমিতে আইআর ৩৬ প্রজাতির ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু তীব্র দহনে জমির অধিকাংশ গাছই ঝলসে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। টাকা ও পরিশ্রম সবই মাঠে মারা গেল বলে তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন। বাঁকাদহ গ্রামের চাষি বিশ্বনাথ মণ্ডল বলেন, “বিঘেখানেক জমিতে তিল লাগিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম কম খরচে লাভের মুখ দেখব। কিন্তু জল নেই, রোদের তাপে সব ঝলসে পুড়ে গিয়েছে। লাভ তো দূরের কথা, খরচটুকুও উঠবে না।”
তীব্র দাবদাহ থেকে বাঁচতে জেলার মানুষ এখন চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে। অঝোরে ঝরুক বৃষ্টি। হোক কালবৈশাখী। কায়মনোবাক্যে সকলের প্রার্থনা এখন ওটাই।