নিজে শিক্ষিত হয়েছেন। এ বার সেই শিক্ষার আলোকে গ্রামে ছড়িয়ে দিতে চাইছেন। কারণ, মহম্মদবাজার ব্লকের ডেউচা পঞ্চায়েতের আদিবাসী প্রধান নবগ্রামে শিক্ষিতের হার বেশ কম। তাই গ্রামের ছোট পড়ুয়াদের জন্য পাঠশালা খুলেছেন গ্রামেরই যুবক মিঠুন মুর্মু।
মিঠুনের দাবি, ২০১৩ সালে তিনিই প্রথম ওই গ্রাম থেকে মাধ্যমিক পাস করে। এখন তিনি সংস্কৃত নিয়ে বিশ্বভারতীতে পড়াশোনা করছেন। পাশাপাশি, বিএডও শেষ করেছেন। তিনি জানান, গ্রামে পড়াশোনার চল নেই বললেই চলে। মিঠুনের মতে, এর একটা কারণ গ্রামবাসীর দারিদ্র। আর একটা কারণ পড়াশোনা নিয়ে সচেতনতার অভাব। তাই তিনি ছোটদের পড়াতে শুরু করেছেন।
গ্রামের ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কখন কারও উঠোনে, কখনও গ্রাম সংলগ্ন শালবনে গাছের ছায়ায় চলে পড়াশোনা। মিঠুন জানান, প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৪০ জন এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ২০ জনকে প্রতি দিন সকাল ও বিকেলে পড়তে আসছে।
পড়ুয়া পিছু মাসিক ১০০ টাকা পারিশ্রমিক ঠিক করেছেন মিঠুন। কিন্তু গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই অধিকাংশ পড়ুয়াই বিনা পারিশ্রমিকে পড়াশোনা করেন বলে দাবি মিঠুনের। যেটুকু পারিশ্রমিক মেলে তা দিয়ে পাঠশালার জন্য চক, ডাস্টার, বোর্ডের মতো পড়াশোনার সামগ্রী কেনা হয়।
বর্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে। পড়াশোনায় যাতে অসুবিধা না হয় তাই গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় একটি খড়ের চালা বানানো হয়েছে। বৃষ্টি এলে সেখানে বসেই পড়াশোনা করে ছেলে-মেয়েরা।
মিঠুন বলেন, ‘‘আমার গ্রামের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার আঙিনায় আনতে এই উদ্যোগ। বাংলা ও সাঁওতালি ভাষা মিলিয়ে পড়াশোনা করানো হয়। এতে ওদের বুঝতে সুবিধা হয়। ছোটদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে।’’
স্থানীয় বাসিন্দা শিবরাম সরেন, সুনীল মারান্ডি, সুকল সরেন ও ভূষণ হাঁসদারা বলেন, ‘‘আমরা পড়াশোনা করতে পারিনি। সারা দিন সংসার চালানোর তাগিদে ছেলে-মেয়েদের দিকে নজর দিতে পারি না। দারিদ্রের চাপে ছেলে-মেয়েরা একটু বড় হলেই কাজে লেগে পরে। মিঠুন আমাদের গ্রামের গর্ব। সে পড়াশোনা করে আজ আমাদের ছেলে-মেয়েদের পড়াচ্ছে। এতে আমরা খুব খুশি।’’
গ্রামের কাছেই রয়েছে রায়পুর সিবি বিদ্যালয়। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পূর্ণচন্দ্র বাদ্যকর বলেন, ‘‘এটা খুবই ভাল উদ্যোগ। ওই এলাকার আদিবাসী ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা থেকে সরে যাচ্ছিল। মিঠুন উদ্যোগী হওয়ায় ছোটদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। বাড়ির অভিভাবকদের কাজটাই মিঠুন করছে।’’
পঞ্চায়েতের প্রধান বনলতা সাহা বলেন, ‘‘আমরা মিঠুনকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা চাই প্রতিটি জায়গাতেই মিঠুনের মতো শিক্ষিত যুবকেরা এগিয়ে আসুন। আর আমরাও চেষ্টা করব যাতে মিঠুনকে কোনও ভাবে সাহায্য করা যায়।’’
ডেউচা চক্রের এসআই বিপ্লবকুমার নন্দী বলেন, ‘‘খুবই ভাল উদ্যোগ। এর জন্য মিঠুনকে ধন্যবাদ জানাই। এ ভাবে যদি এলাকার শিক্ষিত যুবকেরা দুঃস্থ পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায়, তা হলে এলাকায় শিক্ষিতের হার আরও বাড়বে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)