জামাইয়ের পাত সাজাতে গিন্নি তো নির্দেশ দিয়েই খালাস। কিন্তু মাছের যা দাম! ছোঁব কি! জামাইষষ্ঠীর সকালে বাজারের ব্যাগ হাতে বাঁকুড়ার চকবাজারের এ মুড়ো থেকে ও মুড়ো চষে মাছের দাম শুনে এমনই মন্তব্য করলেন এক প্রৌঢ়। কিন্তু যে সে মাছ হলে গিন্নি মুখ ভার করবেন। কল্পনায় সেই ছবি দেখে অগত্যা ইলিশ নিয়ে দর কষাকষি শুরু করলেন কর্তা।
জামাইষষ্ঠী উপলক্ষ্যে শুক্রবার শুধু বাঁকুড়াই নয়, পুরুলিয়া থেকে বিষ্ণুপুর, খাতড়া থেকে আদ্রা— সর্বত্রই মাছের দাম বেশ চড়া ছিল। হবে নাই বা কেন, এ দিন অধিকাংশ বাজারেই শ্বশুরদের পাকড়াও করতে হরেক রকমের মাছের আমদানি করেছিলেন মৎস্য ব্যবসায়ীরা। অন্ধ্রপ্রদেশের মাছে নিত্যদিন যে সব বাজার ভরে থাকে, এ দিন সেখানেই দাপট দেখাতে হাজির ছিল ইয়া বড় বড় ইলিশ, পাবদা, ভেটকি, পমফ্রেট থেকে গলদা চিংড়ির মতো লোভনীয় মাছ। তাই দাম শুনে অনেকে ওই মাছ দিয়ে জামাই-আদর করতে লোভ সংবরণ করতে পারেননি। পিছিয়ে ছিল না রুই, কাতলার মতো দেশি মাছও। অন্যান্য দিনের তুলনায় তার দামও বেশ চড়েই গিয়েছে এ দিন। অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আমদানি করা মাছের দামও বেড়েছিল কমবেশি।
বর্ষার আগেই বাজারে এসে হাজির ইলিশ। কিন্তু দাম তো কম নয়! এ দিন বাঁকুড়ার চকবাজারে ছোট ইলিশ (৫০০-৮০০ গ্রাম) বিক্রি হয়েছে ৮০০ টাকা কেজি দরে। বড় বা মাঝারি ইলিশ ছিল কিলো প্রতি ১২০০ টাকা। পাবদা মাছ প্রতি কেজিতে ৭০০ টাকা ও গলদা চিংড়ি কেজিতে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। দামের জন্য অনেকেই এড়িয়ে গিয়েছেন এই সব মাছ।
দাম বেড়ে গিয়েছিল দিশি কাতলা ও রুই মাছেরও। তুলনায় চালানি কাতলা ও রুইয়ের দাম কিছুটা নাগালে ছিল। এ দিন বাঁকুড়ার চকবাজারে দিশি কাতলা ও দিশি রুই মাছের দর ছিল কিলো প্রতি ৩০০ টাকা। চালানি কাতলা ২০০ টাকা ও চালানি রুই ২২০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
অন্যদিকে পুরুলিয়ার বড়হাটের বাজারে ছোট ও মাঝারি ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১২০০ টাকা কেজি দরে। দিশি রুই ও কাতলার দরও বাঁকুড়ার বাজারের মতো। পমফ্রেট মাছের দর ছিল ৬০০ টাকা প্রতি কেজি, গলদা চিংড়ির দর কেজিতে ৭০০ টাকা।
বাঁকুড়ার চকবাজারের মাছ ব্যবসায়ী পন্ডা ধীবর, বাসু ধীবররা জানাচ্ছেন, এমনিতেই গত বছর থেকে টানা বৃষ্টি না হওয়ায় জেলার জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ চাষ কার্যত হয়নি। তাই বাইরের মাছের উপরেই ভরসা করে বাজার চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। এ বছর গোড়া থেকেই তাই মাছের দাম তুলনামূলক ভাবে চড়া। জামাইষষ্ঠীর বাজারে মাছের চাহিদা তুমুল থাকে। তাই প্রতিবারই দর কিছুটা চড়ে যায়। এ বারেও একই ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের কথায়, “অনেকে চেনা ক্রেতাই মাছের দর শুনে রাগ দেখিয়েছেন। কিন্তু আমাদের কিছু করার ছিল না।”
একই কথা পুরুলিয়ার বাজারের মাছ বিক্রেতা লিল্টু ধীবর, কাজল ধীবর, বাবলু ধীবরদের মুখেও। তাঁরা বলছেন, “জামাইষষ্ঠীর দিন এমনিতেই মাছের দর বাড়ে। আসলে চাহিদার তুলনায় জোগান যে কম।’’ পুরুলিয়ার আদ্রার রেল বাজারেও মাছের দর কমবেশি একই ছিল এ দিন। ওই বাজারের মাছ ব্যবসায়ীদের অবশ্য দাবি, বাগদা, গলদা বা ভেটকির দাম তেমন একটা বাড়েনি। ইলিশের জোগান কম থাকাতেই কিছুটা দর চড়েছিল। আদ্রার রেল বাজারে এ দিন ৬০০ গ্রামের ইলিশ ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
এ দিন মাছ বাজারে গিয়ে দাম শুনে বহু ক্রেতারই চোখ কপালে উঠেছে। দরাদরি করে মাছের দাম কমানোর চেষ্টা করতে দেখা গিয়েছে ক্রেতাদের। কিন্তু মন গলেনি মাছ বিক্রেতার। পুরুলিয়ার রেনিরোড এলাকার বাসিন্দা দুর্গাদাস হাজরা বলেন, “জামাইয়ের পছন্দের মাছ ইলিশ। ইদানীং তো বাজারে ইলিশ মাছের দেখাই মিলছিল না। তবে জামাইষষ্ঠীতে ইলিশ আসবে বলে আশা করেছিলাম। তবে দাম যে এতটা হবে তা অনুমান করতে পারিনি।” বাঁকুড়ার বড়কালীতলার বাসিন্দা কেশব চৌধুরীরও আক্ষেপ, “যে যা পারছে দর হাঁকছে। জামাইষষ্ঠীর বাজারে দাম বাড়তে পারে, তা বলে দাম বাড়ায় একটা নির্দিষ্ট নিয়ম তো থাকবে।” অনেকেই এ দিন বাজারে কেন টাস্কফোর্সের কর্মীদের দেখা মেলেনি তা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন। বাঁকুড়ার গৃহিণী সোমা দাস মোদক বলছেন, “জামাইষষ্ঠীর পাত মাছ ছাড়া বেমানান। কিন্তু বাজারে গিয়ে মাছের দাম শুনে অবাক হয়ে গিয়েছি। তাই কম মাছ কিনেছি।”
মাছের দাম নিয়ে কোনও কোনও শ্বশুর সারাদিন গজগজ করলেও শাশুড়ি কিন্তু হাসি মুখেই মাছের প্লেট এগিয়ে দিয়েছেন জামাইয়ের দিকেই।