ভোট-যুদ্ধের ফল বেরোতে এখনও কিছু দিন বাকি। কিন্তু, ৮৮ দনের মাথায় যে ফল প্রকাশিত হল তাতে দেখা যাচ্ছে দশ গোল খেয়ে হেরে গিয়েছে সন্ত্রাস।
বোমা-গুলির লড়াইয়ে বিধানসভা ভোটের বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই তেতে ছিল নানুর, বোলপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বাহিরী-পাঁচশোয়া, সিঙ্গি, চারকলগ্রাম পঞ্চায়েত-সহ বিস্তীর্ণ এলাকা। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছিল মাধ্যমিক পরীক্ষা। মঙ্গলবার প্রকাশিত মাধ্যমিকের ফলে দেখা যাচ্ছে ওই সব এলাকার পড়ুয়ারা সার্বিক ভাবে বেশ ভাল ফল করেছে। স্থানীয় স্কুলগুলির থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান বলছে, শুধু পাশের হার নয়— ভাল নম্বর তুলেছে এমন পড়ুয়াও কম নয়।
চারকলগ্রাম হাইস্কুলের ৭১ জন পড়ুয়া এ বার পরীক্ষায় বসেছিল। চার জন স্টার-সহ সকলেই পাশ করেছে। পাড়ুইয়ের বেড়গ্রাম পল্লি সেবা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষায় বসেছিল ১৩৯ জন। ৮ জন স্টার-সহ উত্তীর্ণ হয়েছে ১৩১ জন। চারকলগ্রাম হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সমীরণ রায় এবং বেড়গ্রাম হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মলয় মণ্ডলেরা জানিয়েছেন, অন্য বারের তুলনায় এ বার ছাত্রছাত্রীরা ভাল ফল করেছে। পারিপার্শ্বিক কোনও ঘটনা ওদের মনে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। একই কথা জানিয়েছেন হাঁসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অপূর্বকুমার চক্রবর্তী। এই স্কুলের ১৯৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৩৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। ১১ জন স্টার পেয়েছে। সিঙ্গি হাইস্কুল থেকে ৫৭৬ নম্বর নিয়ে পাশ করেছে শেখ সাহেব। ৫২২ ও ৪৯২ নম্বর নিয়ে পাশ করেছে হাঁসড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের মহম্মদ ইউসুফ ও আজমির আলি।
ভাল ফলের আনন্দ মনে করিয়ে দিয়েছে সে দিনের কথা। কী হয়েছিল?
দিনটা ছিল ২ ফেব্রুয়ারি। জলপাই রঙের উর্দিধারী বাহিনী পেরিয়ে বাহিরী ব্রজসুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়ের গেট ঠেলে খুশি মুখে বেরিয়ে এসে অনুরাগী হাজরা, কেয়া হাজরা, সহদেব মাঝিদের প্রথম প্রশ্নই ছিল—‘‘গ্রামের দিকে সব ঠিক আছে তো? নতুন করে কিছু হয়নি তো?’’ জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়েই এমন প্রশ্নে পরিস্কার, এলাকার অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি কিশোর মনে কতটা প্রভাব ফেলেছে। একে পরীক্ষা, তৃণমূলের গোষ্ঠী সংঘর্ষের জেরে বোমা-গুলির লড়াই! পরীক্ষার আগের দিনেই ওরা টিভির পর্দায় দেখেছিল— কারও হাতে বোমা, তো কারও হাতে মাস্কেট। অস্ত্রে সুসজ্জিত সেই বাহিনী কখনও ধানখেত, কখনও রাস্তা ধরে তেড়ে যাচ্ছে প্রতিপক্ষের দিকে।
অভিভাবকেরা বলছেন, ‘‘ভাবতে পারেন! ওই পরিবেশে ওরা পরীক্ষা দিয়েছে।’’ স্থানীয়দের থেকে জানা গেল, পড়াশোনার তাগিদে অনেকে গ্রাম ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। অনেকে আবার ‘টার্গেট’ হওয়ার ভয়ে আলো নিভিয়ে, দরজা-জানলা বন্ধ করে পড়াশোনা করে গিয়েছে। নিরাপত্তার আর্জি নিয়ে অনেকে এই সময় পুলিশের দ্বারস্থও হয়। সক্রিয় হয় পুলিশও। সে সবেরই ফল মিলল।
নিজেদের ফলে পরীক্ষার্থীরা তো বটেই, খুশি অভিভাবক থেকে শিক্ষকেরা। পাড়ুই থানার হাঁসড়ার বাসিন্দা শেখ বাবর আলি বলছেন, ‘‘যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তাতে পরীক্ষায় বসাটাই অনিশ্চিত ছিল। সেখানে এ রকম রেজাল্টের জন্যে ওদের বাহবা দিতেই হবে।’’ তাঁর সঙ্গে সহমত ইলামবাজার থানার গোলটের বাসিন্দা শেখ মন্টু, ছাতারবান্দির বাসিন্দা মহম্মদ ওয়াসিফরা। বাহিরী ব্রজসুন্দরী বা সিঙ্গি উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই প্রধান শিক্ষক প্রদীপকুমার মণ্ডল ও স্বপনকুমার রায়েরা মনে করেন, সন্ত্রাসের আবহ পরীক্ষার্থীদের মনে আঁচর কাটতে পারেনি।