গৃহস্থালীর কাজে দৈনন্দিন প্রচুর পরিমাণ জল ব্যবহার করা হয়। হাত-মুখ ধোওয়া, স্নান, পোশাক ও বাসন ধোওয়ার মতো কাজ রোজই হয়। কিন্তু, কম দূষিত হওয়া সত্ত্বেও সেই জলকে অন্য কোনও ভাবে কাজে লাগানো হয় না। মানুষের ব্যবহৃত কম দূষিত সেই ‘গ্রে ওয়াটার’ বা ধূসর জলকে সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার।
কী ভাবে তা কাজে লাগানো যেতে পারে, সে বিষয়ে অগস্টের শেষ ভাগে কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের নির্দেশিকা রাজ্য হয়ে জেলায় এসেছিল। বীরভূম জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, সেই নির্দেশিকা ব্লক স্তরে পাঠানো হয়। কী ভাবে ‘গ্রে ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট’, তার জন্য অধিকাংশ গ্রাম পঞ্চায়েতে ডিপিআর তৈরির করে ইতিমধ্যেই জমা দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিক জানান, কেন্দ্রের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য দু’টি। প্রথমত, জলবাহিত রোগ বা দূষণ ছড়ানো বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, তুলনায় কম নোংরা এই জল সোকপিটের মাধ্যমে কিছুটা পরিস্রুত করে ভূগর্ভে পাঠানো। যাতে ভূগর্ভস্থ জলস্তর বাড়ে। তথ্য বলছে, প্রতি দিন ১ হাজার লোকসংখ্যার গ্রামে স্বচ্ছ জল ব্যবহার হয় (মাথাপিছু ৫৫ লিটার) মোট ৫৫ হাজার লিটার। তার মধ্যে ৪৪ হাজারই হল ‘গ্রে ওয়াটার’ বা ধূসর জল। সেই জলের পুনর্ব্যবহার পরিবেশের জন্যই জরুরি।
জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, ১৬৭টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ২১২৩টি গ্রামের মধ্যে ১৬০০টি গ্রামের ডিপিআর জমা পড়েছে। তার অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। গ্রামের জনসংখ্যার ভিত্তিতে টাকার অঙ্ক স্থির হবে। দরপত্র চূড়ান্ত করেকাজ করার নির্দেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, প্রকল্পের কাজ হবে পঞ্চদশ অর্থ কমিশন এবং স্বচ্ছ ভারত মিশনের টাকায়।জেলা প্রশাসনের এক অধিকারিক জানান, প্রকল্পের সঙ্গে প্রতিটি পরিবারকে জুড়তে হবে বলে নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে।
পরিবেশকর্মীরা জানাচ্ছেন, অধিকাংশ গ্রামে গেলেই দেখা যাবে প্রতিটি বাড়ির ব্যবহার্য জল যেখানে সেখানে ফেলার প্রবণতা রয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকে একটি নিকাশি নালা বেরিয়ে হয় রাস্তায় মিশছে, নয় বাড়ির সামনে গর্তে ফেলা হচ্ছে। চাতালহীন কূপ বা নলকূপের আশপাশে জমে আছে জল। গ্রামে গ্রামে যা অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। অনেক সময় পেটের রোগ ছড়ায়। সঠিক পরিকল্পনায় গ্রামের এই পরিবেশ বদলাতে চাইছে কেন্দ্র।
জেলা পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘প্রতিদিন প্রতিটি পরিবার থেকে কম দূষিত ধূসর জলের অপব্যবহার হয়। কিন্তু, ওই জলকে পুনরায় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত কিচেন গার্ডেন, গাছ লাগানো কিংবা পরিবেশ রক্ষা করা করা সম্ভব। নিকাশি নালা, সোক পিট, লিচ পিট ইত্যাদি তৈরি করে ভূগর্ভে জলের সঞ্চয় বাড়ানো যেতে পারে।’’
প্রসঙ্গত, পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে থেকে দূষণ রোখার লক্ষ্যে তরল বর্জ্যব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাগুলিতে বেশ কয়েক ধরনের কাজ করায় জোর দেওয়া হয়েছিল। সেগুলির মধ্যে রয়েছে, নলকূপ বা কূপের চাতাল বাঁধানো, সোকপিট তৈরি করা ইত্যাদি। সেই কাজের গতি বাড়িয়ে এ বার ‘গ্রে ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট’-এর কথা বলা হয়েছে।জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, চলতি অর্থবর্ষে সেই কাজকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যাতে মানুষের ব্যবহার করা জল নষ্ট না-করে সংরক্ষণ করা যায়।
বীরভূম জেলার একটা বড় অংশ এমনিতেই রুক্ষ, খরাপ্রবণ। তার উপরে উদ্বেগ বাড়িয়ে জেলার ভূগর্ভস্থ জলের স্তর হু হু করে নামছে। গতবার বৃষ্টির ঘাটতি ছিল। বর্ষা ছাড়া খাল, বিল, পুকুর, নদী সহ বিভিন্ন জলাশয়ে জল থাকছে না। চাষের কাজে এবং পানীয় জলের অভাব মেটাতে ভূগর্ভস্থ জল তুলে নির্বিচারে খরচ করতে হচ্ছে। ‘গ্রে ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট’-এ সেই দিকটাও খেয়াল রাখা যাবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)