Advertisement
E-Paper

কেষ্টর গলার স্বরই পাঠায়নি পুলিশ

ফরেন্সিক রিপোর্ট চলে এসেছিল দু’বছর আগেই। অথচ জমা পড়ল বুধবার। আবার সেই রিপোর্টেই দেখা যাচ্ছে, অভিযুক্তের গলার স্বরের নমুনাই ল্যাবে পাঠায়নি পুলিশ। ফলে বক্তৃতার স্বরটি অভিযুক্তেরই কিনা, সেটাই পরীক্ষা করা যায়নি!

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০১৬ ০০:৪২
বুধবার সিউড়ি আদালতে পুলিশকর্মী  শেখ ইসরাইল।—নিজস্ব চিত্র

বুধবার সিউড়ি আদালতে পুলিশকর্মী শেখ ইসরাইল।—নিজস্ব চিত্র

ফরেন্সিক রিপোর্ট চলে এসেছিল দু’বছর আগেই। অথচ জমা পড়ল বুধবার। আবার সেই রিপোর্টেই দেখা যাচ্ছে, অভিযুক্তের গলার স্বরের নমুনাই ল্যাবে পাঠায়নি পুলিশ। ফলে বক্তৃতার স্বরটি অভিযুক্তেরই কিনা, সেটাই পরীক্ষা করা যায়নি!

এমনই বেনজির ছবি উঠে এল পঞ্চায়েত ভোটের প্রচারে পাড়ুইয়ের কসবায় তৃণমূলের বিতর্কিত নেতা অনুব্রত মণ্ডলের উস্কানিমূলক বক্তৃতার মামলায়। যার জেরে ফের প্রশ্নের মুখে বীরভূম পুলিশের ভূমিকা। বিরোধীদের অভিযোগ, শাসকদলের নেতাকে বাঁচাতে প্রথম থেকেই পুলিশের কর্তারা যে সচেষ্ট ছিলেন, ফের তা প্রমাণিত হল।

বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‘ভিডিও রেকর্ডিংয়ের গলাটি অভিযুক্তেরই কিনা, তা চিহ্নিত করাই ফরেন্সিক ল্যাবের কাজ। সে ক্ষেত্রে ভিডিওটির পাশাপাশি পুলিশকে অভিযুক্তের গলার স্বরের নমুনাও সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠাতে হয়।’’ তিনি আরও জানান, এ ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তাতে ভিডিওটি ভুয়ো কিনা— কেবল তারই উত্তর দিতে পারবে ল্যাব। কিন্তু ভিডিও-র গলার স্বরটি অনুব্রতরই কিনা, তা কোনও ভাবেই ফরেন্সিক ল্যাবের পক্ষে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। তাঁর অভিযোগ, ‘‘পরিকল্পনা মাফিকই বীরভূম পুলিশের দিক থেকে এই কাজ করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।’’

২০১৩ সালে পঞ্চায়েত ভোটের ঠিক মুখে পাড়ুইয়ের কসবায় প্রকাশ্য সভায় পুলিশের উপরে বোমা মারার এবং নির্দল প্রার্থীদের (বিক্ষুব্ধ তৃণমূল) বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন তৃণমূল জেলা সভাপতি অনুব্রত। ওই বক্তৃতার পরেই কসবা অঞ্চলে একাধিক নির্দল প্রার্থীর বাড়িতে হামলা, বোমাবাজি হয় বলে অভিযোগ। স্থানীয় বাঁধনবগ্রামে খুন হয়ে যান এক নির্দল প্রার্থীর বাবা সাগর ঘোষ। উস্কানিমূলক বক্তৃতার প্রেক্ষিতে অনুব্রতর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেয় নির্বাচন কমিশন। প্রথমে পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে লঘু ধারায় মামলা করলেও বীরভূমের তৎকালীন সিজেএম রাজেশ চক্রবর্তী পুলিশকে জামিন-অযোগ্য ধারায় মামলা করার নির্দেশ দেন। তার পরেও পুলিশ তদন্ত করে অনুব্রতের বিরুদ্ধে সব ক’টি জামিনযোগ্য ধায়ায় অভিযোগ আনে। গুরুতর অভিযোগ থাকলেও পুলিশ কতকগুলি জামিনযোগ্য ধারা প্রয়োগ করায় অভিযুক্ত তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সব রাস্তাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে আইনজীবীদের একাংশের মত।

শুধু মামলা সাজানোর দিক থেকেই নয়, পুলিশের দিক থেকে গড়িমসি দেখা গিয়েছে সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রেও। বারবার গরহাজির থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা পিছিয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। যেমন, মামলার তদন্তকারী আফিসার তথা বোলপুরের প্রাক্তন সিআই চন্দ্রশেখর দাসের বিরুদ্ধে একাধিক বার সমন জারি হলেও তিনি এজলাসে উপস্থিত হননি। শেষমেশ তাঁর বিরুদ্ধে আদালত জামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে গত ১৯ নভেম্বর সাক্ষ্য দেন ওই অফিসার। প্রশ্ন উঠেছে, তাঁর ওই সাক্ষ্যদান নিয়েও। কারণ, অনুব্রতর ওই উস্কানিমূলক বক্তৃতার পরপরই একাধিক নির্দল প্রার্থীর বাড়িতে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছিল। ভাঙচুরের পাশাপাশি অগ্নিসংযোগের চিহ্নও মিলেছিল। খবর পেয়েই থানা থেকে পুলিশ ঘটনাস্থলে তদন্তে এসেছিল। তার পরেও সরকারি আইনজীবীর প্রশ্নের উত্তরে এমন কোনও ঘটনা তাঁর ‘নলেজে নেই’ বলে আদালতে দাবি করেছিলেন ওই তদন্তকারী অফিসার।

মামলার চূড়ান্ত শুনানি ও প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য এ দিনই অনুব্রতকে হাজির থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন সিউড়ির সিজেএম নিরূপম কর। কিন্তু, প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে আসেননি অনুব্রত। তার অনুপস্থিতি এ দিনের শুনানিতে খুব একটা বড় ব্যাপার হয়ে উঠেছিন। কিন্তু, অন্য একটি বেনজির ঘটনায় আইনজীবীমহলেই নিন্দার ঝড় উঠেছে। শুনানির শুরুতেই সিজেএম আদালতে নিযুক্ত সরকারি আইনজীবী, এপিপি কুন্তল চট্টোপাধ্যায় থাকা সত্ত্বেও কোন এক্তিয়ারে পিপি রণজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় অনুব্রত মামলা পরিচালনা করবেন— এ নিয়ে বিচারকের সামনেই চূড়ান্ত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন ওই দুই আইনজীবী। গত শুনানিতেও এ নিয়ে রণজিৎবাবুর সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল কুন্তলবাবুর অনুপস্থিতি মামলায় সওয়াল করতে আসা এপিপি শান্তনু মল্লিকের।

এ দিন অনুব্রতর বিতর্কিত বক্তব্যের সিডি ও ফরেন্সিক রিপোর্ট নিয়ে উপস্থিত ছিলেন পুলিশকর্মী শেখ ইসরাইল। তাঁকে কে আদালতের সামনে হাজির করাবেন, কে-ই বা জেরা করবেন— এ নিয়েই দুই আইনজীবীতে বিরোধ বাধে। কুন্তলবাবু প্রশ্ন তোলেন, ‘‘যেখানে এই আদালতে নিযুক্ত এক জন এপিপি রয়েছেন, সেখানে কী ভাবে পিপি হঠাৎ হঠাৎ এসে মামলা লড়েন? তা হলে আমার ভূমিকাটা কী?’’ বিচারকের কাছে তিনি দাবি করেন, আইনগতদিক থেকে দেখলে বিশেষ অনুমতি ছাড়া পিপি এটা করতে পারেন না। অন্য দিকে, রণজিৎবাবুর দাবি, ‘‘পদমর্যাদায় আমি উঁচুতে (সুপিরিওর) থাকায় যে কোনও আদালতে যে কোনও মামলায় যোগ দিতে পারি। আইনে সেই বিধান রয়েছে।’’ উভয়ের মধ্যে এই নিয়ে পাক্কা ৩০ মিনিট ধরে বিরোধ চলে।

অবস্থা দেখে বিচারক কুন্তলবাবুকে প্রস্তাব দেন, ‘‘ঠিক আছে, আপনি লিখিত আপত্তি জানান। এটা নিয়ে শুনানি হবে।’’ তত ক্ষণে আদলত কক্ষে উপস্থিত বেশ কিছু সিনিয়র আইনজীবী দু’পক্ষকে থামানোর চেষ্টা করেন। বিচারক বিরতি ঘোষণা করে দু’পক্ষকে নিজেদের মধ্যে কথা বলে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়ারল পরামর্শ দেন। কিছু পরে দুই আইনজীবী নিজেদের মধ্যে সমঝোতায় এসে আদালতকে জানান, সাক্ষীকে হাজির করাবেন এপিপি কুন্তলবাবু। সওয়াল করবেন পিপি রণজিৎবাবু।

বিস্ময়ের তখনও বাকি ছিল। কারণ, সাক্ষী ইসরাইল আদালতকে জানান, চণ্ডীগড়ের ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবে সিডি-র পরীক্ষা হয়েছে। ২০১৪ সালের ৩০ অক্টোবর সেখান থেকে রিপোর্ট এসেছে। তার পর থেকে এটা তারই ‘সেফ কাস্টডি’তে ছিল। সেই রিপোর্ট জমা দিতে কেন এত দিন লাগল, সে প্রশ্ন অবশ্য রণজিৎবাবু ওই পুলিশকর্মীকে করেননি। কেবল একটিই প্রশ্ন তিনি। সিডি ফরেন্সিকে পাঠানো হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু, অভিযুক্ত অনুব্রত মণ্ডলের মূল কণ্ঠস্বরের নমুনা কি পাঠানো হয়েছিল? ইসরাইলের কাছ থেকে উত্তর আসে— ‘‘না।’’ কেন পাঠানো হল না, কার গাফিলতিতে এমনটা হল— সেই কূট আর তোলেননি ওই সরকারি আইনজীবী। পরে সংবাদমাধ্যমকেই তার কারণ ব্যাখ্যা করেননি। এমনকী, এ নিয়ে প্রশ্ন করে ফোন ও মেসেজ পাঠানো হলেও সাড়া দেননি জেলার পুলিশ সুপার নীলকান্ত সুধীর কুমার।

এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে রাজি নয় তৃণমূলের নেতারা। মন্ত্রী আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বিচারাধীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’’

Voice recordings Accused
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy