Advertisement
E-Paper

অনাস্থা-বাগীশ প্রদীপে আস্থা হারাল তৃণমূল

মূলত দু’টি পঞ্চায়েতে অনাস্থা এসেছিল তাঁর মদতে। কিন্তু দলের নির্দেশ অমান্য করে পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি ও কর্মাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনেই ভুল চাল দিয়ে ফেলেছিলেন। তাতেই তিনি দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের রোষানলে পড়লেন। দলের রঘুনাথপুর ১ ব্লক সভাপতির পদ খোয়াতে হল দোর্দন্ডপ্রতাপ নেতা প্রদীপ মাঝিকে।

শুভ্রপ্রকাশ মণ্ডল

শেষ আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪ ০০:৪৪

মূলত দু’টি পঞ্চায়েতে অনাস্থা এসেছিল তাঁর মদতে। কিন্তু দলের নির্দেশ অমান্য করে পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি ও কর্মাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনেই ভুল চাল দিয়ে ফেলেছিলেন। তাতেই তিনি দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের রোষানলে পড়লেন। দলের রঘুনাথপুর ১ ব্লক সভাপতির পদ খোয়াতে হল দোর্দন্ডপ্রতাপ নেতা প্রদীপ মাঝিকে।

দল জানিয়ে দিল, শৃঙ্খলারক্ষায় এই কড়া পদক্ষেপ। শৃঙ্খলারক্ষার এই কাজ শুরু হল সেই রঘুনাথপুর থেকে, যে এলাকা সম্প্রতি শাসকদলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে বারবার খবরের শিরোনামে এসেছে। এ বার থেকে ওই ব্লকের সংগঠনের কাজ পরিচালনা করবেন রঘুনাথপুরের বিধায়ক পূর্ণচন্দ্র বাউরি। বৃহস্পতিবার দুপুরে তৃণমূলের জেলা সভাপতি তথা মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতোর ওই নির্দেশ ফ্যাক্স মারফত পাঠানো হয়েছে রঘুনাথপুর ১ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কৃষ্ণ মাহাতোর কাছে। পাশাপাশি বিষয়টি জানানোর কথা প্রদীপবাবুকেও।

শান্তিরামবাবু নিজের প্যাডে প্রদীপ মাজির পরিবর্তে বিধায়ককে ওই ব্লকের দায়িত্ব নেওয়ার কথা লিখেছেন। তবে, তাঁকে ব্লকের দায়িত্ব থেকে সরালে এলাকায় দলের সাংগঠনিক ক্ষতি হবে বলে পাল্টা দাবি করেছেন প্রদীপবাবু। যদিও শান্তিরামবাবুর বক্তব্য, “এখন অনেকেই নিজেদেরকে দলের ঊর্ধ্বে বলে মনে করতে শুরু করেছেন। কিন্তু, সকলকেই মনে রাখতে হবে, দলের উপরে কেউ নয়!” বার্তাটা খুব স্পষ্ট! জেলা তৃণমূলের এক নেতার কথায়, “এই ব্যবস্থা নেওয়াটা খুব জরুরি হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে রঘুনাথপুরে দলের অবস্থা দিনদিন খারাপ হচ্ছিল। এ বার সবার কাছেই বার্তা গেল, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে যুক্ত থাকলে আজ হোক বা কাল, শাস্তি অনিবার্য!”

রঘুনাথপুর ১ ব্লকে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ক্রমশই লাগামছাড়া হয়ে উঠছিল। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরেই পরপর অনাস্থা এসেছে ওই ব্লকের বেশ কিছু গ্রাম পঞ্চায়েতে। বাদ পড়েনি পঞ্চায়েত সমিতিও। এমনকী সিপিএমের সমর্থন নিয়ে তৃণমূলেরই একাংশ বেড়ো পঞ্চায়েতে দলীয় প্রধানকে সরিয়েছেন, এই উদাহরণও রয়েছে। তৃণমূল সূত্রের খবর, এই দ্বন্দ্ব মূলত এলাকার দুই জেলা পরিষদ সদস্য ও প্রদীপবাবুর মধ্যে। কিন্তু, ঘটনা হল গোষ্ঠী কোন্দলের জন্য গ্রাম পঞ্চায়েতে বা পঞ্চায়েত সমিতিতে অনাস্থা আসায় তৃণমূলের জেলা নেতাদের অস্বস্তির মুখে পড়তে হচ্ছিল। কিছু ক্ষেত্রে শাসকদলের দ্বন্দ্বের রাজনৈতিক ফায়দা পাচ্ছিল বিরোধীরা। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কেন কড়া হচ্ছেন না জেলা নেতৃত্ব, সেই প্রশ্ন উঠেছিল দলের অন্দরেই।

বিশেষ করে কিছুদিন আগে রঘুনাথপুর ১ পঞ্চায়েত সমিতিতে সহ-সভাপতি এবং এক কর্মাধ্যক্ষকে যে ভাবে দলীয় নির্দেশ অমান্য করে অনাস্থা এনে অপসারিত করেছেন তৃণমূল সদস্যদেরই একাংশ, সেই প্রসঙ্গ তুলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হয়েছিল দলের মধ্যেই। তৃণমূল সূত্রে জানা যাচ্ছে, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝেই প্রদীপবাবুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যদিও শান্তিরামবাবুর লিখিত নির্দেশে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কথা কোথাও উল্লেখ নেই। বরং রঘুনাথপুর ১ ব্লক এলাকায় দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই প্রদীপ মাজির পরিবর্তে বিধায়ককে দায়িত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তৃণমূল সূত্রের খবর, প্রদীপবাবুর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তের জমি তৈরি হয়েছিল মূলত রঘুনাথপুর ১ পঞ্চায়েত সমিতির নারী ও শিশুকল্যাণ কর্মাধ্যক্ষ কণিকা চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে অনাস্থা আনার পর থেকেই। আস্থা ভোটের দিন দলীয় সদস্যদেরই আনা অনাস্থা রুখতে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির কার্যালয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন খোদ জেলা পরিষদের সভাধিপতি সৃষ্টিধর মাহাতো, বিধায়ক পূর্ণচন্দ্রবাবু এবং জেলা সভাপতির ঘনিষ্ঠ নেতা নবেন্দু মাহালি। আস্থা ভোটে যাতে দলের সদস্যেরা অনুপস্থিত থাকেন, সেই বিষয়ে নির্দিষ্ট বার্তাও দিয়েছিলেন ওই নেতারা। কিন্তু ফল হয়নি। অপসারিতই হতে হয়েছিল কণিকাদেবীকে। কর্মাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যাঁরা অনাস্থা এনেছিলেন, তাঁরা সকলেই প্রদীপবাবুর শিবিরের লোক হিসাবে পরিচিত। এই ঘটনার পরেই প্রদীপবাবুর ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে জেলা সভাপতিকে লিখিত রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল।

দল সূত্রেই খবর, সম্প্রতি ব্লকের সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে বিধায়কের সঙ্গে আলোচনার পরেই প্রদীপবাবুকে ব্লকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শান্তিরামবাবু। কিন্তু, প্রদীপবাবুকে সরিয়ে বিরোধী গোষ্ঠীর কাউকে ব্লকের দায়িত্ব দিলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আরও মাথাচাড়া দেওয়ার আশঙ্কাও ছিল। এই অবস্থায় গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ রঘুনাথপুর ১ ব্লকের সংগঠনকে চাঙ্গা করতে শেষ অবধি বিধায়কের কাঁধেই দায়িত্ব বর্তেছে।

আজ, শুক্রবার পঞ্চায়েত সমিতিতে নতুন সহ-সভাপতি নির্বাচনের দিন। প্রদীপবাবুর গোষ্ঠীর সদস্যদের আনা অনাস্থায় ইতিমধ্যেই অপসারিত সহ-সভাপতি রীনা বাউরিকেই ফের ওই পদে বসাতে চাইছেন জেলা নেতাদের একাংশ। তাই তার আগেই প্রদীপবাবুকে সরিয়ে নির্দিষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছেন শীর্ষ নেতৃত্ব। বিধায়ক পূর্ণচন্দ্র বাউরি এ দিন বলেন, “দলের দখলে থাকা পঞ্চায়েত বা সমিতিতে অনাস্থা আনা যাবে না, এই মর্মে দলের কড়া নির্দেশ থাকলেও রঘুনাথপুর ১ ব্লকের নেতৃত্ব তাতে আমল দেননি। তাই বাধ্য হয়ে আমাদের ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।” গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে ওই ব্লকের সাংগঠনিক অবস্থা বর্তমানে যে ঢিলেঢালা হয়ে পড়েছে, তা মেনে নিয়ে বিধায়ক বলেন, “জেলা সভাপতি ওই ব্লকের দায়িত্ব দিয়েছেন। সকলকে নিয়ে দ্রুত সংগঠন গুছোনোর কাজ শুরু করছি।”

ব্লকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ায় নিজের ক্ষোভ গোপন করেননি প্রদীপবাবু। তাঁর দাবি, “এলাকার জেলা পরিষদের দুই সদস্যের প্ররোচনায় বিভিন্ন পঞ্চায়েতে অনাস্থা এসেছিল। তার মধ্যে বেড়ো পঞ্চায়েতে সিপিএমের সমর্থন নিয়ে আমাদেরই দলের প্রধানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুরো ঘটনা বিভিন্ন সময় বিধায়ক থেকে দলের নেতাদেরকে জানিয়েছি। কিন্তু, কেউ কোনও ব্যবস্থা নেননি। উল্টে, আমার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হল!”

তবে তিনি যে সহজে ছেড়ে দেবেন না, তার ইঙ্গিতও মিলেছে প্রদীপবাবুর কথায়। রঘুনাথপুর ১ ব্লকে তৃণমূলের এই অবস্থার জন্য দলের নেতারাই দায়ী বলে পাল্টা অভিযোগ করে তাঁর হুঁশিয়ারি, “দল যদি ভেবে থাকে, আমাকে সরিয়ে দিলে ব্লকে দলের অবস্থা ভাল হবে, তাহলে ভুল ভাবছে। আমরাই বিধানসভা থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত ও লোকসভায় দলের সাফল্য এনেছি। আমাকে সরালে দলের অবস্থা কিন্তু আরও খারাপ হবে।”

raghunathpur subhraprakash mondol pradip majhi no confidence motion tmc
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy