Advertisement
E-Paper

আড়ম্বর ছেঁটে শুভর পাশে পাড়া

দুরারোগ্য অসুখে ভুগছে পাড়ার ছেলে। কী ভাবে চিকিৎসা হবে, তা ভেবেই পুজোর আনন্দ ম্লান হতে বসেছে ওই গরিব পরিবারের। এই অবস্থায় খরচা বাড়িয়ে পাড়া আলো করা আড়ম্বরের পুজোয় কিছুতেই মন সায় দিচ্ছে না কর্তাদের।

অর্ঘ্য ঘোষ

শেষ আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০১৫ ০১:৩১

দুরারোগ্য অসুখে ভুগছে পাড়ার ছেলে। কী ভাবে চিকিৎসা হবে, তা ভেবেই পুজোর আনন্দ ম্লান হতে বসেছে ওই গরিব পরিবারের। এই অবস্থায় খরচা বাড়িয়ে পাড়া আলো করা আড়ম্বরের পুজোয় কিছুতেই মন সায় দিচ্ছে না কর্তাদের। বরং আড়ম্বর ছেঁটে অসুস্থ ছেলের চিকিৎসার তহবিলে কিছু টাকা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। সহমর্মিতার এই ঘটনা আমোদপুরের।

কয়েক মাস আগে স্থানীয় জয়দুর্গা হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র শুভজিৎ দাসের ‘অ্যাকিউট লিকিউমিয়া’ ধরা পড়ে। তার পরেই কার্যত আকাশ ভেঙে পড়ে পরিবারের মাথায়। কারণ ঘরামি বাবা জনার্দন দাসের যৎসামান্য আয়ের উপরেই জোড়াতালি দিয়ে চলে চার সদস্যের সংসার। তাই কী করে ছেলের চিকিৎসা করাবেন, ভেবে কুল পাচ্ছিলেন না তিনি। সেই সময় প্রথম তার পাশে দাঁড়ান শুভজিতের স্কুলের শিক্ষকেরাই। তাঁরাই স্কুলের পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুলে সাহায্যের আর্জি নিয়ে যান। জেলার বিভিন্ন স্কুল থেকে সেই আবেদনে সাড়াও মেলে। কিছু ক্লাব, সাংস্কৃতিক সংস্থা এমনকী স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। সাহায্য মেলে মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্যপালের তহবিল থেকেও। সব মিলিয়ে সংগৃহীত হয়েছে প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা।

তাতেও দুশ্চিন্তা ঘোচেনি হতদরিদ্র বাবার। কারণ চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, টানা দু’ বছর নিয়মিত চিকিৎসা করাতে হবে ছেলের। খরচ পড়বে কমপক্ষে ৭ লক্ষ টাকা। ইতিমধ্যেই সংগৃহীত টাকার সিংহভাগ খরচ হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন পরীক্ষা এবং চিকিৎসার জন্য। তাই কী করে ছেলের চিকিৎসা হবে, সেই দুশ্চিন্তায় মুখ কালো করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। পুজোর নানা ব্যস্ততার মাঝেও বিষয়টি নজর এড়ায়নি ওই পাড়ারই সুকান্ত ক্লাবের কর্মকর্তাদের। পাড়ায় বাড়ি বাড়ি চাঁদা তুলে ৩৫ বছর ধরে পুজো করছেন তাঁরা। এ বারের বাজেট ৭০ হাজার টাকা। তার মধ্যেই ধরা ছিল বিসর্জনের খরচ বাবদ ১০ হাজার টাকা। উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিসর্জনে এ বার আর কোনও আড়ম্বর হবে না। বরাদ্দ ১০ হাজার টাকা তুলে দেওয়া হবে শুভজিতের চিকিৎসার জন্য।

Advertisement

একই ভাবে বিসর্জনের খরচ বাঁচিয়ে ৫ হাজার টাকা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্থানীয় কাগাস রোড বারোয়ারি পুজো কমিটিও। তাঁরাও বাড়ি বাড়ি চাঁদা তুলে ৩৭ বছর ধরে পুজো করছেন। এ বারের বাজেট ৭৫ হাজার টাকা। ওই পুজো কমিটির সম্পাদক বুদাই সেন, সুকান্ত ক্লাবের পুজো কমিটির সম্পাদক অভিজিৎ দাসরা বলেন, ‘‘পুজোতে আমরা আনন্দ করব, আর আমাদেরই চোখের সামনে একটি পরিবার ম্লান মুখে পুজো কাটাবে তা কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না। জানি, এ বার আমাদের পুজোর আকর্ষণ কিছুটা কমবে। কিন্তু, ওই পরিবারের মুখে কিছুটা হাসি ফোটাতে পারলেও সেই ঘাটতি পুষিয়ে যাবে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘এ-ও জানি প্রয়োজনের তুলনায় টাকাটা যৎকিঞ্চিত। আমরা মূলত পাড়ার বাড়ি বাড়ি চাঁদা তুলে সীমিত বাজেটের পুজো করি। সব দিক সামাল দিয়ে এর বেশি বাঁচাতে পারা যাবে না। তবে পরবর্তী কালেও আমরা ওই পরিবারের পাশে থাকব।’’

দশমীর দিনই ওই টাকা তুলে দেওয়া হবে শুভজিতের বাবার হাতে। তাই এ বার বিসর্জনের শোভাযাত্রায় আর থাকছে না মাইক, আলো আর নানা রকম বাজনা। সে ভাবে নাচা হবে না দাসপাড়ার সোমেশ্বর দাস, মাধবী চক্রবর্তী কিংবা কাগাস রোডের ঊর্মি সাহা, প্রত্যুষ মুখোপাধ্যায়দের। তা বলে একটুকুও আক্ষেপ নেই ওই সব স্কুল পড়ুয়ার। তারা বলছে, ‘‘পুজো কমিটির কাকুরা জানিয়ে দিয়েছে, এ বার আর বিসর্জনে ধুমধাম হবে না। ওই টাকা দেওয়া হবে শুভর চিকিৎসার জন্য। খুব ভাল হবে ও ভাল হয়ে পরের বার যদি আমাদের সঙ্গে নাচে যোগ দেয়। তার জন্য প্রয়োজনে বাজি পটকা কেনার টাকাও দিয়ে দেব।’’

আর যাঁদের সহযোগিতায় স্বল্প বাজেটের ওই সব পুজো সম্পন্ন হয়, সেই সব পরিবারের বধূ পম্পা সাহা, রূপসী গঙ্গোপাধ্যায়, নীলিমা দাস, ঝর্না দাসরা জানান, পুজো কর্তাদের এমন মানবিক সিদ্ধান্তে পাড়ার বাসিন্দা হিসাবে তাঁদের গর্ববোধ হচ্ছে। মানুষের চেয়ে যে বড় কিছু হয় না, তা প্রমাণ করে দিলেন কর্তারা। ‘‘কত সময় চাঁদা দিতে কার্পণ্য করেছি। আজ খারাপ লাগছে। উৎসবের সঙ্গে যদি এ রকম কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়, তা হলে সাধ্য মতো চাঁদা দিতে আর পিছুপা হবো না।’’

এ দিকে, আবেগ আপ্লুত গলায় জনার্দনবাবু জানিয়েছেন, এত মানুষের এত ঋণ শোধ করার ক্ষমতা তাঁর নেই। ছেলেদের মানুষ করতে পারলে তাদের তিনি এ ভাবেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষাই দেবেন।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy