সিনেমা দেখে গল্পগুলো পড়ার কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। বোলপুর বইমেলা সেই সুযোগ করে দিল বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছেলেমেয়েদের। সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ থেকে শুরু করে ফেলুদা, কিরিটি, ব্যাগভর্তি বই নিয়ে তবে বাড়ি ফেরা।
কে বলে ইন্টারনেট-স্মার্টফোনের দুনিয়ায় নবীন প্রজন্ম বই-বিমুখ হচ্ছে? বোলপুর বইমেলায় কিশোর-যুবাদের উপস্থিতি বলছে তাঁরা বই-বিমুখ নয়। শুধু কি গোয়েন্দা গল্প, বীরভূম জেলা গ্রন্থাগার বিভাগের উদ্যোগে শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী বইমেলায় দেদার বিক্রি হচ্ছে শরৎচন্দ্র, সমরেশ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প-উপন্যাস তো বটেই, কাটছে হরেক রান্নার বইও। চাহিদা রয়েছে কাকাবাবু সমগ্র, আরব্য রজনীরও। স্টলে স্টলে ঘুরে জানা গেল, প্রতিদিনই কয়েক হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে। সব মিলিয়ে বিক্রিবাটা কয়েক লক্ষ।
শীতের শুরুতে অন্য বছরের মতো এ বারও জেলায় জেলায় শুরু হয়েছে বইমেলা। বোলপুরের ডাকবাংলো ময়দানে গত ৪ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে ৩৪ তম বীরভূম জেলা বইমেলা। সাত দিনের মেলায় হাজির হয়েছে ৬৩টি বেশি স্টল। সপ্তাহ শেষের শনিবার, রবিবার তো বটেই অন্য দিনগুলিতেও উপছে পড়েছে ভিড়। আজ, বৃহস্পতিবার মেলার শেষ দিন। তবে শুধু মেলা নয়, উদ্যোক্তাদের তরফে আয়োজন থাকছে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও।
এমনিতে শান্তিনিকেতন স্থান-মাহাত্ম্যে গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া তো বটেই, দেশি-বিদেশী পর্যটকের কাছেও অবশ্য গন্তব্য শান্তিনিকেতন। তার উপরে শহরে শ্যুটিংয়ে আসছেন ‘বিগ বি’ অমিতাভ বচ্চন। এলাকার হোটেল মালিকদের অনেকেই জানাচ্ছেন, একে বছরের শেষ, তার উপরে ‘বিগ বি’ গত দিন দু’য়েক ধরে ভিড় বাড়ছে শহরে। বাড়ছে ঘরের চাহিদাও। এমন পরিবেশে বইমেলা ক্রেতা, বিক্রেতা সকলের কাছেই ফলপ্রদ হয়েছে।
বইমেলায় বন্ধুদের সঙ্গে এসেছিল পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র অনিমেষ দাস। সে চাঁদের পাহাড় কিনবে। পুস্তক ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, অপুর ছেলেবেলা আজও বাঙালির কাছে নস্টালজিয়া। সমিতির এক সদস্যের মত, মাঝে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস কমেছিল। এখন ধীরে ধীরে বাড়ছে। বোলপুর মেলায় প্রচুর গল্পের বই এসেছে। উদ্যোক্তাদের মতে, এখনকার ছেলেমেয়েরা গল্প-কবিতার বই ফেলে কম্পিউটারে বা মোবাইলে গেম খেলতেই ব্যস্ত। না হলে তারা কার্টুন দেখে। কিন্তু মেলায় ছোট ছেলেমেয়েরা যে ভাবে ভিড় করছে, তাতে আশাবাদী সকলেই।
কলকাতার একটি প্রথম সারির প্রকাশনা সংস্থার কর্মী অরুণ ঋষি জানালেন, বেশ কয়েক বছর ধরে তাঁরা বোলপুরে মেলার স্টল দিচ্ছেন। প্রতিবারই ভাল বিক্রি হয়। একই সঙ্গে তাঁর মত, এখন অনলাইনের জামানা। ফলে সকলকে মেলা বা দোকানে যেতে হয় না। ঘরে বসেই প্রয়োজন মতো অর্ডার দেওয়া যায়। তা ছাড়া অনেক ওয়েবসাইটে সরাসরি বই পড়া যায়। ‘‘এই দু’ইয়ে কিছুটা হলেও খদ্দের কমেছে’’— বলছেন অরুণ। তবে মেলায় উপস্থিত জেন ওয়াইয়ের অনেকেই জানালেন, হাতে বই নিয়ে পৃষ্ঠা উল্টে পড়ায় তাঁরা ঢেড় স্বচ্ছন্দ্য।
বুধবার মেলায় গিয়ে দেখা গেল, সিউড়ির বাসিন্দা স্নাতকোত্তরের ছাত্রী, গৃহবধূ সুলোচনা মুখোপাধ্যায় রান্নার বইয়ের খোঁজে স্টলে স্টলে ঘুরছেন। কাকা নিলাদ্রী চক্রবর্তীর সঙ্গে বইমেলায় হাজির স্কুল পড়ুয়া মেঘনা চক্রবর্তী। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের বই উল্টে সুনীলের ‘এই সময়’-এর জন্য বায়না জুড়েছে মেঘনা। কেউ কেউ আবার বিশ্বভারতীর প্রকাশনা ছাড়াও অন্য প্রকাশনার রবীন্দ্রনাথ এবং ঠাকুর পরিবার নিয়ে একাধিক বইয়ের খোঁজ নিচ্ছেন। কেউ এসেছেন শুধুই নতুন কবিতার বইয়ের খোঁজে।
মেলার একপ্রান্তে রয়েছে শিশু-কিশোরদের একাধিক স্টল। বাবা ইন্দ্রশেখর পালের কোলে চেপে মেলার বিকেলে হাজির হয়েছিল বছর তিনেকের আরত্রিকা। একাধিক স্টল ঘুরে দেখার পর, বাবার কাছে সে বায়না জুড়ল নন্টেফন্টে কেনার জন্য। শুধু তাই নয় হাত বাড়িয়েছে ড্রয়িং খাতাতেও। ছবি আঁকা, ছড়া, গল্প— একে একে প্রতিটির জন্য বায়না জুড়ল সে।
সেটাই মঙ্গল, বলছেন বিক্রেতা থেকে শুরু করে কিশোর-যুবাদের একটা বড় অংশও।