সংগ্রহে থাকা বহু দুষ্প্রাপ্য সামগ্রী দিতে চেয়ে প্রশাসনের কাছে আবেদন করে ব্যর্থ হয়েছিলেন বাবা। এ বার ব্যক্তিগত উদ্যোগেই পরিবারের সংগ্রহে থাকা ওই সব সামগ্রী দিয়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে একটি সংগ্রহশালা গড়ে তুলছেন ছেলে। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর, তারাশঙ্করের প্রয়াণ দিবসে লাভপুরের দত্তবাড়ির ষষ্ঠী তলায় ওই সংগ্রশালা আনুষ্ঠানিক ভাবে চালু হবে।
প্রয়াত বীরেন্দ্রকুমার দত্তের ছেলে টুটুল দত্ত বলছেন, ‘‘আমাদের পারিবারিক সংগ্রহে তারাশঙ্করের শতাধিক চিঠি, ছবি ও নথি রয়েছে। তা নিয়ে বাবা সংগ্রহশালা করার জন্য জেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হন। কিন্তু, সরকার কোনও উদ্যোগ নেয়নি। বেঁচে থাকতে বাবা দেখে যেতে পারলেন না। আমরা তাঁর স্বপ্ন পূরণ করতে সেই উদ্যোগ নিয়েছি।’’ তাঁর আশা, ওই সংগ্রহশালা এই প্রজন্মের তো বটেই, বাংলা সাহিত্য এবং তারাশঙ্কর সম্পর্কিত বিষয়ে পড়ুয়া ও গবেষকেরা অনেক উপকৃত হবেন।
স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, তারাশঙ্করের স্নেহধন্য ছিলেন লাভপুরেরই বাসিন্দা বীরেন্দ্রকুমার দত্ত। এই দত্ত পরিবারের সঙ্গে তারাশঙ্করের ঘনিষ্ঠতা ছিল। বীরেন্দ্রবাবুর কাকা প্রয়াত ভোলানাথ দত্ত ছিলেন তাঁর বন্ধু। টুটুলবাবুর কথায়, ‘‘বাবা-দাদুর কাছে ছোটবেলা থেকেই তারাশঙ্করের নানা গল্প শুনতাম। তাঁর স্কুলে লেখাপড়ার সময়ের কথা, দত্ত বাড়ির পুজোতে আসা। উনি বহু দিন পর্যন্ত গ্রামের স্কুল আর সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজের পুজোতে আসতেন। নেমন্তন্ন জানালেই মানিঅর্ডার করে দক্ষিণা পাঠাতেন তারাশঙ্করবাবু।’’ দত্ত বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ, বিষয় সম্পত্তি নিয়ে আলোচনা-সহ নানা বিষয়ে ওই পরিবারকে লেখা কথা সাহিত্যিকের বিস্তর চিঠিও রয়েছে তাঁদের কাছে।
ওই সব চিঠি, ছবি, সংবর্ধনার মানপত্র-সহ শতাধিক সম্পত্তি নিয়ে একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল ভোলানাথবাবুর ভাইপো বীরেন্দ্রকুমার দত্তের। তার জন্য দীর্ঘ দিন ধরে তিনি বিভিন্ন স্থানে হন্যে হয়ে ঘুরেছেন। কথা ছিল, তারাশঙ্করের জন্ম শতবার্ষিকীতে ওই সংগ্রহশালা গড়ে তোলা উঠবে। কিন্তু, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। বীরেন্দ্রবাবু শেষমেশ বীরভূমের তৎকালীন জেলাশাসক সৌমিত্র মোহনের দ্বারস্থও হয়েছিলেন। প্রস্তাব, পরামর্শ ও আলোচনা অনেক দূর গড়ালেও ওই সংগ্রহশালা আজও গড়ে ওঠেনি।
ইতিমধ্যেই বীরেন্দ্রবাবু প্রয়াত হন। তাঁর শেষ ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে সংগ্রহশালা গড়ার ব্যাপারে প্রশাসনের কাছে যান টুটুলবাবুরাও। কিন্তু, সুফল মেলেনি বলেই তাঁদের অভিযোগ। আর তার পরেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে যৎকিঞ্চিত একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেন টুটুলবাবু। তিনি বলেন, ‘‘জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে আমাদের পরিবার ধাত্রীদেবতার একটি সংগ্রহশালার জন্য বহু চিঠিপত্র, নথি, ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, পরে সেগুলির আর কোনও হদিস পাওয়া যায়নি। আর তাতেই বাবা প্রবল ক্ষুব্ধ হন। তার পরেই পৃথক সংগ্রহশালা গড়ার পরিকল্পনা নেন।’’
তিনি আরও জানান, নতুন এই সংগ্রহশালায় ভোলানাথবাবু, বীরেন্দ্রবাবুকে লেখা ব্যক্তিগত চিঠি, লাভপুরের যাবতীয় উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা, মাতৃভূমির প্রতি মমতা, বিষয় সম্পত্তি নিয়ে আলোচনা, পূজাপার্বণের কথার চিঠিপত্রও থাকছে। থাকছে কথা সাহিত্যিককে নিয়ে প্রকাশিত ওই সময়কার খবরের কাগজ, পত্রপত্রিকার পেপার কাটিংও। তারাশঙ্কর বিষয়ক নানা সভা-সমিতির আলোচনার বেশ কিছু রেকডিংও থাকছে ওই সংগ্রহশালায়। থাকবে দূরদর্শন ও আকাশবাণীতে হওয়া তারাশঙ্কর বিষয়ক অনুষ্ঠানের রেকডিংয়ের কপি। টুটুলবাবু বলছেন, ‘‘আর্থিক সহায়তা পেলে সামগ্রীগুলি ডিজিটাইজ করার পরিকল্পনাও আমাদের মাথায় রয়েছে।’’