Advertisement
E-Paper

প্রশাসকের কড়া অবস্থান, কাজে ফিরলেন ইন্টার্নরা

কলেজ কর্তৃপক্ষের কড়া অবস্থানের জেরে অবশেষে ঝুঁকল বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্নরা। টানা আড়াই দিনের কর্মবিরতি বিনা শর্তেই তুলে নিয়ে শনিবার দুপুরে হাসপাতালের কাজে যোগ দিলেন তাঁরা।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০১৫ ০১:২১

কলেজ কর্তৃপক্ষের কড়া অবস্থানের জেরে অবশেষে ঝুঁকল বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্নরা। টানা আড়াই দিনের কর্মবিরতি বিনা শর্তেই তুলে নিয়ে শনিবার দুপুরে হাসপাতালের কাজে যোগ দিলেন তাঁরা। যদিও হাসপাতালে বিশৃঙ্খলা বাধানোর দায়ে অভিযুক্ত ইন্টার্নদের প্রতি কড়া অবস্থানই বজায় রেখেছেন বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ।

বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম প্রধান বলেন, “কোনও আলোচনা বা শর্ত ছাড়াই কর্মবিরতি তুলেছেন ইন্টার্নরা। হাসপাতালে রোগীর আত্মীয়কে মারধরের ঘটনায় আমরা ছ’জনকে শনাক্ত করে শো-কজ করেছি। ওই ছাত্রদের লিখিত ভাবে জবাব দিতে বলা হয়েছে।” তিনি জানান, সোমবারের মধ্যে অভিযুক্ত ছাত্রদের লিখিত ভাবে কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব দিতে বলা হয়েছে। তারপরেই একটি কমিটি গঠন করে ঘটনার তদন্তে নামবে মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ। মারপিটের ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হাসপাতালের কর্মী ও আধিকারিকদের কাছ থেকে ঘটনার বিবরণও শুনবে তদন্ত কমিটি। অধ্যক্ষ বলেন, “দোষ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ছাত্রদের বিরুদ্ধে আমরা দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেব।”

হাসপাতালের একটি বিশেষ সূত্রে জানা যাচ্ছে, বাঁকুড়া মেডিক্যালের ঝামেলার ঘটনাটির আঁচ গিয়ে পড়েছে খোদ নবান্নেও। মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকেও তদন্ত প্রক্রিয়ার উপর নজর রাখা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে অবশ্য মুখ খুলতে চাননি অধ্যক্ষ। তাঁর কথায়, “ঘটনার পরেই স্বাস্থ্যভবন থেকে দোষী ইন্টার্নদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা সেই নির্দেশ মেনেই কাজ করছি।” ঘটনা হল এতদিন রোগীর বাড়ির লোকের উপরে জুনিয়র ডাক্তারদের হাত তোলার অভিযোগ যেমন উঠত, তেমনই তাঁদেরও মারধর করার অভিযোগ উঠত রোগীর বাড়ির লোকেদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এ বার ইন্টার্নদের বিরুদ্ধে রোগীর আত্মীয়দের মারধরের সময় হাসপাতালের সুপার-সহ কিছু স্বাস্থ্য আধিকারিককেও নিগ্রহ করার অভিযোগ ওঠে। তাতেই বিষয়টি অন্যমাত্র পায়।

ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে বাঁকুড়া মেডিক্যালে ভর্তি হওয়া জয়পুরের রাউতখণ্ডের বাসিন্দা শম্ভুনাথ সেনের (৪৫) মৃত্যু হয় বুধবার রাতে। ওই রাতেই জুনিয়র ডাক্তারদের হস্টেলে একটি অনুষ্ঠান থাকায় বেশ কিছুক্ষণ ওয়ার্ডে কোনও ডাক্তার ছিল না বলে অভিযোগ। শম্ভুনাথবাবুর মৃত্যুর পরে তাঁর এক আত্মীয় জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন ও মারধর করেন বলে অভিযোগ। ঘটনার পর সেই রাতেই কর্মবিরতিতে নামেন ইন্টার্নরা। খবর পেয়ে মাঝরাতে বাঁকুড়া মেডিক্যালের সুপার পঞ্চানন কুণ্ডু হাসপাতালে এলে তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ শুরু করেন জুনিয়র ডাক্তাররা।

অভিযোগ, বিক্ষোভের মাঝেই একদল জুনিয়র ডাক্তার ওয়ার্ডে গিয়ে শম্ভুনাথবাবুর এক আত্মীয়কে টানতে টানতে সুপারের রুমে নিয়ে এসে বেধড়ক মারতে থাকেন। তাঁর মাথায় টেলিফোনের রিসিভার দিয়ে আঘাত করা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হাসপাতালের আধিকারিক ও কর্মীরা তাঁকে বাঁচাতে গেলে জুনিয়র ডাক্তাররা তাঁদেরও মারধর করেন বলে অভিযোগ। সুপার ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গেলে জুনিয়র ডাক্তাররা তাঁকেও হুজ্জুতি করতে ছাড়েননি। সুপারের জামা ধরেও টানাটানি করা হয় বলে জানাচ্ছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে শম্ভুনাথবাবুর আত্মীয়কে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

পুরো ঘটনার পরে জুনিয়র ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছড়ায় খোদ হাসপাতালের আধিকারিকদের মধ্যেই। স্বাস্থ্য ভবনও কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। বৃহস্পতিবারই স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, ওই কর্মবিরতি বেআইনি। না তুললে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাস্তবিক তাই হল। শুক্রবার সকালেও কর্মবিরতি না তোলায় কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত ইন্টার্নদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন। পরে জানানো হয়, ছ’জনকে চিহ্নিত করে শো-কজ করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত জুনিয়র ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের দিকেই পা বাড়ানোয় হাসপাতালের অনেক স্বাস্থ্য কর্মী স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজে এর আগেও অনেকবার রোগীর আত্মীয়দের উপর চড়াও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে জুনিয়র ডাক্তারদের বিরুদ্ধে। প্রতিবারই ঝামেলার পরে চেনা অস্ত্র ‘কর্মবিরতি’-র পথে হাঁটতে দেখা যায় জুনিয়র ডাক্তারদের। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই আলোচনার মাধ্যমে কর্মবিরতি তোলেন। রোগীর আত্মীয়কে মারধরের অভিযোগ উঠলেও আদপে শাস্তি পাননি কোনও জুনিয়র ডাক্তারই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই নরম মনোভাবের জেরেই জুনিয়র ডাক্তাররা বারবার হাসপাতালের পরিষেবাকে অচল করার সাহস দেখাতে পেয়েছে বলে হাসপাতালের আধিকারিকদের একাংশের মত। তাঁদের কেউ কেউ অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘‘কিছু ডাক্তার নিয়মিত হাসপাতালে না থাকাতেই অন্তর্বিভাগ কিছুটা ইন্টার্ন নির্ভর হয়ে পড়েছিল। তাই তাঁদের কেউ কেউ ধরাকে সড়া মনে করছিলেন। এই ধরনের পদক্ষেপ আগে নিলে বুধবার রাতে সুপারের ঘরে হুজ্জুতি হয়তো আটকানো যেত।’’

তবে এ বার একেবারে উল্টো চিত্রই দেখা গিয়েছে। ঘটনার পর কর্মবিরতি তুলতে জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে আলোচনার পথেই হাঁটেননি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। উল্টে তদন্ত প্রক্রিয়া চালিয়ে গিয়েছে সমান ভাবে। দোষী প্রমাণিত হওয়া ছাত্রদের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হবে বলেও গুঞ্জন ওঠে হাসপাতালের অন্দরে। আর তাতেই জুনিয়র ডাক্তাররা দমে গিয়েছেন বলে মত হাসপাতালের আধিকারিকদের একাংশের। খোদ অধ্যক্ষেরই কথায়, “রোগীর আত্মীয় যদি ডাক্তারকে মারধর করে থাকে তাহলে আইনি পথেই তার ব্যবস্থা নেওয়া যেত। আইন হাতে তুলে নেওয়ার কোনও অধিকার জুনিয়র ডাক্তারদের নেই। এই ঘটনা আমরা বরদাস্ত করব না।” যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই ইন্টার্নরা এ দিনও সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে গিয়েছেন।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy