Advertisement
E-Paper

বেনামে তোলা হচ্ছে টাকা, অভিযোগ মহম্মদবাজারে

কালমাটি গ্রামের সীতারাম সোরেন। হরিণসিঙা গ্রামের মোতিলাল সোরেন। একই গ্রামের উকিল মাড্ডি। দু’বছর আগেই সংশ্লিষ্ট স্থানে প্রত্যেকের নাম উঠেছে। কিন্তু, তার পরেও মেলেনি ইন্দিরা আবাস যোজনার একটিও টাকা। অভিযোগ, ব্যাঙ্ক থেকে তাঁদের প্রাপ্য টাকা অন্য কেউ তুলে নিয়েছেন। এক দিকে, যখন এমন অভিযোগ উঠছে, তখন অন্য দিকে ওই গৃহ প্রকল্পের টাকা যাতে বেহাত না হয়ে যায়, তার জন্য টাকা সরাসরি প্রাপকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ার নিয়ম চালু করেছে কেন্দ্র।

ভাস্করজ্যোতি মজুমদার

শেষ আপডেট: ০২ জুলাই ২০১৫ ০১:২৮

কালমাটি গ্রামের সীতারাম সোরেন। হরিণসিঙা গ্রামের মোতিলাল সোরেন। একই গ্রামের উকিল মাড্ডি। দু’বছর আগেই সংশ্লিষ্ট স্থানে প্রত্যেকের নাম উঠেছে। কিন্তু, তার পরেও মেলেনি ইন্দিরা আবাস যোজনার একটিও টাকা। অভিযোগ, ব্যাঙ্ক থেকে তাঁদের প্রাপ্য টাকা অন্য কেউ তুলে নিয়েছেন। এক দিকে, যখন এমন অভিযোগ উঠছে, তখন অন্য দিকে ওই গৃহ প্রকল্পের টাকা যাতে বেহাত না হয়ে যায়, তার জন্য টাকা সরাসরি প্রাপকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ার নিয়ম চালু করেছে কেন্দ্র। সীতারামদের মতো যাঁদের টাকা ইতিমধ্যেই বেহাত হয়েছে গিয়েছে, তাঁদের কী হবে— সে ব্যাপারে অবশ্য কিছু জানা যাচ্ছে না। সম্প্রতি এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ জানিয়ে মহম্মদবাজারের বিডিও-র দ্বারস্থ হয়েছেন হিংলো পঞ্চায়েতের ক্ষতিগ্রস্তদের একাংশ। তার পরেও ছবিটা কতটা বদলাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

গত ৩১ মার্চ কেন্দ্রীয় ওই প্রকল্পের নানা হিসেব চেয়ে একটি আরটিআই দাখিল করেছিলেন বীরভূম জেলা আদিবাসী গাঁওতার দুই নেতা সুনীল সোরেন এবং রবিন সোরেন। ওই প্রকল্পে এলাকার কত জনের নামে টাকা বরাব্দ হয়েছে, এ পর্যন্ত কে কত টাকা পেয়েছেন— সে বিষয়ে সবিস্তারে তথ্য চাওয়া হয়। সুনীলবাবুদের দাবি, ওই আরটিআই থেকেই সাফ হয়েছে যায়, ২০১৩-’১৪ আর্থিক বর্ষে বেনিফিসিয়ারিতে থাকা এলাকার ৩৬ জনের নামে গৃহ প্রকল্পের টাকার অনুমোদন মেলে। অধিকাংশ প্রাপকদের নামে বরাদ্দ সমস্ত টাকাই তুলে নেওয়া হয়েছে। অথচ মতিলাল সোরেন, সীতারাম সোরেন এবং উকিল মাড্ডিদের মতো প্রাপকেরা এক টাকাও হাতে পাননি। কেউ কেউ আবার প্রথম কিস্তির টাকা পেয়ে বাকি টাকা পাননি।

কিন্তু, গৃহ প্রকল্পের টাকা তো সরাসরি প্রাপকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ার কথা। তা হলে হাতিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে? সুনীল এবং রবিনদের অভিযোগ, ‘‘অশিক্ষা ও সরলতার সুযোগ নিয়ে গরিব খেটে খাওয়া মানুষকে এক শ্রেণির লোক জন নানা ভাবে ঠকায় এ ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই হয়েছে। আমাদের ধারণা গৃহ প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দের টাকা উঠে গিয়েছে, অথচ টাকা পাননি— এমন ব্যক্তিদের নামে ব্যাঙ্কে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।’’

Advertisement

কী ভাবে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট খোলা হয়? তাঁদের দাবি, ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলতে যে সব বৈধ কাগজপত্র প্রয়োজন, ওই সব অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিতদের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাঁদের ভুল বুঝিয়ে, তা সংগ্রহ করে নেওয়া হয়। কখনও কখনও কর্মীদের একাংশের যোগসাজশে ভুয়ো নথিতেই ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলে, টাকা হাতিয়ে নেয় কেউ কেউ। তাঁরা বলেন, ‘‘অনেক দিন ধরেই এ রকম নানা সরকারি প্রকল্পের টাকা গরিব মানুষের নামে বরাদ্দ হলেও তাঁরা ঠিকমতো পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ পাই। এ বারে গৃহ প্রকল্পের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা কানে আসতেই আমরা ওই আরটিআই করি। এ ব্যাপারে তদন্ত সাপেক্ষে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে আমরা উচ্চ আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’

প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রের খবর, মহম্মদবাজারের হিংলো পঞ্চায়েত এলাকায় বসবাসকারী বেশ কিছু মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন। ২০১৩-’১৪ আর্থিক বর্ষে বেনিফিসিয়ারি কমিটি দ্বারা তাঁদেরই কয়েক জনের নাম ইন্দিরা আবাস যোজনায় নথিভুক্ত হয়। এই নাম নথিভুক্ত হওয়া অনেকেরই টাকার সরকারি অনুমোদন মেলে ২০১৫-’১৬ অর্থবর্ষে। যাঁদের নামে টাকা মঞ্জুর হয়েছে, তাঁদের কেউ টাকা পেয়েছেন। আবার কেউ টাকা পাননি। বিডিও থেকে জেলাশাসক— প্রশাসনের সর্ব স্তরে লিখিত অভিযোগ জানিয়েও কোনও সুরাহা মেলেনি বলে দাবি মোতিলাল সোরেন। বুধবার তিনি দাবি করেন, ‘‘অনেক দিন থেকেই শুনছি, প্রকল্পে আমার নামে ঘর মঞ্জুর হয়েছে। আমার মতো এলাকার অনেকের নামেই ওই প্রকল্পে ঘর মঞ্জুর হয়েছিল। তাঁদের কেউ কেউ এক কিস্তি, দু’ কিস্তি বা প্রকল্পের সমস্ত টাকাই পেয়ে গিয়েছেন। আমি এ-ও জানতে পেরেছি, আমার নামে বরাদ্দ টাকা ব্যাঙ্ক থেকে উঠে গিয়েছে। কিন্তু, আমি-ই সেই টাকা আজ পর্যন্ত পাইনি!’’ একই অভিযোগ সীতারাম সোরেন, উকিল মাড্ডিদেরও।

অভিযোগ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে পঞ্চায়েতের উপপ্রধান, তৃণমূলের শিব দাস পাল্টা দাবি করেন, ‘‘যে ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, তাঁর নামে কোনও দিনই টাকা বরাদ্দ হয়নি। যাঁর নামে টাকা বরাদ্দ হয়েছে, তিনি ওই গ্রামেরই মোতিলাল হাঁসদা। বিপিএল কার্ডে ভুল করে তাঁর নাম মতিলাল সোরেন রয়েছে।’’ তাঁর বক্তব্য, গোটা বিষয়টিই ভুল বোঝাবুঝির জের। অভিযোগকারীর নামে পরে টাকা আসবে। বাকিরা কেন টাকা পাননি, তার অবশ্য সদুত্তর মেলেনি। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যায়নি।

এ দিকে, জেলাশাসক পি মোহন গাঁধী জানান, মহম্মদবাজারের বিডিও-কে অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বিডিও সুমন বিশ্বাসের দাবি, ‘‘দুর্নীতি ঠেকাতে হ প্রকল্পের টাকা সরাসরি প্রাপকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে। কাজেই এ ক্ষেত্রে কেউ কী ভাবে টাকা হাতিয়ে নিল, তা গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’’ তদন্তে কোনও দুর্নীতি ধরা পড়লে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তাঁর আশ্বাস।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy