বন্ধুদের সঙ্গে বন্যা দেখতে গিয়ে লাভপুরের লাঘাটায় কুঁয়ে নদীতে জলের তোড়ে ভেসে গেল দুই ছাত্র। শনিবার সকাল সাড়ে ১০ টার ঘটনা। তিন বন্ধুর একজনকে প্রবল স্রোতের মুখ থেকে উদ্ধার করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। লাভপুরের বিডিও জীবনকৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, ‘‘ওই ছেলে দুটির খোঁজে একটি স্পিড বোট ও নৌকা নামানো হয়েছে। এখনও পর্যন্ত কোনও খোঁজ মেলেনি তাদের।’’
কী হয়েছিল এ দিন সকালে?
পুলিশ এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এ দিন সকাল থেকেই কুঁয়ে নদীর জল উঠে যায় সিউড়ি-কাটোয়া সড়কের লাঘাটা সেতু। বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। স্থানীয় মানুষজনের কথায় ওই ‘বান পড়া’ দেখতে ভিড় জমে যায় বাসিন্দাদের। এ দিনই সকালে ৯টার দিকে বাড়ি থেকে ‘বান’ দেখতে বের হয় স্থানীয় যাদবলাল হাইস্কুলে তিন ছাত্র সৌমিক পাত্র, প্রকাশ পাত্র এবং শুভদীপ পাত্র। সৌমিক দশম শ্রেণিতে পড়ে। প্রকাশ ও শুভদীপ একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। শুভদীপ ও সৌমিকের বাড়ি লাভপুর সাহাপাড়া। প্রকাশের বাড়ি, লাগোয়া পাঁইফলার পাড়।
ঘটনার দীর্ঘক্ষণ পরেও আতঙ্কের রেশ কাটেনি সৌমিকের চোখে মুখে। লাভপুরের বাড়িতে বসে সে জানায়, ‘‘আমরা সেতুর গার্ডওয়ালের স্তম্ভ ধরে পায়ে পায়ে নদীর জল মাপছিলাম। হঠাৎ প্রবল স্রোতে পা হড়কে যায়। হাত ছাড়া হয়ে যায় স্তম্ভ। তারই মধ্যে পাক খেয়ে আমি অন্য একটি স্তম্ভ ধরে ফেলি। কিন্তু প্রকাশ ও শুভদীপ তলিয়ে যায়!’’ সৌমিককে এ দিন উদ্ধার করেছে বান দেখেতে আসা প্রায় তারই সমবয়সী স্থানীয় পূর্ব কাদিপুরের অসিত দাস, রাহুল দাস, রবি দাসরা। তারা জানায়, ‘‘আমরা তখন কোমর সমান জলের নীচে তলিয়ে যাওয়া সেতুর উপর দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ শুনি ‘বাঁচাও-বাঁচাও’ চিৎকার। দেখি আমাদেরই সমবয়সী এক ছেলে একটি স্তম্ভ ধরে ভেসে রয়েছে। গামছা ছুড়ে কোনওরকমে তাকে টেনে তুলি। তারই মধ্যে এক নিমেষের জন্য প্রায় ৩০ ফুট দূরে প্রবল স্রোতে মোচড় খেতে খেতে তলিয়ে যেতে দেখি আরও দুটি শরীর। সেই সময় কাছেপিঠে কোনও নৌকা না থাকায় কিছু করারও ছিল না।’’
প্রকাশ ও শুভদীপ ভেসে গিয়েছে, এই খবর পৌঁছতেই কান্নার রোল পড়ে যায় তাদের বাড়িতে। কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না শুভদীপের বাবা সেলাই দোকানের কর্মী অরুণবাবু ও প্রকাশের বাবা গয়নার দোকানের কারিগর প্রশান্তবাবু। প্রকাশের মা মৌসুমিদেবী এবং শুভদীপের মা ঝুমাদেবী কেঁদে যাচ্ছিলেন নাগাড়ে। মৌসুমীদেবী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘‘ওরে বান দেখা হল, এবার স্নান করে ভাত খেয়েনে। এরপর স্কুলে দেরি হয়ে যাবে!’’ স্থানীয় বাসিন্দা তুলিকা সাহা, দুলাল ধীবররা বলেন, ‘‘ছেলেরা স্কুলে যাবে বলে রান্না করেছিলেন মায়েরা। কীভাবে যে কি হয়ে গেল!’’
লাঘাটায় নদী পারপারের এই দুর্ভোগ দীর্ঘ দিনের। ২০০৭ সালেও ওই এলাকায় নৌকা ডুবিতে তলিয়ে যান স্থানীয় গোবিন্দপুরের বধু অনিমা থান্দার। সেবারে স্বামী মিঠুন এবং পাঁচ বছরের মেয়ে রনিকে নিয়ে বাপের বাড়ি থেকে ফিরছিলেন অনিমাদেবী। লাঘাটায় নদী পার হওয়ার সময় খেঁজুর গাছে ধাক্কা মেরে নৌকা উল্টে যায়। তখন মিঠুনবাবু-সহ অন্যরা সেই খেঁজুর গাছে ঝুলে থাকেন। অনিমাদেবী কোলের মেয়েকে তাঁদের দিকে ছুড়ে দিয়ে নিজে তলিয়ে যান। পরে উল্টে যাওয়া নৌকার তলা থেকে উদ্ধার হয় তার দেহ।
ঘটনা হল, কুঁয়ে নদীতে জল বাড়লেই প্রতিবছর একাধিক বার তলিয়ে যায় নিচু সেতু। তখন বন্ধ হয়ে যায় সিউড়ি-কাটোয়া, লাভপুর-বোলপুর সড়কের যান চলাচল। স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতির পক্ষ থেকে অবশ্য নদী পারাপারের জন্য নৌকার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সব সময় সেই নৌকাও মেলে না। আবার গাদাগাদি পারাপারের ফলে নৌকাডুবির ঘটনাও ঘটে। পাশাপাশি ডুবে যাওয়া সেতুর উপর দিয়েই চড়া ভাড়ার বিনিময়ে গরুর গাড়ি, ভটভটিতে লোক মোটর বাইক পার করানো হয় বলেও অভিযোগ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওইভাবেই পারাপার করতে মানুষকে। আরও একটি বিপদজনক পারাপার ছিল এতদিন। লাগোয়া রেলসেতুর স্লিপারের উপর দিয়ে সাইকেল ঘাড়ে যাতায়াত করতেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কিন্তু ব্রডগেজের জন্য পুরনো সেই সেতু ভেঙে পুনঃনির্মানের কাজ চলছে। অথচ লাঘাটায় একটি উন্নত মানের সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের। গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে ওই সেতুর শিলান্যাসও করেন তদানীন্তন পূর্তমন্ত্রী ক্ষিতি গোস্বামী। কিন্তু সেতু তৈরির কোনও উদ্যোগ আজও নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
লাভপুর বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মনীষা বন্দোপাধ্যায় বলেন, ‘‘প্রশাসন সময়ে সজাগ হলে অনেক দুর্ঘটনা এবং হয়রানি এড়ানো যেত। এ দিন নদী পার হতে না পারায় আমাদের স্কুলেরই ৬ জন শিক্ষিকা অন্য পাড় থেকে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।’’
লাভপুরের বিডিও জীবনকৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, ‘‘সেতুর শিলান্যাস বিধানসভা ভোটের আগে হয়েছিল বলে শুনেছি। সেতুটি সত্যি প্রয়োজন। সে জন্য উপরমহলে কথা চলছে।’’ জেলা সভাধিপতি বিকাশ রায় চৌধুরী বলেন, ‘‘কোনওরকম অর্থের সংস্থান না করেই রাজনৈতিক কারণেই সেতুর শিলান্যাস হয় বাম আমলে। আমরা সেতুর প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে, গ্রামীণ এলাকা উন্নয়ন তহবিল থেকে সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছি।’’