বিজ্ঞানের আলোকে সমাজ— এই বিষয়ের উপর জেলা স্তরের বিজ্ঞান নাটক প্রতিযোগিতা হয়ে গেল পুরুলিয়া জেলা বিজ্ঞান কেন্দ্রে। রাষ্ট্রীয় বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, নজরুল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও বেসরকারি বাবলিং বাড্স স্কুল—এই তিন স্কুল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। তিনটি স্কুলের নাটকের বিষয়বস্তুতেই অভিনবত্ব ছিল। তবে, সেরার শিরোপা পেয়েছে বাবলিং বাড্স।
বাবলিং বাডসের ‘রুখা মাটির কঁকানি’ নাটকে ভূমিক্ষয়ের বিরুদ্ধে মানুষের সচেতনতাকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই নাটকের পরিচালক সুদিন অধিকারী বলেন, ‘‘এক ইঞ্চি মাটি তৈরি হতে পাঁচশো বছর লাগে। যে-ভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো ইটভাটা গজিয়ে উঠছে, তাতে ভবিষ্যতে চাষের জমি পাওয়া যাবে না। আমরা এই বিষয়টিই নাটকে রেখেছি।’’ রাষ্ট্রীয় বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা ‘চেতনা’ নামে যে নাটক উপস্থাপন করে, তার থিম ছিল কুসংস্কারের সঙ্গে বিজ্ঞানের লড়াই। শেষে বিজ্ঞানই জেতে। এক কিশোরীকে সাপে ছোবল মারার পরে অন্ধবিশ্বাস থেকে বাড়ির লোকজন ওঝাকে খবর দেয়। ওঝা এসে যথারীতি ঝাড়ফুঁক শুরু করে। খবর পেয়ে সেখানে বিজ্ঞান মঞ্চের কর্মীরা উপস্থিত হন। আসেন চিকিৎসকও। চিকিৎসায় কিশোরী সুস্থ হয়। ওঝার বুজরুকি শেষ হলে সে রাগে গজরাতে গজরাতে সেখান থেকে কেটে পড়ে। এই নাটকটি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। এই নাটকের রচনা ও পরিচালনা স্কুলেরই দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী সুপ্রভা নন্দীর। তার কথায়, ‘‘অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’’
অন্য দিকে, নজরুল বালিকা বিদ্যালয়ের ‘সত্যসন্ধানী’ নাটকে কুসংস্কারকে সামনে রেখে কিছু ধান্দাবাজ মানুষ সাধারণ লোককে কী ভাবে প্রতারিত করছে, সেই বিষয়টি দেখানো হয়েছে। দুই বিজ্ঞানমনস্ক যুবক কলকাতা থেকে ওই গ্রামে পৌঁছে প্রতারণার বিষয়টি মানুষজনের সামনে প্রকাশ করে দেন। প্রতিযোগিতায় এই নাটকটি তৃতীয় হয়েছে। জেলা বিজ্ঞান কেন্দ্রের আধিকারিক ঋতব্রত বিশ্বাস বলেন, ‘‘মূলত বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে এবং সচেতনতার বার্তা দিতে আমরা এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছি। নাটক, গান বা এই ধরনের মাধ্যম থেকে সতেচনতার বার্তা আরও বেশি করে পৌঁছে দেওয়া যায়। এই প্রতিযোগিতার প্রথম স্থানাধিকারী কলকাতায় রাজ্যস্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।’’ কিন্তু জেলাস্তরের প্রতিযোগিতায় কেন মাত্র তিনটি দল অংশ নিয়েছে, এ প্রশ্নের জবাবে ঋতব্রতবাবু জানান, তাঁরা ২৫টি স্কুলকে চিঠি দিয়েছিলেন। তিনটি স্কুল সাড়া দেওয়ায় তাদের নিয়েই প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে।
পড়ুয়াদের সচেতন করতে গ্রামাঞ্চলে চলা নানা ধরনের বজরুকি ও অন্ধবিশ্বাস নিয়ে পুরুলিয়ারই বরাবাজারের চন্দনপুর স্বামী বিবেকান্দ হাইস্কুলে এক মজার প্রদর্শনী করেছে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ। ওই প্রদর্শনীতে হাতের তালুতে আগুন জ্বালানো, শূন্য থেকে মাদুলি আনা, সাদা রঙের ফুল লালে পরিণত করা— এ রকম নানা খেলা দেখালেন বিজ্ঞান মঞ্চের সদস্যেরা। বুধবার ওই প্রদর্শনী দেখে ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি অভিভাবক ও শিক্ষকরাও হাততালি দিলেন। খেলা দেখানোর শেষে সদস্যেরা সকলকে জানালেন, এগুলি কোনও জাদুবিদ্যা নয়। সবই বিজ্ঞানের কৌশল। বিজ্ঞান মঞ্চের জেলা কমিটির সম্পাদক নয়ন মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আমন্ত্রণ পেলে আমরা বিভিন্ন স্কুলে বা ক্লাবে এই ধরনের বিজ্ঞানের কৌশল দেখাই। গ্রাম বাংলায় এখনও এ সব খেলা দেখিয়ে বহু বুজরুকি চলে। সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়েন।’’
সম্প্রতি বরাবাজারের এই স্কুলের দুই ছাত্রছাত্রী ক্লাস চলাকালীন হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ করেছিল। তাতে অন্য পড়ুয়ারা ভয় পেয়ে যায়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক কিরীটীভূষণ মাহাতো বলেন, ‘‘ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ভয় ছড়ানোয় স্বাভাবিক পঠনপাঠন ব্যাহত হচ্ছিল। বিজ্ঞান মঞ্চকে স্কুলের পক্ষ থেকে এখানে একটি প্রদর্শনী করার অনুরোধ করা হয়েছিল।’’ নয়নবাবুর কথায়, ‘‘আমি নিজে এক জন চিকিৎসক। স্কুলে এসে ছাত্রটিকে পরীক্ষা করে বুঝতে পারলাম, ওর সাময়িক মনোবিকার ঘটেছে। যে কারণে এই ধরনের কাণ্ড ঘটাচ্ছে। ছাত্রটিকে পুরুলিয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি করে দিই। এখন ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।’’