নিখোঁজের প্রায় দু’ সপ্তাহ পরও হদিস নেই বোলপুরের সেই গাড়ি চালক মনু চৌধুরীর!
বছর চারেকের ছেলে, স্ত্রী, বাবা, মা, দাদা, বউদি ও ভাইঝিকে নিয়ে মনুর সংসার। পাড়া প্রতিবেশী-পরিজন মহলের কাছে তাঁর অন্তর্ধান রহস্যময় হয়ে উঠেছে। নানা আশঙ্কা দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে। তার ফেরার পথ চেয়ে, ছবি এবং সবিস্তার তথ্য নিয়ে এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে তাঁর পরিবার। জেলা পুলিশ তদন্তে নেমেও দু’সপ্তাহ পরেও তেমন কোনও তথ্যই দিতে পারেনি! সবার প্রশ্ন, কোথায় গেল মনু?
অগস্ট মাসের ২১ তারিখ হাজারদুয়ারি ভাড়া নিয়ে গিয়ে, নিখোঁজ হন বোলপুর পুরসভার পাঁচ নম্বার ওয়ার্ডের দক্ষিণ গুরুপল্লির বাসিন্দা, ইংরেজির স্নাতক মনু চৌধুরী। নিখোঁজের ডায়েরি থেকে শুরু করে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে ভাড়া করতে আসা দুই যুবকের স্কেচ প্রকাশ ইতি মধ্যেই করেছে জেলা পুলিশ। তদন্তের কাজে অহেতুক দেরির অভিযোগ তুলে, নিখোঁজ যুবকের পরিবার ও বোলপুর-শান্তিনিকেতন এলাকার গাড়ির চালকেরা বিক্ষোভ ও থানা ঘেরাও করেছেন। অবিলম্বে তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার আর্জিতে বোলপুরের এসডিপিওর দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁরা। কিন্তু এতদিনেও কোন হদিস না পেয়ে কার্যত দিশেহারা গোটা পরিবার।
গুরুপল্লির বাড়িতে পৌঁছতেই, তাঁর পরিবার কিছু বলার আগেই, প্রতিবেশী এবং আত্মীয়রা জানান, দিন দশেক ধরে চৌধুরী পরিবারের নাওয়া, খাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ছেলের বাড়ি ফেরার পথ চেয়ে, সিআরপিএফের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী নির্মলবাবু প্রায়-ই বাড়ির বাইরেই বসে থাকেন। কখনও বউমা রুবি দেবীকে, আবার কখন নিজের মনকে কোনও রকমের বোঝানোর চেষ্টা করেন। ছেলের জন্য ভেবে ভেবে মাঝে মাঝেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মনু বাবুর মা যোগমায়াদেবী। চশমা খুলে চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি জানান, কর্মসূত্রে নির্মলবাবু মণিপুরে থাকার সময়ে জন্ম হয় মনুর। বলেন, ‘‘মনুর পঠন পাঠন, বেড়ে ওঠা ওখানেই। চার-চারটি ভাষায় ওর অদ্ভুত দক্ষতা ছিল। কোথায় যে গেল ছেলেটা! জানেন, কিছু কবে ফিরবে!’’
বোলপুর কলেজের ইংরেজি স্নাতক, বছর ৩২শের যুবক মনু বাংলার পাশাপাশি মনিপুরী, হিন্দি এবং ইংরেজিতে তুখোড়, জানাচ্ছে তাঁর পরিবার। পরিবার সূত্রের খবর, প্রথমে নিজে গাড়ি কিনে, ব্যবসা করেন। ব্যবসা হয়তো ভাল না চলার কারণে, গাড়ি বেচে অন্যের গাড়ি চালাতেন। অনেক বার গাড়ি নিয়ে বাইরে গিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী রুবিদেবী বলেন, ‘‘শুক্রবার দিন সকালে জল খাবারে মুড়ি খেয়ে বেরিয়েছিলেন। বাইরে ভাড়া না পেলে সাধারণত দুপুরের খাবার বাড়িতে খান। কিন্তু সেদিন আর দুপুরে বাড়ি ফেরেনি!’’ নির্মলবাবু বলেন, ‘‘বাজার হাট করার জন্য সে দিন বেরিয়েছিলাম। নিজে এটিএম থেকে টাকা তুলতে পারি না। তাই ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে মনুকে দেখে, ডেকে নিয়ে হাজার দুয়েক টাকা তুললাম। সেই শেষ দেখা, ছেলের সঙ্গে! সেই শেষ!’’
দুপুরে মনু বাড়ি ফিরছে না দেখে, বার কয়েক ফোন করেছিলেন নির্মলবাবু। কিন্তু ফোন ধরেননি সে। পরে পৌনে দুটো নাগাদ, ফোন করে জানান, বাইরে ভাড়ায় যাচ্ছেন। রাতে এক বারের জন্য শুধু কথা হয়েছে বাবার সঙ্গে। তখনই শেষ কথা বলে ছিল, ‘‘সকালে ফিরব’’।
এরপর আর কোনও যোগাযোগ নেই চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে মনুর। নিখোঁজের দিন চারেক ধরে সমানে ফোন বেজে যাওয়ার পর। একসময় মোবাইল বন্ধ হয়ে যায়। বলেছিলেন নির্মলবাবু। ইতিমধ্যেই, চক্ষু চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত দাদা অর্জুনবাবু কখন চালকদের সঙ্গে আবার কখন নিজেই বা কোন সময়ে পুলিশকে নিয়ে হাজারদুয়ারি এবং আশেপাশের থানা এলাকায় খোঁজ খবর করেছেন।
নবগ্রাম, সাগরদিঘি, ফারাক্কা, কালিয়াচক, পলসুন্দা, গোয়ালযান-সহ একাধিক এলাকায় ঘুরে ঘুরে ভাইয়ের সন্ধানে নেমেছেন। কিন্তু নিখোঁজের তেরো দিন পরেও কোন হদিস নেই মনুর!
তদন্ত কত দূর?
জেলা পুলিশের এক কর্তা জানান, টোলগেটের সিসি টিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়েছে। ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে সন্দেহভাজন দুই ভাড়াটের স্কেচ করে শহরে দেওয়া হয়েছে। নিয়ম মেনে নিখোঁজ যুবকের ছবি ও তার বিবরণও পাঠানো হয়েছে থানায় থানায়। শুধু তাই নয়, হাজারদুয়ারি এবং সংলগ্ন উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত থানা এবং রাস্তার ধারের এলাকায় পুলিশ দল পাঠিয়ে খোঁজ খবর এবং সন্ধানের কাজ চলছে।