উদ্ধার হওয়া শিশু, অপরাধের সঙ্গে জড়িত বা অপরাধের শিকার নাবালকদের সঙ্গে পুলিশ কেমন ব্যবহার করবে তা নিয়ে মঙ্গলবার একদিনের রিফ্রেশার্স প্রশিক্ষণ শিবির হল জেলা পুলিশের অতিথি আবাস ক্ষণিকায়। শিক্ষার্থী হিসেবে ডাকা হয়েছিল জেলার ২০টি থানারই সেকেন্ড অফিসারদের। প্রশিক্ষণের উদ্যোক্তা, যৌথ ভাবে জেলা প্রশাসন ও জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ।
জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের সদস্য সচিব রোহন সিংহ ছিলেন এ দিনের শিবিরের মূল প্রশিক্ষক। তিনি বলেন, “এখন শিশুদের সুরক্ষায় প্রতিটি থানার সেকেন্ড অফিসাররাই চাইল্ড প্রোটকশেন অফিসার হিসেবে কাজ করছেন।” প্রশিক্ষণের শুরুতে রোহনবাবু শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্ন রাখেন, কোনও নাবালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে, তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে আসা হবে কিনা। শিক্ষার্থীদের থেকে তেমন উত্তর না পেয়ে তাঁর পরের প্রশ্ন, “অপরাধ যদি সিরিয়াস হয়?” অনেককে চুপ থাকতে দেখে, প্রশিক্ষক নিজেই জবাব দিলেন, “অপরাধ সিরিয়াস হলেও মনে রাখতে হবে কোনও শিশুকে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে আসা চলবে না।”
কার্যত প্রশিক্ষণ শিবিরে জুভেনাইল জাষ্টিস অ্যাক্ট, ২০০৬ ও পকসো(প্রোটেকশন অফ চাইল্ড ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্স অ্যাক্ট) সম্পর্কে প্রতিটি থানার সেকেন্ড অফিসার, যাঁরা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে শিশু বা নাবালকদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করবেন সে সম্পর্কে তাঁদের জানান হয়। রোহনবাবু বলেন, “এখন বিভিন্ন জায়গা থেকে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের উদ্ধার করছে পুলিশ। তাছাড়া অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া শিশু বা শিশুদের প্রতি অপরাধ বিভিন্ন জায়গায় সংগঠিত হচ্ছে।”
প্রশিক্ষণ চলাকালীন রোহনবাবু প্রশ্ন করেন, “ধরুন কোনও অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেই অপরাধ সম্পর্কে আপনি সেই শিশুটিকে কিছু জিজ্ঞাসা করছেন। আপনি বুঝতে পারছেন সেই শিশুটি আপনাকে যা বলছে তার সবটা ঠিক নয়। পরিস্থিতির বিচারেই তা আপনি অনুধাবন করছেন। আপনি কি করবেন?” এবারও শিক্ষার্থীদের থেকে মৃদু গুঞ্জন ওঠে। প্রশিক্ষক বলেন, “সেই শিশুটি ঠিক বলছে না বুঝলেও আপনি তাঁকে ধমকে থামিয়ে দেবেন না। কেন না সেই শিশুটিই হয়তো তারপর এমন কোন সূত্র আপনাকে দেবে, যে আপনার তদন্তের অভিমুখটাই বদলে যাবে। অথবা আপনি সেই সূত্রটা পেয়ে যাবেন যা আপনি খুঁজছিলেন। সেই সূত্রটাই হয়তো তদন্তের কাজে আপনাকে সাহায্য করবে।”
রোহনবাবু পুলিশকর্মীদের সতর্ক করে দেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় অভিযুক্ত শিশুর যেন মনে না হয় যে, সে অপরাধী। পুলিশকর্মী তাঁকে সহায়তা করছে, এমনটাই মনে হওয়া উচিত। তার জন্য যেমন পুলিশের পোষাক পরে শিশুদের জেরা না করা হয়। এওমনও বলেন, “সবদিন আপানার মানসিক অবস্থা ভালো থাকে না। ধরুন সেদিন এমন একটি কেস আপনার কাছে এল যে, আপনার সত্যিকারের মানসিক অবস্থা ভালো নেই। সেদিন আপনার পক্ষে ধৈয সহকারে একটি নাবালককে জিজ্ঞাসাবাদ করার মত মানসিক অবস্থা নেই। সে দিন শিশুর কেস ধরবেন না।” শিক্ষার্থীদের তাঁর পরামর্শ, “যখন বুঝতে পারবেন মানসিক ভাবে আপনি ঠিকঠাক আছেন তবেই শিশুদের নিয়ে কাজ করবেন। মনে রাখতে হবে আপনার শরীরী ভাষা হবে সেই শিশুটির পক্ষে। কোনভাবেই রুঢ় ব্যবহার করবেন না।”
এ দিনের শিবিরে ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দ্যুতিমান ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “শিশুদের নিয়ে যে আইনগুলি রয়েছে সে সম্পর্কে পুলিশ কর্মীদের অবহিত করা হল। এতে পুলিশ কর্মীদের সুবিধে হবে শিশুদের নিয়ে কাজ করতে। কেন না তাঁরাই তো প্রতিটি থানায় শিশুদের নিয়ে কাজ করবেন।” জেলা শিশু সুরক্ষা সমিতি নামে পুলিশ পৃথক একটি শাখাও চালু করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক(সাধারণ) সবুজবরন সরকার বলেন, “শিশুদের সুরক্ষার জন্য যে আইনগুলি রয়েছে সে সম্পর্কে পুলিশ কর্মী ও তাঁদের নিয়ে যে সমস্ত সংগঠনগুলি কাজ করে তাঁদের এ দিনের শিবিরে ডাকা হয়েছিল। নতুন কিছু আইন তৈরি হয়েছে, সে সম্পর্কে প্রত্যেককে অবহিত করাই ছিল প্রশিক্ষণ শিবিরের উদ্দেশ্য।”