Advertisement
E-Paper

সিলিন্ডার ফেটে মৃত বেলুনওয়ালা

গ্যাস সিলিন্ডারের মাথায় নলের মুখে বেলুন লাগিয়ে হাতল ঘুরিয়ে বেলুন ফোলাচ্ছিলেন মাঝ বয়েসি বেলুনওয়ালা। তাঁকে ঘিরে ছিল বেশ কয়েকজন কম বয়েসি ছেলে। হঠাৎ বিরাট শব্দ করে সেই সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ। প্রচন্ড ধোঁয়ার মধ্যে চারপাশে ছিটকে পড়ল সেই গাড়ি ঘিরে থাকা সবাই।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০১৫ ০২:০৬
আহত রাজেশ মাঝি। পুরুলিয়া হাসপাতালে। —নিজস্ব চিত্র।

আহত রাজেশ মাঝি। পুরুলিয়া হাসপাতালে। —নিজস্ব চিত্র।

গ্যাস সিলিন্ডারের মাথায় নলের মুখে বেলুন লাগিয়ে হাতল ঘুরিয়ে বেলুন ফোলাচ্ছিলেন মাঝ বয়েসি বেলুনওয়ালা। তাঁকে ঘিরে ছিল বেশ কয়েকজন কম বয়েসি ছেলে। হঠাৎ বিরাট শব্দ করে সেই সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ। প্রচন্ড ধোঁয়ার মধ্যে চারপাশে ছিটকে পড়ল সেই গাড়ি ঘিরে থাকা সবাই। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মানবাজার থানার পুঁড়রু গ্রামে একটি মেলায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। বিস্ফোরণে আহত হন বেলুন বিক্রেতা আখতার আনসারি (৪০)-সহ ১১ জন। পরে আখতারের মৃত্যু হয়। আহতদের মধ্যে অনেকেই বালক। তাদের অনেকের দেহের বিভিন্ন অংশ ঝলসে গিয়েছে।

আখতারের বাড়ি বোরো থানা এলাকার পাতাপাহাড়ি গ্রামে। পুরুলিয়া সদর হাসপাতালে আহতদের সঙ্গে রাতে যখন তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয় তখনও দেহে প্রাণ ছিল। কিন্তু অবস্থা আশঙ্কাজনক থাকায় তাঁকে পুরুলিয়া থেকে ঝাড়খণ্ডের জামশেদপুরে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। পুরুলিয়ায় যাদের ভর্তি করা হয়েছে, তাদের বেশির ভাগেরই বয়স দশ-বারো বছরের মধ্যে। বর্তমানে পুরুলিয়া হাসপাতালে ৮ জন বালক ও একজন প্রৌঢ় ভর্তি রয়েছেন। এক কিশোরকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মানবাজার থানা এলাকার পুঁড়রু গ্রামে এই মেলাটি চলছিল। দিনের বেলায় মোরগ লড়াইয়ের শেষে রাত্রে ছৌ নাচের আসর ছিল। মেলায় আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে বহু লোকজন এসেছিলেন। বোরো গ্রামের পাতাপাহাড়ি থেকে মেলায় গ্যাস বেলুন বিক্রি করতে এসেছিলেন আখতার। তিনি বিভিন্ন মেলায় বেলুন বিক্রি করতে যান। তাঁর বেলুনের গাড়ি ঘিরে দাঁড়িয়ে বেলুন ফোলানো দেখছিল উৎসুক বালকরা। কেউ কেউ কিনছিল। সেই সময়েই বিপত্তি ঘটে।

পুরুলিয়া সদর হাসপাতালের মেল সার্জিক্যাল ওয়ার্ডের বিছানায় শুয়েছিল রঞ্জিত মাহাতো নামের এক কিশোর। তার গলা ও হাতের চামড়া বিস্ফোরণে উত্তাপে ঝলসে গিয়েছে। সেখানে মলম লাগানো ছিল। কোনওরকমে সে বলে, ‘‘আমি মেলাতেই একটি খাবারের দোকানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার সঙ্গে ছিল ভাই চিরঞ্জিৎ। কিছুটা দূরে রাস্তার পাশেই গ্যাসের বেলুন বিক্রি হচ্ছিল। সেখানেও বেশ কয়েকজন ছিল। হঠাৎ কানফাটা শব্দ। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গরম কিছু লাগল। তারপর দেখি হাত-গলা জ্বলছে। ভাইয়েরও আঘাত লেগেছে।’’ সে জানায়, সিলিন্ডারটা ভেটে গিয়েছিল। গ্যাসের তীব্রতায় চারপাশে জড়ো হওয়া সবাই মাটিতে ছিটকে পড়েছিল। ছটফট করছিল। সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকজন দৌড়ে এসে তাদের উদ্ধারে হাত লাগান।

মেলা বসেছে মানবাজার থানার শেষ প্রান্তের একটি গ্রামে। পাশেই বরাবাজার থানা এলাকা। বরাবাজার থানার রানিপুকুর গ্রামের তৃতীয় শ্রেণীর পড়ুয়া সঞ্জয় মাঝিও মেলায় এসেছিল। হাসপাতালে সে বলে, ‘‘আমরা বেলুন ফোলানো দেখছিলাম। হঠাৎ কী হল জানি না। সবাই ছিটকে পড়লাম। আর কিছু মনে নেই।’’ বোরো থানার পুঁড়দহা গ্রামের রাজেশ মাঝি বিস্ফোরণের পর থেকেই চোখ খুলতে পারছে না। থেকে থেকেই কেঁদে উঠছিল ওই বালক। রাজেশের সঙ্গে হাসপাতালে এসেছে তার জেঠিমা রুদুন মাঝি। তিনি জানান, রাজেশ কিছুতেই চোখ খুলতে পারছে না। বলছে খুব ব্যথা করছে। তাঁর আশঙ্কা, ‘‘কী যে হল ছেলেটার চোখে কে জানে!’’

পুঁড়রু গ্রামের বাসিন্দা অনিমা মাহাতোর ছেলেও বিস্ফোরণে আহত হয়েছে। অনিমাদেবী জানান, তাঁর ছেলেও চোখ খুলতে পারছে না। মুখেই মূলত ওর আঘাত লেগেছে। সনকা মাঝি নামে এক মহিলা জানান, তাঁর ছেলে রাহুলও চোখ খুলতে পারছে না। রানিপুকুরের বাসিন্দা প্রৌঢ় অমূল্য মাঝিও আগত হয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমি খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে গ্যাস দিয়ে বেলুন ফোলানো দেখছিলাম। আচমকা সিলিন্ডারটা ফেটে গেল। আমার পায়ে গরম কিছু লাগল। কী ভাবে যে কী ঘটে গেল বুঝতে পারছি না।’’

অন্যদিকে স্বামীকে হারিয়ে অথৈ জলে পড়ে গিয়েছেন আখতার আনসারির স্ত্রী ফতেমা বিবি। তাঁদের একটি মেয়ে ও দু’টি ছেলে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের জমিজমা কিছুই নেই। বিভিন্ন মেলায় ও বাজারে ঘুরে ঘুরে স্বামী গ্যাস বেলুন বিক্রি করত। তাতেই কোনও রকমে আমাদের চলত। এখন কী ভাবে সংসার চলবে জানি না।’’

পুলিশ জানিয়েছে, কেউ কোনও অভিযোগ জানায়নি। তবে আখতারের মৃত্যু নিয়ে একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু হচ্ছে। বুধবার মানবাজার থানার পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যায়। এ দিন অবশ্য মেলা উঠে গিয়েছিল। জেলা পুলিশের এক আধিকারিক জানান, ওই মেলা নিয়ে তাঁদের কাছে কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। তবে এ বার থেকে যাতে মেলার আগে অনুমতি নেওয়া হয়, সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy