সবাই যখন সেজেগুজে মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা দর্শন করে বেড়াচ্ছেন। কেউ বা পুজার ছুটির অবকাশে মামাবাড়িতে পুজোর ছুটি কাটাতে গেছে। সেই আনন্দের দিনেও গুটি কয়েক কিশোরী নাটকের মহড়ায় ব্যস্ত। তাদের ওপর গুরু দায়িত্ব। কারণ তারা যে মণ্ডপে মণ্ডপে নাটক দেখাবেন!
প্রান্তিক জেলা পুরুলিয়ার মানবাজার থানার চেপুয়া গ্রাম। এই গ্রামেই নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়া কিশোরীদের একটি দল কয়েক বছর ধরে নাটক প্রদর্শন করে আসছেন। কেবল কুশীলবদের মুখ মাঝে মধ্যে পালটে যায়। নাটকের বিষয়বস্তু কুসংস্কার অশিক্ষা দূরীকরণ বাল্য বিবাহ রোধ প্রভৃতি। ‘কারুকৃত’ নামে নাট্য গোষ্ঠীর এটি ১৪তম প্রযোজনা। পুরুষ চরিত্রগুলিও এরাই রূপায়ণ করেন। নাট্য গোষ্ঠীর প্রধান চেপুয়া গ্রামের বাসিন্দা পেশায় গৃহ শিক্ষকতা দয়াময় মহান্তী আদতে কবি। তাঁর কয়েকটি কবিতার বই বাজারে রয়েছে। নাটক লেখা মহড়া দেওয়া এবং মণ্ডপে নাটক প্রদর্শনের পর বাড়িতে মেয়েদের গচ্ছিত করা এসবের দায়িত্ব সামলান দয়াময়বাবু।
হঠাৎ নাটকে কেন? বিশেষত যে এলাকার মেয়েদের প্রকাশ্যে মঞ্চে নামা অত সহজ কথা নয়। মঞ্চে নেমে নাটকে বাল্য বিবাহের কথা প্রচার করবে এতটা উদার মনস্কতা পুরুলিয়ার গ্রামে একটি ব্যতিক্রমী নজির। দয়াময়বাবু জানান, তাঁর সাম্প্রতিক নাটকের নাম ‘জীবন বীণা’। ৪৫ মিনিটের নাটক। নাটক লেখার পর একদিন ছাত্রীদের পাঠ করে শোনাই। ওদের উৎসাহ না থাকলে নাটক মঞ্চস্থ করতে পারতাম না। মূলত বীণা কালিন্দীর জীবনী ভিত্তিক এই নাটকের গল্প হল প্রত্যন্ত গ্রামের ১৪ বছরের একটি মেয়ের। সে স্কুলে পড়া চলাকালীন তার, পরিবার বিয়ের জন্য দেখাশোনা শুরু করে। মেয়েটি এখনই বিয়ে করতে চায় না, পড়তে চায়। একদিন স্কুলের এক শিক্ষিকাকে তার সমস্যার কথা জানায়। শিক্ষিকা স্থানীয় বিডিওর সাহায্য চান। শেষে পরিবারকে বুঝিয়ে তার বিয়ে স্থগিত করা গেল। এদিকে গ্রামের এক মেয়ের লড়াইয়ের কথা জানতে পেরে মুখ্যমন্ত্রী তাকে পুরস্কৃত করতে চান। বছর খানেক পরে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা নিয়ে এক আধিকারিক গ্রামে গিয়ে জানতে পারেন মামাবাড়িতে রেখে মেয়েটির গোপনে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং কয়েকদিন আগে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা গেছে।
চেপুয়া গ্রামের বাসিন্দা সিপিএমের প্রাক্তন প্রধান নরেন কালিন্দী বলেন, ‘‘আমাদের গ্রামের মেয়েরা নাটকে ভাল অভিনয় করে। আমি ওদের নাটক দেখেছি। আসলে নাটকে ওদের জীবন নিয়েই কথা বলা হয়েছে। কয়েক বছর ধরে দয়াময়বাবু মেয়েদের নিয়ে এই নাট্য গোষ্ঠী চালাচ্ছেন।’’
নাটক করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতারও শিকার হয়েছেন দয়াময়বাবু। তিনি বলেন, ‘‘একবার মঞ্চস্থ হওয়ার একদিন আগে বিডিওর চরিত্র করা একটি মেয়েকে তার বাবা মহড়া চলাকালীন তুলে নিয়ে যান। তিনি বলেন আমার মেয়ে মঞ্চে নামবে না। ওই ছাত্রীর বাবাকে বুঝিয়েও আমরা পারিনি। বাধ্য হয়ে ওই চরিত্রে একদিনের মধ্যে নতুন একটি মেয়েকে মঞ্চে নামাতে হয়।’’ চেপুয়া গ্রামের দুই ছাত্রীর বাবা জানালেন, ‘‘মেয়ে কোনও খারাপ কাজ করছে না জানি। নাটকের মধ্যে বার্তায় সমাজের উপকার হয়। তাছাড়া এই নাটকে তো ওদের কথাই বলা হয়েছে। ওদেরও সমস্যার কথা মঞ্চে সকলের সামনে তুলে ধরতে পারছে এটা খুব ভাল দিক।’’
পুজো ক’দিন মণ্ডপে মণ্ডপে এমন উদ্যোগ কেমন ভাবে দেখছেন নাটকের কুশীলব রূপামণি মাহাতো, শিবানী মাহাতোরা? তাদের সংক্ষিপ্ত উত্তর, ‘‘অনেক মেয়ে এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়। তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা বলে। এই সচেতনতা তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারাও কম কথা নয়!’’