Advertisement
E-Paper

এক অঙ্গে নানা পদের সমাহারে প্রশ্নচিহ্ন শিক্ষায়

ব্যক্তি একই। নানান রূপে হরেক চেয়ার সামলাচ্ছেন। সবই গুরুদায়িত্ব। এই মুহূর্তে রাজ্যের শিক্ষা-প্রশাসনে এমন নজির একাধিক। যিনি কলেজের অধ্যক্ষ, তিনিই আবার রাজ্যের এক শিক্ষাসংস্থার প্রধান। কেউ বা একই সঙ্গে বসে আছেন উচ্চশিক্ষার দু’টি সংস্থার মাথায়!

সুপ্রিয় তরফদার

শেষ আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০১৬ ০২:৫৩

ব্যক্তি একই। নানান রূপে হরেক চেয়ার সামলাচ্ছেন। সবই গুরুদায়িত্ব।

এই মুহূর্তে রাজ্যের শিক্ষা-প্রশাসনে এমন নজির একাধিক। যিনি কলেজের অধ্যক্ষ, তিনিই আবার রাজ্যের এক শিক্ষাসংস্থার প্রধান। কেউ বা একই সঙ্গে বসে আছেন উচ্চশিক্ষার দু’টি সংস্থার মাথায়!

দেখে-শুনে সংশয় তীব্র। প্রশ্ন উঠছে, যেখানে শীর্ষস্তরের একটা পদের দায়িত্ব পালন করতে হিমসিম খেতে হয়, সেখানে উচ্চশিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি একাধিক সর্বোচ্চ পদে কেন? কাজ ঠিক মতো হচ্ছে তো? ‘‘শিক্ষা প্রশাসনে কি যোগ্য লোক কম পড়েছে?’’— জানতে চাইছেন শিক্ষাবিদদের অনেকে। নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার প্রসঙ্গও উঠছে।

যেমন প্রযুক্তি-শিক্ষা অধিকর্তা (ডিরেক্টর অফ টেকনিক্যাল এডুকেশন)-র পদে সরকার এ বছর যাঁর মেয়াদ বাড়িয়েছে, সেই সজল দাশগুপ্ত পশ্চিমবঙ্গ জয়েন্ট এন্ট্রান্স বোর্ডের অস্থায়ী চেয়ারম্যান। প্রায় ৯০টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পরিচালন সমিতিতেও আছেন। এতগুলো চেয়ারের প্রতি তিনি সুবিচার করতে পারছেন কি না, সে বিতর্ক থাকছেই। উপরন্তু শিক্ষাজগতের একাংশের প্রশ্ন— যে বোর্ড জয়েন্ট এন্ট্রান্সে পরীক্ষার আয়োজন করে, তার সর্বোচ্চ পদাধিকারী কোন যুক্তিতে বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পরিচালন সমিতিতে থাকেন?

এ ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের অবকাশ রয়ে যায় বলে ওঁদের পর্যবেক্ষণ। একই ভাবে সুবীরেশ ভট্টাচার্যের ‘বিস্তৃত বিচরণক্ষেত্র’ ঘিরে বিতর্কের জট। ডায়মন্ড হারবার ফকিরচাঁদ কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালীন তিনি স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) চেয়ারম্যানের ভার সামলাচ্ছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে এসেও তাঁর এসএসসি’র দায়িত্বটি বহাল। পাশাপাশি তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য। উল্লেখ্য, ফকিরচাঁদের প্রিন্সিপ্যাল থাকতেই সুবীরেশবাবুকে কলেজের অধ্যক্ষ বাছাই কমিটিতে ‘বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে রাখা হয়েছিল, যা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়। কারও নাম না-করে এ হেন ‘অনৈতিক’ কাণ্ডের প্রতিবাদে চিঠি দিয়েছিল শিক্ষক সংগঠন ওয়েবকুটা। তালিকায় আরও আছে। কলেজে শিক্ষক নিয়োগকারী সংস্থা কলেজ সার্ভিস কমিশনের (সিএসসি) বর্তমান চেয়ারম্যান যিনি, সেই দীপককুমার কর স্বয়ং আশুতোষ কলেজের অধ্যক্ষ। আবার বাগবাজার উইমেন্স কলেজের অধ্যক্ষ মহুয়া দাস একাধারে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতিও বটে। ‘‘সংসদের সভাপতি ফুলটাইম জব। বহু সময়ে মাঝরাত পর্যন্ত অফিসে থাকতে হয়। জানি না, মহুয়াদেবী কী ভাবে দু’টো কাজ এক সঙ্গে সামাল দিচ্ছেন।’’— বলেন সংসদের এক প্রাক্তন কর্তা। তাঁর মন্তব্য, ‘‘আমার তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, দু’নৌকায় পা রাখলে কোনওটাই ঠিকঠাক হয় না। দু’টোই অবহেলার শিকার হয়।’’

সরকারের পদক্ষেপে অবশ্য সুরাহার ইঙ্গিত নেই। বরং সূত্রের খবর, দীপকবাবু ও মহুয়াদেবীকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবগঠিত সেনেটেও আনা হয়েছে। যোগ্য লোকের অভাবেই কি এক ব্যক্তির একাধিক পদপ্রাপ্তি? রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য তথা শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকারের উপলব্ধি, ‘‘যোগ্য লোক তো নেই-ই। তা ছাড়া ক্ষমতাশালীদেরই একাধিক পদে বসানো হচ্ছে। এটা আসলে সরকারের আগ্রাসী মনোভাব।’’ ওয়েবকুটা’র সাধারণ সম্পাদক শ্রুতিনাথ প্রহরাজের আক্ষেপ, ‘‘অনৈতিক ব্যাপার। এতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানেরই ক্ষতি হচ্ছে।’’ পড়ুয়াদের স্বার্থহানিও হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষাবিদ মহলে। ওঁদের বক্তব্য— কলেজের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব অধ্যক্ষের। তিনি অন্য সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলে কলেজের পড়ুয়ারা অসুবিধায় পড়েন। যেমন পড়েছেন শ্যামাপ্রসাদ কলেজের পড়ুয়ারা। প্রিন্সিপ্যালকে পাওয়া যায় না— এই অভিযোগে ক’মাস আগে তাঁরা রাত পর্যন্ত ঘেরাও করে রাখেন শিক্ষক-কর্মচারীদের। পরে সুবীরেশবাবুর আশ্বাসে ঘেরাও ওঠে। এ নিয়ে সুবীরেশবাবুর মতামত মেলেনি। বহু চেষ্টা করেও তাঁকে ফোনে ধরা যায়নি। এসএমএসেরও জবাব আসেনি। দীপকবাবুর ক্ষেত্রেও তা-ই। মহুয়াদেবী অবশ্য সমস্যার কথা মানেন না। ‘‘যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আগ্রহের সঙ্গে পালন করছি। আমার অসুবিধে হচ্ছে না।’’— দাবি তাঁর। আর বিতর্ক উড়িয়ে সজলবাবুর প্রতিক্রিয়া, ‘‘সরকারের ইচ্ছায় আমি একাধিক চেয়ার সামলাচ্ছি। সরকার কাল সরিয়ে দিলে সরে যাব।’’

কিন্তু এক জনের কাঁধে একাধিক গুরুদায়িত্ব সঁপে দেওয়াটা কি ঠিক?

বিকাশ ভবনের এক কর্তার জবাব, ‘‘নির্দিষ্ট বিধি-নিয়ম নেই। পুরোটাই সরকারের মর্জি।’’ তবে ‘মর্জি’র নেপথ্যে যে যোগ্য লোকের অভাবটাই অন্যতম, ওঁরা ঠারেঠোরে তা-ও কবুল করছেন। মন্ত্রিসভার এক প্রথম সারির মন্ত্রীও বলেন, ‘‘তেমন লোক মিললে এমনটি হবে না।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy