E-Paper

স্বাস্থ্যে কেন্দ্রীয় টাকা এলেও খরচ নিয়ে প্রশ্ন

কেন্দ্র অবশ্য এই টাকা দিয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্য। আগামী ৩১ মার্চ সেই অর্থবর্ষ শেষ হচ্ছে। অর্থাৎ, হাতে মেরেকেটে এক মাস সময় আছে।

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৭
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

টানা এক বছর ধরে কাকুতি-মিনতির পরে অবশেষে জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের (ন্যাশনাল হেল্থ মিশন বা এনএইচএম) অল্প কিছু টাকা রাজ্যকে পাঠাল কেন্দ্রীয় সরকার। রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, সপ্তাহ দু’য়েক আগে এনএইচএমের ৫০২ কোটি টাকা এসেছে। এর আগে টাকা এসেছিল এক বছরেরও আগে, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে। সেই টাকার পরিমাণ ছিল ৩০৭ কোটি।এনএইচএম-এর রাজ্যের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মৌমিতা গোদারা বলেন, ‘‘৫০২ টাকা শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র পাঠিয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে চিঠি দিচ্ছিলাম। কেন্দ্র যা যা বলেছিল, আমরা সব শর্তই পূরণ করেছি এবং ত্রুটি সংশোধন করেছি। তার পরেও টাকা না আসায় বিভিন্ন প্রকল্প চালাতে খুবই অসুবিধা হচ্ছিল।’’

মৌমিতা জানান, এনএইচএম-এ রাজ্যের বকেয়া প্রায় ৩৫০০ থেকে ৪০০০ কোটি টাকা। শুধু ওষুধেই বকেয়া রয়েছে ৫৬ থেকে ৫৭ কোটি টাকা। সেখানে ৫০২ কোটি প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। তবে কিছু না পাওয়ার থেকে নিশ্চয়ই ভাল। তাঁর কথায়, ‘‘কেন্দ্রের টাকা পাওয়ার পরেই রাজ্য ‘ম্যাচিং ফান্ড’ হিসাবে ইতিমধ্যে ৩৩০ কোটি টাকা দিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পে খরচের হিসাব মোটামুটি তৈরিই আছে। ফলে টাকা মেটাতে সমস্যা হবে না।’’

কেন্দ্র অবশ্য এই টাকা দিয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্য। আগামী ৩১ মার্চ সেই অর্থবর্ষ শেষ হচ্ছে। অর্থাৎ, হাতে মেরেকেটে এক মাস সময় আছে। স্বাস্থ্য দফতরের একাধিক কর্তার মতে, এত কম সময়ে সমস্ত জেলা থেকে এনএইচএমএ-এর আওতাভুক্ত বিভিন্ন প্রকল্পের খরচের ‘ইউটিলাইজ়েশন সার্টিফিকেট’ জোগাড় করে টাকা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ। সময়মতো টাকা খরচ করতে না পারলেই তা ফেরত চলে যাবে এবং এই যুক্তিতে আবার কেন্দ্র টাকা দেওয়া বন্ধ করবে।

প্রসঙ্গত, ২০২২-২৩ সাল থেকেই জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের টাকা প্রথম বন্ধ করে কেন্দ্র। সেই সময় রাজ্যের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল টাকা নয়ছয়ের। এর পর মাঝেমধ্যে তারা টাকা ছেড়েছে, আবার বন্ধ করেছে। মাঝে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের নামবদল নিয়ে রাজ্যের সঙ্গে টানাপড়েনেও টাকা দেওয়া দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। শেষ পর্যন্ত রাজ্য নতি স্বীকার করে শর্তমেনে নেয়।

২০২২-২৩ সালে জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের টাকা খরচের যে অডিট হয়, সেখানেও আর্থিক নয়ছয়ের চিত্র উঠে এসেছিল বলে কেন্দ্রের দাবি। যেমন, সেই অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে নির্দিষ্ট একটি ব্যাঙ্ককে এসএনএ (সিঙ্গল নোডাল এজেন্সি) করতে হবে। সেখান থেকেই সব টাকা খরচ করতে হবে। কিন্তু রাজ্য সরকার ওই ব্যাঙ্কের ‘ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স সার্টিফিকেট’ এবং ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট অডিট সংস্থাকে দেখাতে পারেনি। সেই টাকার হিসাবও যাচাই করা যায়নি। ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ ওই বেসরকারি ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট নম্বরে (১০৫৬০১০০১৯৬১১) এনএইচএম-এর প্রায় ২৭০ কোটি ৭১ লক্ষ টাকা।

সূত্রের খবর, অডিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তারা অন্য একটি ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টেরও খোঁজ পান (১৪৩২০১০০০৪৫৫৩)। যেখানে সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূত ভাবে এনআইচএম-এর ১১ কোটি ৯৪ লক্ষ টাকা ছিল। এই টাকারও কোনও ‘ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স সার্টিফিকেট’ এবং ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট রাজ্য দেখাতে পারেনি। কেন্দ্র যে টাকা দিয়ে থাকে তার সুদ কেন্দ্রের ‘কনসোলিডেটেড ফান্ড’ এ জমা দেওয়ার কথা। রাজ্য তা দেয়নি বলেও অভিযোগ। জেলার তহবিলে ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কেন্দ্রের দেওয়া প্রায় ৮৩ কোটি টাকা রাজ্য খরচ করতে পারেনি। কিন্তু তার থেকে প্রাপ্ত সুদও তারা কেন্দ্রকে দেয়নি বলে অভিযোগ। আরও অভিযোগ, এনএইচএম থেকে ‘অ্যাডভান্স’ বা আগাম টাকা নিয়েও রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের ‘বুক অব অ্যাকাউন্টস’-এ ২০২২ সালের ১ এপ্রিল ৯ কোটি ৯৫ লক্ষ টাকা পড়ে ছিল। ওই একই সময় জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের অন্তর্গত বিভিন্ন প্রকল্পের ২০০ কোটি টাকা খরচ না হয়ে পড়ে ছিল ‘বুক অব অ্যাকাউন্টস’-এ।

সূত্রের দাবি, ২০২২-২৩ সালে যে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে সদ্য প্রসূতিদের অর্থ দেওয়া হয়েছে তার কোনও অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট মেলেনি। সেই অ্যাকাউন্টে পড়েছিল প্রায় ৭৪ কোটি টাকা। ওই অর্থবর্ষে বিভিন্ন হাসপাতালকে এনএইচএম-এর প্রায় ৬৩ কোটি টাকা আগাম ধার দেওয়া হয়। তার কোনও ‘ইউটিলাইজ়েশন সার্টিফিকেট’ মেলেনি। অডিট রিপোর্টে এমন আরও অসংখ্য অসঙ্গতি মিলেছিল। এর পরেই কেন্দ্র রাজ্যে এনএইচএম-এর টাকা আটকে দেয়।

এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য দফতরের এক কর্তার মতে, অনেক হিসেব করে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ঠিক পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের মুখে চলতি অর্থবর্ষ শেষ হওয়ার ঠিক এক মাস বাকি থাকতে কিছু টাকা পাঠিয়েছে। এতে শাসক দলের মুখ বন্ধ করা গেল। তারা আপাতত বলতে পারবে না যে কেন্দ্র স্বাস্থ্যের টাকা দিচ্ছে না। একই সঙ্গে এই টাকা খরচ করা তৃণমূল সরকারের স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষে কঠিন হল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Swasthya Bhawan

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy