যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) জন্য নোটিস পাওয়া ভোটদাতাদের তালিকা প্রকাশ হয়নি। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) শুনানিতে জমা পড়া নথি নেওয়ার রসিদ দেওয়া হয়েছে বিক্ষিপ্ত ভাবে। মাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড নেওয়া শুরু হলেও, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। বিএলএ ২-দের কিছু শুনানি কেন্দ্রে দেখা গিয়েছে, কিছু কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের ৪৮ ঘণ্টা পরে, বুধবারেও রাজ্যের শুনানি-পরিস্থিতি এমন কেন, উঠেছে প্রশ্ন। চড়েছে পারদ। চলেছে রাজনৈতিক তরজা।
মহকুমাশাসক (বর্ধমান উত্তর) দফতরে এ দিন শুনানিতে এসে সুকান্ত মুখোপাধ্যায় নামে এক বাসিন্দা বলেন, “ছেলে জার্মানিতে গবেষণা করে। তার হয়ে হাজিরা দিলাম। পাসপোর্টের প্রতিলিপি জমা দিলেও, রসিদ দেওয়া হল না। অথচ, সুপ্রিম কোর্ট দিতে বলেছে।” বর্ধমান ১ ও ২ ব্লকে কয়েক জন ভোটার এ নিয়ে চেঁচামেচি করায়, তাঁদের শুনানির নোটিসের পিছনে কী নথি জমা নেওয়া হয়েছে, তা লিখে সই করেন আধিকারিকেরা। পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, “প্রত্যেক এইআরও-র কাছে ভোটারকে নথির প্রেক্ষিতে যে প্রমাণপত্র দিতে হবে, তা পাঠানো হয়েছে। তা ছাপানোও হয়েছে। কমিশনের নির্দেশ এলে, ভোটারেরা যা নথি জমা দিচ্ছেন, তার প্রমাণপত্র দেওয়া শুরু করা হবে।” সুপ্রিম কোর্টের রায়কে মান্যতা দিয়ে কমিশনকে নির্দেশিকা জারি করতে হবে, এই দাবিতে পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসকের দফতরের সামনে বিক্ষোভ দেখায় তৃণমূল।
ঝাড়গ্রামের গোপীবল্লভপুরের বাসিন্দা অহিতোষ পৈড়া এ দিন ব্লক অফিসে শুনানিতে গিয়ে নথি জমা দিয়ে রসিদ চেয়েছিলেন। তাঁর ক্ষোভ, “রসিদ চাইলে অফিসারেরা বললেন, তেমন নির্দেশ নেই।” প্রায় একই অভিজ্ঞতা মহকুমাশাসকের (কোচবিহার সদর) দফতরে শুনানিতে যাওয়া বিকাশ ভট্টাচার্যের। দুই মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার কিছু এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য, কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশিকা না মেলায় প্রামাণ্য নথি হিসাবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড নেওয়া নিয়ে ধন্দ রয়েছে তাদের। শুনানিতে গৃহীত নথির রসিদও দেওয়া হচ্ছে না। তবে পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ের ইআরও অনুপম বাগ বলেন, “ঠিক করেছি, কেউ রসিদ চাইলে দেব।” পশ্চিম বর্ধমান, উত্তর দিনাজপুর, হাওড়া, হুগলিতে পরিস্থিতি কমবেশি একই। নদিয়ায় বিভিন্ন শুনানি কেন্দ্রে শুনানির নোটিসের উপরে ‘হাজির’ এবং ‘শুনানি হয়েছে’ বলে লিখে স্ট্যাম্প দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তা শুনানিতে জমা দেওয়া নথির রসিদ নয়।
মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ ২ ব্লক অফিসে এক সহকারী ইআরও (ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার)-কে ‘বিজেপি-র দালাল’ বলে ধমক দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আখরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। ওই ইআরও প্রতিবাদ করেন। মন্ত্রীর অভিযোগ, “উনি শুনানিতে আসা মানুষকে হয়রান করছেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো কাজ না হলে, কাউকে ছাড়া হবে না!” বিডিও মানিক সর্দারকে মন্ত্রী বলেন, “অফিসারদের বলুন, আদালতের নির্দেশ মতো কাজ করতে।” বিডিও বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেন। তবে বিজেপির জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি সুবলচন্দ্র ঘোষ বলেন, “এটা তৃণমূলের সংস্কৃতি।”
বিএলএ ২-দের এ দিন নানা কেন্দ্রের ভিতরে থাকতে দেখা গিয়েছে দুই বর্ধমান, দুই ২৪ পরগনা, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদে। হুগলির কয়েক জায়গায় শুনানি কেন্দ্রে দলের বিএলএ ২-রা ঢুকেছেন বলে তৃণমূল নেতৃত্ব দাবি করেছেন। প্রশাসন তা মানেনি। গ্রামীণ হাওড়ায় দলের কোনও বিএলএ-২ শুনানি কেন্দ্রে ঢুকছেন না বলে দাবি তৃণমূলের। পশ্চিম মেদিনীপুরের বেশ কিছু শুনানি কেন্দ্রে আবার বিএলএ ২-দের ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
এই বিভ্রান্তি কেন? কমিশন সূত্রের দাবি, রায় হাতে পাওয়ার পর থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তালিকা প্রকাশ করার কথা। ১৯ জানুয়ারি রায় হলেও, কমিশন তা হাতে পেয়েছে ২০ জানুয়ারি। সে হিসাবে ৭২ ঘণ্টার মেয়াদ ফুরোবে ২৩ জানুয়ারি বিকেলে। রসিদ দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। রায় অনুযায়ী, যে বিএলএ-দের কাছে ভোটারের ‘অথরাইজ়েশন’ চিঠি থাকবে, তাঁরাই শুনানি কেন্দ্রে সেই ভোটারের নথি নিয়ে ঢুকতে পারবেন। বাকিরা পারবেন না। বুধবার রাতে কমিশন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে চিঠি লিখে জানিয়েছে, জন্ম তারিখের প্রমাণ হিসেবে মাধ্যমিক পাশের শংসাপত্রের সঙ্গে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড জমা দেওয়া যাবে।
তৃণমূলের আইনজীবী নেতা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির তালিকা প্রকাশ, নথি জমার রসিদ দেওয়া এবং বিএলএ ২-এর উপস্থিতি নিয়ে আদালতের নির্দেশ স্পষ্ট। বাংলার মানুষের হয়রানিই কমিশনের উদ্দেশ্য। তাই কোনও কাজই আইন অনুযায়ী হচ্ছে না।” সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, “মানুষের হয়রানি বন্ধ করতে হবে। সে সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করতে কমিশনের কোনও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। আদালতের নির্দেশ কার্যকর না-হলে পথে নেমে আমাদের প্রতিবাদ বাড়বে।” বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য বলেছেন, “এটা কমিশন এবং রাজ্য সরকারের ব্যাপার। এখানে আমাদের কিছু বলার নেই। তবে এই সরকার চূড়ান্ত অসহযোগিতার মাধ্যমে প্রক্রিয়াটা গুলিয়ে দিতে চায়।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)