Advertisement
E-Paper

মত দেননি জমি বেচায়, হেডমাস্টার তাই ‘মৃত’

রবীন্দ্রনাথের গল্পে কাদম্বিনীকে মরে প্রমাণ করতে হয়েছিল, সে ‘মরে নাই’। আর রানাঘাটের সরিষাডাঙা শ্যামাপ্রসাদ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক উত্তম বিশ্বাস প্রবল অবিশ্বাস-সহ শেষমেশ আবিষ্কার করেছেন, তিনিও ‘বাঁচিয়া নাই’। তবে আইনের খাতায়।

অত্রি মিত্র

শেষ আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৩:৪৩
নিজের বাড়িতে উত্তম বিশ্বাস। সৌমিত্র শিকদারের তোলা ছবি।

নিজের বাড়িতে উত্তম বিশ্বাস। সৌমিত্র শিকদারের তোলা ছবি।

রবীন্দ্রনাথের গল্পে কাদম্বিনীকে মরে প্রমাণ করতে হয়েছিল, সে ‘মরে নাই’। আর রানাঘাটের সরিষাডাঙা শ্যামাপ্রসাদ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক উত্তম বিশ্বাস প্রবল অবিশ্বাস-সহ শেষমেশ আবিষ্কার করেছেন, তিনিও ‘বাঁচিয়া নাই’। তবে আইনের খাতায়।

অগত্যা ফের আইনের দরজাতেই কড়া নেড়েছেন উত্তমবাবু। শিয়ালদহ দেওয়ানি আদালতে মামলা করে দাবি জানিয়েছেন, তিনি রীতিমতো জীবিত। শুধু তা-ই নয়, রাজ্য সরকারই তাঁকে মাইনে দেয়। উত্তমবাবুর অভিযোগ, একখণ্ড জমি প্রোমোটারকে বেচে দেওয়ার মতলবে তাঁরই কিছু নিকটাত্মীয় কোর্টে হলফনামা দিয়ে তাঁকে ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করেছেন।

ব্যাপারটা কী?

উত্তমবাবু জানাচ্ছেন, তাঁর দাদু প্রয়াত সুবোধচন্দ্র দাস ওরফে সুবোধরঞ্জন দাসের একটি জমি রয়েছে পানিহাটি পুরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ক্ষুদিরাম বসু রোড এলাকায়। জমির পরিমাণ মাত্র ৫৮ ছটাক। সুবোধবাবুর চার ছেলে— মানিকলাল, রতন, সমর ও বিষ্ণুপদ। তিন মেয়ে— জ্যোৎস্না-পূর্ণিমা-দীপালি। তিন জনেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সব মিলিয়ে সাত শরিক। সুবোধবাবুর বড় মেয়ে জ্যোৎস্নার একমাত্র সন্তান উত্তমবাবু। মা প্রয়াত হওয়ায় তিনিও জমির অন্যতম ভাগীদার।

উত্তমবাবুর অভিযোগ, বছর দুই আগে তাঁকে না জানিয়ে পুরো জমিটা বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন মামারা। তিনি বাধা দেন। তার পর থেকে আর মামারা কোনও যোগাযোগ করেননি। এই ভাবেই চলছিল। উত্তমবাবুর কথায়, ‘‘মাস দুয়েক আগে জানতে পারি, জমি দু’ভাগে বিক্রি হয়ে গিয়েছে। প্রোমোটারকে বিক্রি করার সময়ে বাকি ছয় শরিক তাতে সায়ও দিয়েছেন। শুধু আমি নেই।’’

খোঁজখবর করতে গিয়েই ধাক্কাটা খান উত্তমবাবু। তিনি জানতে পারেন, গত বছর আলিপুরে বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হলফনামা দিয়ে তাঁর মামাবাড়ির লোকেরা বলেছেন, ১৯৭২ সালের ১৫ অগস্ট থেকে উত্তমবাবু নাকি ‘নিখোঁজ’। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, সাত বছরের বেশি কোনও ব্যক্তি নিখোঁজ থাকলে তাঁকে ‘মৃত’ বলে ধরে নেওয়া হয়। অতএব, উত্তমবাবুও ‘মৃত’!

প্রিয়জনদের এমন আচরণে খুবই দুঃখ পেয়েছেন মাস্টারমশাই। তাঁর কথায়, ‘‘জমি বিক্রি করা নিয়ে আলোচনা করতে বছর দেড়েক আগে রানাঘাটে আমার বাড়িতে এসেছিলেন মামারা। জমি বিক্রিতে রাজি হইনি। বলেছিলাম, ছোটমামা (বিষ্ণুপদ) এখনও ওখানে থাকেন। তাই জমিটা বিক্রি না করে একটু ভাবনাচিন্তা করলে ভাল হয়। কিছু না বলে ওঁরা চলে গেলেন। আর তারপরেই ...।’’ আক্ষেপ যাচ্ছে না উত্তমবাবুর। বলছেন, ‘‘চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ওঁরা নাকি আমাকে দেখেননি! আমার বিয়েতেও তো ওঁরা সবাই এসেছেন। এত মিথ্যাচার কেউ করতে পারে!’’

অবশ্য আঘাত পেলেও একেবারে ভেঙে পড়েননি তিনি। শিয়ালদহ দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করার পাশাপাশি ব্যারাকপুরের ডিসি (সদর) হুমায়ুন কবীরকে বিষয়টি জানিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনও জানিয়েছেন। আদালতে অভিযোগ জানানোর আগেই প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেন না কেন? উত্তমবাবু জানাচ্ছেন, তাঁর মেজমামা রতন দাস পুলিশে চাকরি করেন। স্বরূপনগর থানায় তিনি কর্মরত। উত্তমবাবুর বক্তব্য, ‘‘মেজমামা হুমকি দিয়ে বলেছেন, তাঁর হাতেই ‘প্রশাসন’। তাই ওঁর কোনও ক্ষতি করতে পারব না।’’

এমনটা কেন করলেন ওঁরা?

প্রশ্ন শুনে উত্তমবাবুর মেজমামা পুরোটাই উড়িয়ে দিলেন। খড়দহ পুলিশ স্টেশন রোডের ওই বাসিন্দার বক্তব্য, ‘‘আমি ওঁকে গত ৪২ বছর দেখিনি। তার মানেই তো তিনি নিখোঁজই। অর্থাৎ, আদালতের নিয়মেই মৃত। এ বার উনি যদি বেঁচে থাকেন, তা হলে আদালতে এসে প্রমাণ করুন। আমরা আইনের পথেই আছি। কোনও অন্যায় করিনি।’’ অন্য শরিক মানিকলাল দাসের পুত্র, কল্যাণীর বুদ্ধ কলোনির বাসিন্দা অভিজিৎ দাস বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেছেন, ‘‘ঠিক করেছি, না ভুল— তা আদালতে বলব।’’

Uttam Biswas Headmaster
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy