E-Paper

শিক্ষাতেও কেন্দ্র ও রাজ্যের সংঘাত

প্রকল্পের জোয়ার, অথচ স্কুল পড়ুয়াশূন্য। পড়ুয়া থাকলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। টাকাও আটকে।

আর্যভট্ট খান

শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:০৪

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

সামনে কাশীপুর এলাকার কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের গেট। সেই গেটের উপরে লেখা স্কুলের নাম। নামের গোড়ায় ‘পিএমশ্রী’ (প্রধানমন্ত্রী স্কুলস ফর রাইজ়িং ইন্ডিয়া)। কাজেই স্কুলের পুরো নাম ‘পিএমশ্রী কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় কাশীপুর’।

রাজ্য শিক্ষা দফতরের কর্তা কার্তিক মান্না বললেন, কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক জানিয়ে দিয়েছে, রাজ্যের সমস্ত স্কুলের নামের আগে যোগ করতে হবে ‘পিএমশ্রী’। তা হলেই সর্বশিক্ষা মিশনে কেন্দ্রের পুরো টাকা পাওয়া যাবে। শিক্ষা দফতরের ওই কর্তার কথায়, ‘‘স্কুলের নামের আগে ‘পিএমশ্রী’ যোগ না করায় আমরা ‘কম্পোজ়িট গ্রান্ট’ বাবদ কেন্দ্রের ভাগের অংশ পাচ্ছি না ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে। আমাদের রাজ্য প্রশ্ন তুলেছে, প্রতিটি স্কুলের নামের সঙ্গে কেন ‘পিএমশ্রী’ যোগ করতে হবে? সরকারি স্কুলে তো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকল্পও চলছে। সেখানে তো শুধু প্রধানমন্ত্রীর প্রকল্প চলছে না। তাই স্কুলের নামের আগে ‘পিএমশ্রী’ লেখা যাবে না।’’

স্কুলের অভিভাবক ও শিক্ষকদের একাংশেরও প্রশ্ন, রাজ্যের স্কুলের নামের আগে ‘পিএমশ্রী’ লেখা না-লেখার উপরে কেন ‘কম্পোজ়িট গ্রান্ট’-এর টাকা নির্ভর করবে? ‘কম্পোজ়িট গ্রান্ট’ বাবদ টাকা কেন্দ্র না-দেওয়া মানে শিক্ষার যে মৌলিক অধিকারের আইন, সেটাও খর্ব হচ্ছে। তা কেন বিবেচনা করে দেখা হচ্ছে না?

স্কুলের শিক্ষকদের মতে, কেন্দ্র ও রাজ্যের এমন সংঘাতের জন্য স্কুলগুলোর অবস্থা আরও বিবর্ণ হচ্ছে। এক প্রধান শিক্ষক জানালেন, ‘কম্পোজ়িট গ্রান্ট’-এর টাকা থেকে শুরু করে মিড-ডে মিলের টাকাও কেন্দ্র ও রাজ্য মিলে দেয়। কিন্তু কেন্দ্র তার অংশের টাকা দিচ্ছে না বলে মিড-ডে মিলেও বাজার অনুযায়ী পড়ুয়াদের জন্য বরাদ্দ কম হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু বার বার অভিযোগ করে বলেছেন, ‘‘কম্পোজ়িট গ্রান্টের অংশ কেন্দ্র না-দেওয়ায় স্কুলের খরচ কেন্দ্রের অংশের টাকায় নয়, চলছে রাজ্যের ভাগের টাকাতে।’’

তবে শিক্ষকদের প্রশ্ন, রাজ্যও ‘কম্পোজ়িট গ্রান্ট’ বাবদ নিজের ভাগের টাকার পুরোটা দিচ্ছে কি? অধিকাংশ স্কুলের প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ, দিচ্ছে না। বাঙুরের নারায়ণদাস বাঙুর মাল্টিপারপাস স্কুলের প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় বড়ুয়া বলেন, “আমাদের স্কুলে এক হাজারের উপরে পড়ুয়া। আমার তো ১ লক্ষ টাকা পাওয়ার কথা। চলতি বছর ‘কম্পোজ়িট’ গ্রান্ট বাবদ স্কুল পেয়েছে ২৫ হাজার টাকা। কেন্দ্র না-হয় তার ভাগের টাকা দেয়নি। কিন্তু রাজ্য যদি পুরোটা দিত, তা হলে তো অন্তত রাজ্যের ভাগের ৫০ হাজার টাকা পাওয়া যেত। রাজ্য তো দিয়েছে ২৫ হাজার টাকা। এই টাকাও অনিয়মিত। এ বার এসেছে বছরের শেষে। এই টাকাতে আমাদের মতো বড় স্কুলে সারা বছরের বিদ্যুতের বিলও মেটাতে পারি না।” ‘কম্পোজ়িট গ্রান্ট’-এর টাকা নিয়মিত না-পাওয়ায় স্কুলের নিজস্ব তহবিলও গড়ে ওঠে না। প্রধান শিক্ষকদের অভিযোগ, এই টাকা অনিয়মিত হওয়ায় তাঁরা প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আংশিক সময়ের শিক্ষক নিতে পারছেন না। এমনকি কয়েক হাজার টাকা দিয়ে অস্থায়ী গ্রুপ-সি, গ্রুপ-ডি কর্মীও রাখা যাচ্ছে না।

প্রধান শিক্ষকেরা আরও জানাচ্ছেন, ২০১৬ সালে নিযুক্ত গ্রুপ-সি এবং গ্রুপ-ডি কর্মীদের চাকরি বাতিল হওয়ায় বহু স্কুলে এই কর্মীরাও নেই। এর ফলে স্কুলের হাজিরা খাতায় পড়ুয়াদের নাম তোলা থেকে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। গ্রুপ-সি কর্মীদেরই প্রকল্পের খতিয়ান রাখার কথা। গ্রুপ-ডি কর্মী না থাকায় স্কুলের তালা, জানলা-দরজা খোলা, ঘণ্টা বাজানোর দায়িত্ব বহু স্কুলে শিক্ষকদেরই নিতে হয়েছে।

প্রশ্ন হল, নিজের তহবিল না থাকলে আংশিক সময়ের জন্যও গ্রুপ-সি, গ্রুপ-ডি কর্মী কী ভাবে রাখবে স্কুল? সাফাইকর্মী জরুরি। দরকার স্কুলে দ্বাররক্ষী রাখাও। রক্ষী না থাকায় গ্রামগঞ্জের স্কুলে চুরি হওয়ার অভিযোগ উঠছে। শিক্ষকদের মতে, ‘কম্পোজ়িট গ্রান্ট’ নিয়মিত পেলে এই সব অসুবিধা অনেকটাই মিটত। প্রধান শিক্ষকদের একাংশ জানালেন, অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষ স্কুলের উন্নতিকল্পে ২৪০ টাকার জায়গায় একটু বেশি টাকা ভর্তি-ফি হিসেবে নেন। কিন্তু তা দিয়েও সব সামলানো যায় না। উল্টে কেন বেশি টাকা নেওয়া হল, সেই নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

কসবা এলাকার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা জানালেন, মিড-ডে মিল নিয়েও কেন্দ্র-রাজ্য জটিলতা চলে। শিক্ষা দফতর অভিযোগ তোলে, মিড-ডে মিলে কেন্দ্র তার বরাদ্দ বাড়াচ্ছে না। কিন্তু রাজ্য কেন নিজের অংশের বরাদ্দ বাড়াচ্ছে না— প্রশ্ন তাঁর। বঙ্গীয় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনন্দ হান্ডা বলেন, ‘‘কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ প্রকল্পের মধ্যে কিছু প্রকল্প তো আছে, যেগুলোয় কেন্দ্র না-দিলে রাজ্যই নিজের ভাগের অংশ দিয়ে দেয়। যেমন প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা। মিড-ডে মিলের ক্ষেত্রে তা হবে না কেন? পড়ুয়ারা ভোটার নয় বলে বঞ্চনা?’’

রাজ্য শিক্ষা দফতরের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর নেই। গত বছর দুর্গাপুজো কমিটিগুলির জন্য অনুদান বাড়িয়ে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তারা বিদ্যুৎ বিলে ছাড়ও পেয়েছে। অন্তর্বর্তী বাজেটে বিভিন্ন প্রকল্পে ভাতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বেকারদের জন্য ‘বাংলার যুব-সাথী’ প্রকল্প শুরুর ঘোষণা হয়েছে। কিন্তু সেই রাজ্যেরই মিড-ডে মিলে অধিকাংশ পড়ুয়ার পাতে অনেক সময়ে সপ্তাহভর একটা গোটা ডিম দেওয়ারও টাকা মেলে না!

শিক্ষকদের অভিযোগ, একেই স্কুলগুলো তহবিলের অভাবে ধুঁকছে। তার উপর বিএলও হিসেবে নিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা স্কুলে আসতে পারছেন না। তাঁদের কাজ শেষ হওয়ার পরেই রাজ্যে ভোটের দামামা বেজে যাবে। স্কুলে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে রাখতে হবে বলে ভোটের সময়ে ক্লাস হবে না নিয়মিত। কবে ভোট শেষ হবে, কবে স্কুল থেকে বাহিনী যাবে, তার পর পড়াশোনা শুরু হবে, সেই আশায় বসে থাকবে পড়ুয়ারা।

আসলে ভোট-ই আছে। স্কুলের পড়াশোনা কতটা জলে গেল, তার হিসাব কে রাখে?

(শেষ)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Education Sector West Bengal government Central Government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy