Advertisement
E-Paper

অধ্যক্ষের জন্য লাগবে কি হেনস্থা-ভাতা

ছাত্র সংসদের সঙ্গে বিরোধের জেরে পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। ঝাড়গ্রামের কাছে মানিকপাড়া শতবার্ষিকী কলেজের সেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষার ইস্তফা প্রসঙ্গ টেনে আক্ষেপ করছিলেন রাজ্য অধ্যক্ষ পরিষদের প্রাক্তন সভাপতি জ্ঞানাঙ্কুর গোস্বামী “শেষমেশ উনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন। তাতেও কি কারও চৈতন্যোদয় হল? গুন্ডাগিরি তো চলছেই!” পশ্চিমবঙ্গে ‘পরিবর্তনের’ পালাবদল ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসার আগে, এমনকী সরকার গড়ার পরেও তৃণমূলের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল শিক্ষাক্ষেত্রের রাজনীতিমুক্তি।

সাবেরী প্রামাণিক

শেষ আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৩:০৯

ছাত্র সংসদের সঙ্গে বিরোধের জেরে পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। ঝাড়গ্রামের কাছে মানিকপাড়া শতবার্ষিকী কলেজের সেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষার ইস্তফা প্রসঙ্গ টেনে আক্ষেপ করছিলেন রাজ্য অধ্যক্ষ পরিষদের প্রাক্তন সভাপতি জ্ঞানাঙ্কুর গোস্বামী “শেষমেশ উনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন। তাতেও কি কারও চৈতন্যোদয় হল? গুন্ডাগিরি তো চলছেই!”

পশ্চিমবঙ্গে ‘পরিবর্তনের’ পালাবদল ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসার আগে, এমনকী সরকার গড়ার পরেও তৃণমূলের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল শিক্ষাক্ষেত্রের রাজনীতিমুক্তি। অথচ বিগত সাড়ে তিন বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রতিশ্রুতি মুখের কথা হয়েই থেকে গিয়েছে। ছাত্র সংগঠনের আড়ালে কলেজে-কলেজে রাজনীতির তাণ্ডবে দাঁড়ি তো পড়েইনি, উল্টে পরিস্থিতি ক্রমশ করুণ ও জটিল হয়েছে।

যার খেসারত দিচ্ছে রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্র। নিয়মের গেরোয় স্কুলে যেমন শিক্ষকের আকাল, তেমন ছাত্র সংসদের দৌরাত্ম্যে কলেজের অধ্যক্ষ বাড়ন্ত। বহু কলেজে যে সব ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কিংবা টিচার-ইন-চার্জ কাজ সামলাচ্ছেন, তাঁদের অনেকেও দায়িত্ব ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। কারণ সেই একই ছাত্রনেতা ও স্থানীয় রাজনৈতিক ‘দাদা’দের উৎপাত। কখনও কলেজের স্টাফরুমে শিক্ষিকাকে জলের জগ ছুড়ে শিরোনাম হচ্ছেন রাজনৈতিক দাদা, কোথাও আবার ফেসবুকে মত প্রকাশের অপরাধে শিক্ষকের উপরে চড়াও হচ্ছে পড়ুয়ারা। দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে অধ্যক্ষ বা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ঘেরাও-নিগ্রহের পালা তো অন্তহীন। যার সিংহভাগ ক্ষেত্রেই আঙুল উঠছে শাসকদলের লোকজনের দিকে।

এবং মফস্সল থেকে মহানগরশিক্ষাঙ্গনে গা জোয়ারির ঢেউ লেগেছে সর্বত্র। সাম্প্রতিক পর্বের সূচনাটা হয়েছিল রায়গঞ্জ ইউনিভার্সিটি কলেজ দিয়ে। তার পরে মাজদিয়া কলেজ হয়ে খাস কলকাতার জয়পুরিয়া, সম্মিলনী, সিটি কলেজ নানা প্রতিষ্ঠানে নানা কারণে ছাত্র সংসদের হাতে অধ্যক্ষ হেনস্থায় বিরাম নেই। সাম্প্রতিকতম শিকার রায়গঞ্জেরই আর এক কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষা, টানা ঘেরাওয়ের চোটে যিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। রায়গঞ্জ ইউনিভার্সিটি কলেজে তো ছাত্র সংসদের জুলুমবাজি সইতে না-পেরে একের পর এক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দায়িত্ব ছেড়েছেন। অধ্যক্ষ-বিদায়ের সাক্ষী থেকেছে জঙ্গিপুর, শান্তিপুরও।

এমতাবস্থায় অধ্যক্ষের চেয়ার থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে চাইছেন অধিকাংশ শিক্ষক। কলেজে-কলেজে অধ্যক্ষের অভাব অবশ্য নতুন কিছু নয়। বিশেষত যাতায়াত ও পরিকাঠামোগত অসুবিধের দরুণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে সমস্যাটা বরাবরই প্রকট। সুরাহার লক্ষ্যে কলেজ সার্ভিস কমিশন (সিএসসি)-এর সিদ্ধান্ত, তালিকা থেকে কাউন্সেলিং মারফত অধ্যক্ষ বাছাই করা হবে।

কিন্তু অধ্যক্ষ হবেন কে? আবেদনই যে বড় কম! কী রকম?

সিএসসি’র তথ্য বলছে, রাজ্যে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রায় সাড়ে চারশো সাধারণ ডিগ্রি কলেজের মধ্যে আপাতত অন্তত শ’দুয়েকে অধ্যক্ষের পদ খালি। সেগুলোর জন্য আবেদনই পড়েছে সাকুল্যে শ’দুয়েক। তাঁদের ইন্টারভিউ নিয়ে দেড়শো জনের তালিকা তৈরি হয়েছে। এঁদের সকলে দায়িত্ব নিলেও অন্তত পঞ্চাশটি কলেজ অধ্যক্ষহীন থেকে যাবে। “এমনিতেই অধ্যক্ষের কাঁধে বিস্তর দায়িত্ব। উপরন্তু ছাত্রভর্তি থেকে রেজাল্ট সবেতে ইউনিয়নের অন্যায় আবদার। না-মানলে তাণ্ডব, নিগ্রহ। প্রিন্সিপাল হতে আসবেন ক’জন?” প্রশ্ন এক অভিজ্ঞ শিক্ষা-কর্তার।

পাশাপাশি আর্থিক লাভের প্রশ্নও থাকছে। সরকারি সূত্রের তথ্য, একই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও সম বেতনে কর্মরত দুই শিক্ষকের এক জন অধ্যক্ষ হলে তাঁর প্রাপ্তি বাড়বে বড় জোর হাজার চারেক টাকা। ওইটুকুর জন্য এত ঝক্কি নিতে অনেকেই নারাজ।

ফলে মাথাবিহীন হয়ে কার্যত অরাজক অবস্থায় দিন কাটছে বহু কলেজের। সিদ্ধান্ত নেওয়ার লোক মিলছে না। উত্তর কলকাতার এক কলেজের অধ্যক্ষের কথায়, “আমাদের কলেজে এমন দু’-তিন জন শিক্ষক আছেন, যাঁদের প্রিন্সিপাল হওয়ার যথেষ্ট যোগ্যতা। কেউ কেউ শাসকদলের ঘনিষ্ঠও। কিন্তু ঝঞ্ঝাটের ভয়ে তাঁরা অধ্যক্ষ পদের জন্য আবেদনই করেন না।” ওঁঁর মতো অনেকেরই সরস কটাক্ষ, “অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, রাজ্য সরকার বরং অধ্যক্ষদের জন্য হেনস্থা-ভাতা চালু করুক! তাতে যদি প্রার্থী মেলে!” যা শুনে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সহজ প্রতিক্রিয়া, “ভাতা দিয়ে কি সাহস জোগানো যায়?”

তার মানে মন্ত্রী কি মেনে নিচ্ছেন যে, অধ্যক্ষদের এখন বাড়তি সাহস প্রয়োজন?

“মোটেই নয়।” জবাব পার্থবাবুর। তাঁর বক্তব্য, “হাতে গোনা ক’টা কলেজে গোলমাল হচ্ছে। কড়া হাতে সে সবের ঘটনার মোকাবিলাও হচ্ছে।” তাঁর দলের ছাত্র সংগঠন, অর্থাৎ তৃণমূল ছাত্র পরিষদ (টিএমসিপি)-এর রাজ্য সভাপতি অশোক রুদ্রেরও দাবি, ক’টা মাত্র কলেজে গোলমাল হচ্ছে। আর সেই কারণে কেউ অধ্যক্ষ হতে চাইছেন না, এমন তথ্য তাঁর কাছে নেই।

শাসকদলের ছাত্রনেতার জানা না-থাকলেও শিক্ষা প্রশাসনে যুক্ত আধিকারিকদের একাংশ বর্তমান প্রবণতায় ঘোরতর উদ্বিগ্ন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আধিকারিকের পর্যবেক্ষণ, “প্রবীণ শিক্ষকদের অনেকে সাময়িক ভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বটুকুও নিতে চাইছেন না। কলেজ চালানোই দায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।” ওঁরা কেউ জানেন না, কবে পরিস্থিতি শুধরোবে। শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন, দ্রুত অধ্যক্ষ নিয়োগ করে সমস্যা মিটিয়ে ফেলা হবে। তবে শেষ পর্যন্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিতে ক’জন এগিয়ে আসবেন, সে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

(শেষ)

saberi pramanick pather kanta
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy