E-Paper

আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে পারে কেন্দ্রের সঙ্গে সদ্ভাব

রাজ্যের মাথাব্যথা ধার ও জনমুখী প্রকল্পের খরচ। মুখে ‘কেন্দ্রের বঞ্চনা’। ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গে এমনই অর্থে অনর্থ।

চন্দ্রপ্রভ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:০৯
(বাঁ দিকে) মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।

সেই বাম আমল থেকে এ রাজ্যে বহুল প্রচলিত শব্দ, ‘কেন্দ্রের বঞ্চনা’। এখন তৃণমূলের নেতামন্ত্রীদের কণ্ঠেও একই সুর। যার পাল্টা কেন্দ্রের অভিযোগ, এ রাজ্যে দুর্নীতি, কাটমানি, অস্বচ্ছ পরিচালনা ইত্যাদির কারণে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ বন্ধ হয়েছে। তার জবাবে আবার তৃণমূল সরকারের দাবি, অন্য রাজ্যেও এমন অভিযোগ কিছু কম নয়, বিশেষ করে বিজেপিশাসিত রাজ্যে। সেখানে তো অনুদান বন্ধ হয়নি! এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও অর্থ ছাড়া নিয়ে কেন্দ্রের গড়িমসি।

সব মিলিয়ে, দুই সরকারের টানাপড়েনে সঙ্কটে পড়েছেন রাজ্যের সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে একশো দিনের কাজে বরাদ্দ বন্ধ হওয়ায় গ্রামীণ কর্মসংস্থান মার খেয়েছে সব থেকে বেশি। প্রশ্ন উঠেছে, এই পরিস্থিতি থেকে বার হওয়ার উপায় কী? তা হলে কি কেন্দ্রের সঙ্গে বৈরিতার পথ এড়ানোই বাস্তবসম্মত? আরও প্রশ্ন, রাজ্যে যদি বিরোধী সরকারই থাকে, তা হলে সব শর্ত মেনে নেওয়ার পরেও কেন্দ্র অনুদান বা বরাদ্দ ছাড়বে, এমন নিশ্চয়তাই বা কোথায়?

রাজ্য সরকারের অন্দরের বক্তব্য, কেন্দ্রের কাছে প্রায় ১.৮৫ লক্ষ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশেই এই অনুদান ও বরাদ্দ বন্ধ হয়েছে। তার ফলে রাজ্যকেই সেই সব প্রকল্প চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে বাকি জনমুখী ও কল্যাণকর প্রকল্পগুলি। ফলে খরচ হচ্ছে অতিরিক্ত। এবং ধার বাড়ছে। যদিও এক কর্তার কথায়, “আমরা ধার করার সীমার মধ্যেই যা করার করছি।” তবে অর্থ-কর্তাদের একাংশ জানাচ্ছেন, ধারের সীমা নির্ধারণে যে আইন (এফআরবিএম) রয়েছে, তাতে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ গড় উৎপাদনের (জিএসডিপি) ৩% ঋণ করা যায়। বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সংস্কার করলে সেই সীমা ৩.৫% হওয়ার কথা। তবে এই সীমা পেরিয়ে গেলেও সমস্যা নেই তেমন। যদিও অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, ধার শোধ করতে আয়ের বড় অংশ বেরিয়ে গেলে তা অর্থনীতির পক্ষে শুভ নয়।

ঘটনাচক্রে, মাসখানেক আগে, কোনও রাজ্যের নাম না নিয়ে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর ডি সুব্বারাও অনুদান প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “রাজনৈতিক নেতারা নাগরিককে তবে বলতে চাইছে—আমি তোমার মর্যাদা, উন্নত জীবিকা এবং স্থায়ী আয় নিশ্চিত করতে পারছি না। ফলে আপাতত সামান্য কিছু (অনুদান) দিয়েই কাজ চালিয়ে নাও।” রাজ্যে এই অনুদানের ভারের সঙ্গে যোগ হয়েছে কেন্দ্রের সঙ্গে বৈরিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র। যাতে কেন্দ্র যেমন অনেক প্রকল্পের বরাদ্দ ছাড়ছে না, আবার কেন্দ্রের বিবিধ প্রকল্প এ রাজ্যে কার্যকরও হচ্ছে না। যেমন, কেন্দ্রের ‘এক জেলা, এক পণ্য’ প্রকল্প। তাতে লিচু, টোম্যাটো, আলু, কাজু, আম, মাছ, পোলট্রি, মাংস, জনজাতিভুক্ত বা অরণ্য এলাকাগুলিতে পাওয়া মধু-সহ একাধিক পণ্য দিয়ে নানা জিনিস তৈরি করে তা বাজারজাত করার সুবিধা রয়েছে। অথচ কেন্দ্রের ওই প্রকল্প-তালিকায় রাজ্যের নাম নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রের বরাদ্দের সঙ্গে রাজ্যের বরাদ্দ মিলে গেলে অনেক মানুষকে নানা ধরনের উৎপাদনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যেত, যাতে তাঁরা আর্থিক ভাবে স্বাধীন হতে পারতেন।

শিল্প থেকে কৃষি, স্বাস্থ্য থেকে পরিকাঠামো, পর্যটন থেকে শিক্ষা— বহু ক্ষেত্রেই এমন কেন্দ্রীয় প্রকল্প এ রাজ্যে সে ভাবে প্রচারিত বা গৃহীত হয়নি, দাবি বিরোধীদের। রাজ্যের পাল্টা অভিযোগ, প্রতিটি প্রকল্প কোনও না কোনও শর্তে মোড়া। ফলে তা এ রাজ্যের উপযোগী নয়। কিন্তু আধিকারিকদের অনেকে এ-ও মনে করেন, সেগুলি গ্রহণ করা হলে রাজ্যের কোষাগারের উপর চাপ লাঘব হত অনেকটাই।

সুব্বারাওয়ের মতো অর্থনীদিবিদদের অনেকেই মনে করেন, স্বাস্থ্য-শিক্ষা-পরিকাঠামো, শিল্প-বাণিজ্য, সংস্কৃতি, পরিষেবা ইত্যাদির উন্নয়নে রাজ্য ও কেন্দ্র হাত মেলালে অর্থনীতির চাকা গড়ায় স্বাভাবিক নিয়মেই। আবার অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, কেন্দ্রের বর্তমান সরকার বিরোধীশাসিত রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর তোয়াক্কা করে না। আর কেন্দ্রেরও মোট খরচের ২০ শতাংশ যায় শুধু ধারের সুদ মেটাতে।

এমন পরিস্থিতিতে দু’পক্ষের মধ্যে সুষম আর্থিক সম্পর্কই পরিস্থিতি শোধরাতে পারে। রাজ্যের জন্য সেটা বেশি করে জরুরি। অনুদান দিতে গিয়ে রাজ্যগুলি যে ধার করছে, তাকে উদ্বেগজনক বলে ব্যাখ্যা করে, সুব্বারাও মাও-জ়ে-দঙকে উদ্ধৃত করে বলছেন, “এক জন মানুষকে একটি মাছ দেওয়ার অর্থ, তাঁর এক দিনের খাওয়া নিশ্চিত করা। মাছ ধরা শেখাতে পারলে সেই ব্যক্তিই সারা জীবনের আহার নিশ্চিত করতে পারবেন।”

কিন্তু শেখাবেন যাঁরা, তাঁরা তো নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বেই ব্যস্ত। তা হলে জনগণের কী হবে?

(শেষ)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

PM Narendra Modi Mamata Banerjee West Bengal government Central Government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy