২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। বর্ষশেষের উৎসব আর নতুন বছরের হুল্লোড়ের রেশ তখনও মেলায়নি পার্ক স্ট্রিট থেকে।
এমন দারুণ একটা দিন যে জীবনে নামিয়ে আনবে অন্ধকারতম রাত, সুজেট দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। ছোট থেকেই পার্ক স্ট্রিটকে চেনেন রন্ধ্রে রন্ধ্রে। চেনা রাস্তা, চেনা আবহ এমন নিদারুণ অচেনা আর হিংস্র হয়ে উঠবে, ঘটনার আগে তো তা ভাবেনইনি। ঘটনার পরও তাঁর ভাবতে কষ্ট হত যে পার্ক স্ট্রিটে গণধর্ষিতা হতে হয়েছিল তাঁকে। পার্ক স্ট্রিটে!
মুখ্যমন্ত্রীও মানতে চাননি। কিছুতেই মানতে চাননি সুজেট জর্ডনের অভিযোগ। সুজেটের হয়ে প্রতিবাদী স্বরগুলো সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফুঁসে ওঠেন। বলেন, ‘সাজানো ঘটনা’। ধর্ষণের নাটক সাজিয়ে রাজ্য সরকারকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। পুলিশ কিন্তু প্রথমে সুজেটের পাশেই দাঁড়িয়েছিল। কলকাতা পুলিশের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান দময়ন্তী সেন সাংবাদিক বৈঠক করে বলেছিলেন, কিছু একটা যে ঘটেছে, তা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। কিন্তু দময়ন্তীর এই মন্তব্য মুখ্যমন্ত্রীর রোষানলে আহুতি দিয়েছিল। দময়ন্তীকে পত্রপাঠ কলকাতার গোয়েন্দা প্রধান পদ থেকে সরানো হয়। বদলি করে দেওয়া হয় গুরুত্বহীন পদে। তার পরই ভোল পাল্টে ফেলে পুলিশ। গণধর্ষিতার পাশে দাঁড়ানোর বদলে তাঁকেই হেনস্থা করা শুরু হয়েছিল। অভিযোগ করেছিলেন সুজেট নিজেই।
আরও পড়ুন:
চিরচেনা পার্ক স্ট্রিট এমন আঁধার নামাবে, ভাবেননি সুজেট
ঠিক কী ঘটেছিল ২০১২-র ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে? তার পরই বা ঘটনা মোড় নিয়েছে কেমন ভাবে?
পার্ক স্ট্রিটের একটি হোটেলের সামনে থেকে সুজেট জর্ডনকে গাড়িতে তুলেছিল পাঁচ যুবক। ট্যাক্সি না পেয়ে বিড়ম্বনায় পড়া সুজেটকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার নাম করে গাড়িতে তুলেছিল তারা। সেই গাড়িতেই ধর্ষণ করা হয় তাঁকে। উদ্যত পিস্তলের মুখে। তার পর তাঁকে এক্সাইড মোড়ের কাছে রাস্তায় ফেলে দেয় ধর্ষকরা। ৮ ফেব্রুয়ারি নির্যাতিতা পার্ক স্ট্রিট থানায় অভিযোগ জানান। বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে লালবাজার। তদন্তভার নেয় গোয়েন্দা-বিভাগ। গ্রেফতার করা হয় তিন অভিযুক্ত নাসের খান, রুমান খান এবং সুমিত বাজাজকে। মূল অভিযুক্ত কাদের খান এবং আলি ঘটনার পর থেকেই বেপাত্তা। লালবাজারের গোয়েন্দারা পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিলেও কাদেরের খোঁজ মেলেনি।
মুখ্যমন্ত্রী যা-ই বলুন, আদালত সাফ জানিয়েছে পার্ক স্ট্রিটের ঘটনা সাজানো ছিল না। সুজেট গণধর্ষিতাই হয়েছিলেন। সেই রায় শোনার জন্য সুজেট অবশ্য আজ আর পৃথিবীতে নেই।