রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের রদবদল নিয়ে বৃহস্পতিবার বিধানসভায় বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে কথা বলেন ছয় বিধায়ক। কুণাল ঘোষ, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, মদন মিত্র, অশোক দেব, রহিম বক্সী, রুকবানুর রহমান— শুভেন্দুর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া এই ছয় বিধায়কই মমতাপন্থী বলে পরিচিত। মুখ্যমন্ত্রী যদিও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা কমানোর যে কথা বলা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে পছন্দের ব্যক্তিদের রাখার কথা বলা হচ্ছে, যা পাওয়া যাবে না।
বুধবার রাতে তৃণমূলের রাজ্যসভা সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন দাবি করেন, ২০ বছর ধরে মমতার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রক্ষীদের সরানো হয়েছে। তার বদলে তিন জন নতুন অপরিচিত নিরাপত্তাকর্মীকে নিয়োগ করা হয়েছে। ডেরেক এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট দিলে জানান, সন্ধ্যা নাগাদ হঠাৎ করেই ওই তিন জন অপরিচিত নিরাপত্তাকর্মীকে মমতার বাড়িতে পাঠানো হয়। তার পর ফেসবুক লাইভ গোটা বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির সামনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। ডেরেকের প্রশ্ন, “আচমকা কেন এই বদল করা হল? ভবানীপুরের নির্বাচন ফলাফল সংক্রান্ত মামলা করেছেন বলে? বুধবার হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে মিছিল করেছেন বলে? কী চলছে এখানে?”
রাতে তৃণমূলের ফেসবুক পাতা থেকে একটি লাইভ করা হয়। সেখানে দলের কর্মীদের প্রশ্ন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এত বছরের পুরনো নিরাপত্তারক্ষীদের তাঁদের দায়িত্ব থেকে বিনা নোটিসে সরিয়ে দেওয়া হল কেন?
বৃহস্পতিবার বিধানসভায় অধিবেশন শুরুর দিনে রাজ্যপালের ভাষণের পরেই মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে চলে যান কুণালেরা। সেখানে বসেই বৈঠক করেন। বিধায়কদের সূত্রে জানা গিয়েছে, নেত্রী মমতার নিরাপত্তার পুরনো দল ফেরানো যায় কি না, সেই নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও সূত্রের খবর, এই নিয়ে নেত্রী নিজে কোনও অনুরোধ করতে বলেননি বিধায়কদের। ছয় বিধায়ক নিজেই সে কথা বলেন। রক্ষী বদলেক পরের দিন শুভেন্দুর সঙ্গে বৈঠকে সেই কথা তুলে ধরেন কুণাল, শোভনদেবরা।
সেই নিয়ে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেন, “প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা কমানোর যে কথা বলা হচ্ছে, তা একেবারেই ঠিক নয়। জ়েড প্লাস যে নিরাপত্তা তিনি পেয়েছেন, তা-ই তিনি পাচ্ছেন। এক জন নিরাপত্তারক্ষীও কমানো হয়নি।’’ তার পরেই তিনি যোগ করেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিরাপত্তারক্ষীরা স্থায়ী নয়। আমার পিএসও-রাও স্থায়ী নয়। এ ক্ষেত্রে পছন্দের ব্যক্তিদের কথা বলা হচ্ছে। সরকারি কোনও ব্যবস্থায় নিজের পছন্দের লোক পাওয়া যায় না।”
সূত্র বলছে, ওই বৈঠকে জেলায় জেলায় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের উপর হামলা এবং হয়রানির ঘটনার অভিযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় দুর্নীতি, তোলাবাজির অভিযোগে তৃণমূল নেতা-কর্মীরা গ্রেফতার হয়েছেন। অনেকের বাড়িতে তল্লাশি চলেছে। তৃণমূল ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার’ অভিযোগ করেছে। তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন কুণালেরা। সেই সঙ্গে, পুনর্বাসন ছাড়া বুলডোজ়ার দিয়ে হকার উচ্ছেদ থামানোর দাবিও ওই বিধায়কেরা তুলেছেন বলে খবর। তাঁদের দাবি, এখনই উচ্ছেদ না করে সময় দেওয়া হোক হকারদের। প্রসঙ্গত, এই ইস্যুতে বুধবার পথে নেমেছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা। এছাড়াও কিছু জরুরি পরিষদীয় বিষয় নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর সঙ্গে তৃণমূল নেতাদের কথা হয়েছে বলে খবর।
বৈঠক থেকে বেরিয়ে শোভনদেব বলেন, ‘‘বৃহস্পতিবার অধিবেশন শুরু হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে আমাদের কয়েকটা প্রশ্ন ছিল। আমাদের বসার জায়গা কোনটা, আমরা ঘর পাব কি না, বলার সুযোগ পাব কি না— এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছি। আমরা তো জনপ্রতিনিধি। আমাদের নিজের এলাকার মানুষদেরও বলতে হবে। জবাবদিহি করতে হবে।’’ এর পরে কুণাল বলেন, ‘‘কয়েকটা নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করেছেন সিনিয়র মোস্ট বিধায়ক হিসাবে।’’
আরও পড়ুন:
দিন কয়েক আগে বেলেঘাটার প্রাক্তন মেয়র পারিষদ স্বপন সমাদ্দার গ্রেফতারের পরে কুণাল বার্তা পাঠিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রীকে। তিনি অভিযোগ করে জানিয়েছিলেন, তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ‘হয়রানি’ থামানো দরকার। তাঁর দাবি ছিল, বহু জায়গায় তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের উপর পুলিশি হেনস্থা হচ্ছে। ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে’ এ সব করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। সূত্রের খবর, সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এ ভাবে কথা বলা যায় না। ১৮ জুন অধিবেশন বসছে। সেদিন রাজ্যপালের ভাষণের পর মুখোমুখি কথা হতে পারে।
তার পরে বুধবার মমতার নিরাপত্তা প্রত্যাহারের পরে কুণাল নিজে থেকেই আবার মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পুরনো পিএসও-দের ফিরিয়ে দেওয়া হোক। পুলিশ প্রশাসন যা-ই করুক, মুখ্যমন্ত্রী যেন সৌজন্য দেখিয়ে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন। স্থির হয় বৃহস্পতিবারের বৈঠকে বিষয়টি আলোচিত হবে। সেই মতো বৃহস্পতিবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে গিয়ে কথা বলেন কুণালেরা। মুখ্যমন্ত্রী যদিও স্পষ্ট জানিয়ে দেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তায় কাটছাঁট হয়নি। তবে পছন্দের রক্ষী মিলবে না।