দত্তাপহারক
ওপার বাংলার খুলনা জেলার নদী শাকবাড়িয়া। সেই নদীই গিলে খেয়েছে তাঁর ভিটেমাটি। সেটা ২০০৯ সাল, আয়লার বছর। মফিজুল মোল্লার জমি, বাড়ি, গোটা গ্রাম তলিয়ে গিয়েছিল শাকবাড়িয়ার গহ্বরে। আর তার পরেই বাংলাদেশ ছেড়ে এপার বাংলার উত্তর ২৪ পরগনায় চলে আসা। সেই ইস্তক সপরিবার ভারতেই ছিলেন। ১৫-১৬ বছর পর বাংলাদেশ ফিরছেন মফিজুল মোল্লা। গভীর রাতে হাকিমপুরে ডিএন-১৩ বাসগুমটির গায়ে চিপ্স, চানাচুর, ঝুরিভাজা, কোল্ড ড্রিঙ্কসের দোকানে এসে দাঁড়িয়েছেন ছোট ছেলে আরিফুলকে সঙ্গে নিয়ে। মফিজুলের স্ত্রী, বড় ছেলে, ছেলের বৌ, নাতি উল্টো দিকে গাছতলায় অপেক্ষায়—পরিবারের কর্তা রাতের খাবার আনবেন।
একটু বেশি রাতে হাকিমপুরে পৌঁছেছেন মফিজুলরা। হাকিমপুর বাজারের হোটেলওয়ালা কামরুল গাজি তত ক্ষণে ঝাঁপ ফেলে বাড়ি চলে গিয়েছেন। অতএব ভাত জোটেনি। প্যাকেটে ভরা ভাজাভুজি খেয়েই রাত কাটাতে হবে। বরাতজোরে কয়েকটা সিঙ্গাপুরি কলাও মিলেছে। কিন্তু বরাত খুব ভাল বলে আর মানতে পারছেন না মফিজুল। সারা মাস খেটে যে টাকা রোজগার হয়েছিল, সে সব ফেলে রেখেই বাংলাদেশে ফিরতে হচ্ছে।
নিউটাউন সংলগ্ন ঘুনি বস্তিতে থাকতেন মফিজুলরা। সকালে নিউটাউনের সুউচ্চ বহুতলগুলিতে আবর্জনা পরিষ্কার করার কাজ করতেন। দুপুরে বা বিকেলে নিজের মর্জিমাফিক মজুরি খাটতেন। বাবা আর দুই ছেলের উপার্জন মেলালে পরিবারের মাসিক আয় ছিল হাজার চল্লিশেক টাকা। মাস পুরতে কয়েকটা দিন বাকি ছিল। ওই ক’টা দিন কোনও মতে কাটিয়ে দিতে পারলেই জুনের মাসপয়লায় সেই টাকাটা হাতে চলে আসত। কিন্তু মফিজুল বলছেন, ‘‘বরাত খারাপ গো দাদা। এত বার করে পুলিশ আসছে যে, বাড়িওয়ালা আর কিছুতেই থাকতে দিচ্ছে না।’’
কোথাও একটা মাথা গুঁজে কয়েকটা দিন কাটিয়ে দিতে পারতেন তো! সারা মাস খাটলেন, টাকাটা নিয়েই ফিরতে পারতেন।
মফিজুল বলেন, ‘‘কোথায় থাকব? মাসের শেষে কয়েকটা দিনের জন্য কে আর বাড়িভাড়া দেবে? রাস্তায় থাকতে হত। এই গরমে চার-পাঁচ দিন কি বৌ-বাচ্চা নিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা যায়?’’
খুলনায় যখন থাকতেন মফিজুলরা, তখন পেশা ছিল নদী-নির্ভর। শাকবাড়িয়া নদীতে মাছ ধরতেন। মাছ বেচে সংসার চালাতেন। বলছেন, ‘‘বাংলাদেশি টাকায় কোনও দিন ২০০-৩০০, কোনও দিন ৫০০-৬০০ আয় হত। কিন্তু রোজ হত না। কোনও সপ্তাহে তিন-চার দিন। কোনও সপ্তাহে হয়তো সব দিনই। তার পরে আবার ১৫ দিন একটানা কোনও আয় নেই।’’ শাকবাড়িয়া নদীতে মাছের আবার মরসুম রয়েছে। মফিজুলের কথায়, “সারা বছর সমান যায় না। মরা মরসুমে তাই নদীতে যাওয়া বন্ধ রেখে অন্য জেলায় চলে যেতাম। চাষের খেতে মজুরি করতাম।’’ কিন্তু বাংলাদেশে জিনিসপত্রের যা দাম, তাতে ওই উপার্জনে সংসার মসৃণ ভাবে চলে না, দাবি মফিজুলের। বলছেন, ‘‘ভারতে কাজের অভাব নেই। খাটতে পারলে এ দেশে সারা বছর আয় করা যায়।’’
বাংলাদেশে?
‘‘না। খাটার ক্ষমতা থাকলেও ওখানে কাজ কম। পয়সাও কম।’’
এখন গিয়ে কোথায় উঠবেন? ভিটেমাটি তো নদীগর্ভে বলছেন।
‘‘আত্মীয়স্বজনরা তো রয়েছে। খুলনা জেলারই কয়রায় তারা থাকে এখন। প্রথমে সেখানেই গিয়ে উঠব। তার পরে আস্তে আস্তে জায়গা খুঁজে নেব, কাজও খুঁজে নেব।’’ বললেন মফিজুল।
হাকিমপুর সীমান্তে অপেক্ষারত অনুপ্রবেশকারীরা। ছবি: সংগৃহীত।
আবার কি পুরনো পেশায় ফিরবেন? শাকবাড়িয়ায় মাছ ধরবেন?
মধ্য চল্লিশের অনুপ্রবেশকারী বলছেন, ‘‘সে আর হবে কি না জানি না। আগে তো শাকবাড়িয়ার ধারেই বাড়ি ছিল। সে সব তো আর নেই। গিয়ে দেখি, কী করা যায়।’’
নদীই বাঁচিয়ে রেখেছিল মফিজুলদের। নদীই সব গিলে নিয়েছে। আবার কি সেই নদীই জীবিকা জোগাবে? খুলনার শাকবাড়িয়া নদী কি ‘দত্তাপহারক’?
আর কথা বলা হল না মফিজুলের। বড় ছেলে ডাকতে এসেছেন। মাঝরাতে পরিবারের সবাই না-খেয়ে বসে রয়েছে, আর মফিজুল সাংবাদিকের সঙ্গে গল্পে মেতেছেন দেখে তিনি ঈষৎ অসন্তুষ্টই।
‘বৈধ’, তবু যাচ্ছি!
মফিজুলের বড় ছেলেরই বয়সি রিয়াজুল শেখের সঙ্গে দেখা হল চেকপোস্টের বাইরে। পুলিশ জিপের পাশে পরিবারের সঙ্গে বসে রয়েছেন। পেটানো চেহারা। দাড়িগোঁফ কামানো তীক্ষ্ণ চোয়াল।
কোথায় থাকতেন এ দেশে?
রিয়াজুল বললেন, ‘‘দমদমে, এয়ারপোর্টের কাছে।’’
কী করতেন?
‘‘আমি গাড়ি চালাতাম। বাবা রাজমিস্ত্রির কাজ করত।’’
বাংলাদেশে কোথায় বাড়ি? এ প্রশ্নের উত্তর শুনে একটু চমকেই যেতে হল। রিয়াজুল বললেন, ‘‘এটা বলতে পারব না। আমি কখনও যাইনি। বাংলাদেশের বাড়ি দেখিনি। বাবা বলতে পারবে।’’ ব্যাগপত্তরের উপরে গা এলিয়ে থাকা প্রৌঢ় ফরিদ শেখ বললেন, ‘‘হ্যাঁ, ও বাংলাদেশ দেখেনি তো। আমার তিন ছেলে-মেয়ে, সবারই জন্ম ভারতে।’’
কত দিন আগে ভারতে এসেছেন?
ফরিদ বললেন, ‘‘তা ৪০ বছর তো হবেই। তখন ইন্দিরা গান্ধী বেঁচে।’’ অর্থাৎ ৪০ বছর নয়, তারও বেশি আগে। ফরিদ বলেন, “আমার তখন ১৫ বছর বয়স। বাবা-মায়ের সঙ্গে চলে এসেছিলাম। এখানেই বিয়ে। এখানেই ছেলেমেয়েরা হয়েছে।’’ এখন কি সবাই মিলে ফিরছেন? ফরিদ জানালেন, কয়েক বছর আগে তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাংলাদেশে ফিরতে চান। তখন বাবা-মাকে একসঙ্গেই বাংলাদেশে রেখে এসেছিলেন। কিছু দিনের মধ্যেই বাবা মারা যান। সেই থেকে মা একা। এ বার সপরিবার মায়ের বাড়িতেই ফিরছেন।
এ দেশে এসে আয়-উন্নতি কেমন হয়েছিল, তার বিশদ বিবরণ ফরিদ এড়িয়ে যেতেই চান। তবে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে স্বচ্ছল সংসারই যে ছিল, কথায় কথায় সেটুকু বুঝিয়ে দেন। বলেন, “হঠাৎ যেতে হচ্ছে তো। অনেক কিছু ফেলে রেখে যাচ্ছি। বাংলাদেশ গিয়ে আগে পাসপোর্ট বানাব। ভিসা নিয়ে ভারতে এসে নিজের জিনিসপত্র, টাকাপয়সা নিয়ে যাব। অনেক কষ্টের টাকা।’’ কতটা টাকা পড়ে রয়েছে? কাদের কাছে রয়েছে? আর কী কী রয়ে গেল? ফরিদ আর বিশদে বলতে চান না। পাশে বসা পরিবারও আপত্তি করে ওঠে— “এ বার ছেড়ে দিন। সকাল থেকে কথাই বলে যাচ্ছে।’’
বাংলাদেশে ফিরে কাজকর্ম ঠিকমতো পাওয়া নিয়ে ফরিদ খুব একটা উদ্বিগ্ন নন। বললেন, ‘‘রাজমিস্ত্রির কাজ জানি তো। ফিরে এই কাজই করব।’’ ছেলে রিয়াজুল অবশ্য অতটা অনুদ্বিগ্নমনা থাকতে পারছেন না। বলছেন, ‘‘আমি তো বাংলাদেশ কখনও দেখিইনি। ওখানকার নিয়মকানুনও কিছুই জানি না। সবই নতুন করে শিখতে হবে। এখানে যে ভাবে গাড়ি চালাতাম, ওখানে গিয়ে সে ভাবে কাজ পাব কি না জানি না। জন্মভূমি ছেড়ে কখনও যেতে হবে ভাবিনি।’’
গলাটা ঈষৎ আটকে আসে রিয়াজুলের। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে জানান যে, তাঁকে কেউ ভারত ছেড়ে যেতে বলেননি। বরং এসআইআর-এর পরেও ভারতের ভোটার তালিকায় তাঁর এবং অন্য দুই ভাইবোনের নাম রয়েছে। চাইলে থেকে যেতেই পারেন।
তা হলে যাচ্ছেন কেন? ‘‘কী করব? মা-বাবার জন্মভূমি তো এটা নয়। বাংলাদেশ থেকেই এসেছিলেন। ওঁদের নাম কাটা পড়েছে। বাবা-মাকে ফিরতেই হবে। তাই আমরাও ফিরে যাচ্ছি।’’
ডবল সিংহের ছাপ!
কেরল থেকে হাকিমপুর সীমান্তে এসে হাজির হয়েছেন বছর চল্লিশের এক যুবক। নাম বলতে নারাজ। কেরলে কোথায় থাকতেন, আয়-উপায় কেমন হত, সে সবও বলতে চান না। শুধু জানালেন, তিনিও রাজমিস্ত্রি। বছর চারেক আগে ভারতে এসেছিলেন।
এখন হঠাৎ বাংলাদেশ ফিরছেন কেন? পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার না-হয় অনুপ্রবেশকারীদের উপরে চাপ বাড়িয়েছে। কেরলের নতুন কংগ্রেস সরকার তো সে সব করেনি। চোখ গোলগোল করে বাংলাদেশি যুবক বলছেন, ‘‘বাড়ির দরজা সিল করে দিয়ে যাচ্ছে। ডবল সিংহের ছাপ মেরে দরজা বন্ধ করে দিয়ে যাচ্ছে। এক বার ওই ছাপ পড়লে মামলা থেকে আর রেহাই পাওয়া যাবে না। তার চেয়ে নিজের দেশে চলে যাওয়াই ভাল।’’
ভারতের সরকারি প্রতীককে যে ‘অশোক স্তম্ভ’ নামে ডাকা হয়, তা কেরল থেকে আসা বাংলাদেশি যুবক সম্ভবত জানেন না। চোখের দেখায় সেই প্রতীককে তাঁর মনে হয়েছে ‘ডবল সিংহ’। তবে এ ‘ছাপ’ কোন সরকার মারছে, কেন্দ্র, না রাজ্য, সে সবের স্পষ্ট সুলুকসন্ধান তাঁর কাছে নেই। কাদের দরজায় ছাপ পড়েছে, ছাপ পড়ে থাকলে তাঁরা কী ধরনের আইনি জটিলতায় ফাঁসছেন, সে সবও পরিষ্কার করে বলতে পারছেন না। শুধু অদ্ভুত গোলগোল চাহনি হেনে, বিচিত্র ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বোঝাতে চাইছেন, কেরলে তিনি মোটেই নিরাপদে ছিলেন না! বোঝাতে চাইছেন যে, দরজায় ‘ডবল সিংহের ছাপ’ পড়া তাঁর জন্য বড় বিপজ্জনক!