Advertisement
E-Paper

তৃণমূল উধাও, সক্রিয় পুলিশ! রাজ্যে পালাবদল হতেই ছ’মাস আগের ছবি আমূল বদলে গেল বাংলাদেশ সীমান্তের হাকিমপুরে

ফিরে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে এ বার ভিন্ন উত্তর মিলছে। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে যাঁরা বাংলাদেশ ফিরছিলেন, তাঁরা বলছিলেন, ‘‘এসআইআর হচ্ছে, আমাদের তো থাকতে দেবে না, তাই চলে যাচ্ছি।’’

ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায় • হাকিমপুর

শেষ আপডেট: ২৮ মে ২০২৬ ১৬:৫৭
Scenes are different at Hakimpur Border, Six months back it was something else, what has changed and why

অদৃশ্য ভূমিকা বুলডোজ়ারের? —নিজস্ব চিত্র।

রাত প্রায় ১১টা। উত্তর চব্বিশ পরগনার প্রান্তিকতম জনপদ স্বরূপনগরের রাস্তাঘাট শুনশান। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে যাওয়া রাস্তায় বাঁকের পর বাঁক থাকা সত্ত্বেও গাড়ি হু-হু করে ছোটানো যাচ্ছে। কিন্তু সীমান্তের এক-দেড় কিলোমিটার আগে বিএসএফ চেকপোস্টের কাছাকাছি অপেক্ষা করছিল বিস্ময়! রাস্তার ধারে সার সার পুলিশের গাড়ি। কনস্টেবল আর সিভিক ভলান্টিয়ারদের ছোট-বড় জটলা। ইতিউতি কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের টহল। কী ব‍্যাপার! এক সাব ইনস্পেক্টর বললেন, “অ‍্যাডিশনাল সাহেব এসেছেন।” অর্থাৎ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। এসেছেন এসডিপিও-ও।

কাঁধে কাঁধ

ঘড়ির কাঁটা এখন ১১টার ঘর পার করছে। আর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পার্থ ঘোষ এবং এসডিপিও আয়ুষ পাণ্ডে বার বার চেকপোস্টের গেট পারাপার করছেন। ব‍্যস্ত পদক্ষেপে এক বার বিএসএফ চৌকির দিকে যাচ্ছেন, আবার ফিরে আসছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে যখন এসেছিলাম হাকিমপুরে, পুলিশি তৎপরতার এই ছবি দেখিনি। বিএসএফ চেকপোস্টের বাইরে তখনও এ রকমই ভিড় ছিল। হয়তো বা খানিকটা বেশিই। এসআইআর আবহে তখন ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে ফেরার হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল বিএসএফ। কিন্তু তাদের সাহায্য করার জন্য ত্রিসীমানার কোথাও মমতার পুলিশের দেখা মেলেনি। আর এ বার, রাজ্যে পালাবদলের পরে বিএসএফ-পুলিশ প্রায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। ক্ষমতার হাতবদল এ ভাবে ফারাক গড়ে দিয়েছে হাকিমপুর সীমান্তে।

Scenes are different at Hakimpur Border, Six months back it was something else, what has changed and why

বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় অনুপ্রবেশকারীরা। হাকিমপুর সীমান্তে। —নিজস্ব চিত্র।

পদ্ধতি বদল

অনুপ্রবেশকারীদের ফেরানোর পদ্ধতিও বদলে গিয়েছে ছ’মাসের মধ্যে। আগে যাঁরা বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছিলেন, তাঁদের সীমান্ত পার করানোর পুরো প্রক্রিয়া বিএসএফ-এর হাত দিয়েই হচ্ছিল। তখন হাকিমপুর চেকপোস্টের বাইরে ভিড় জমানো অনুপ্রবেশকারীদের ভাগে ভাগে চেকপোস্টের ভিতরে ডাকা হচ্ছিল। তাঁদের বাংলাদেশি নথি পরীক্ষা করে নাম-ঠিকানা নথিভুক্ত করা হচ্ছিল। তার পরে একসঙ্গে ৫০-১০০ জনকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছিল সীমান্তের নিকটবর্তী বিএসএফ ক‍্যাম্পে। সেখানে তাঁদের নাম-ঠিকানা বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি-র হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল। তালিকা যাচাইয়ের পরে বিজিবি-র তরফে সবুজ সঙ্কেত দেওয়া হলে বিএসএফ ক‍্যাম্পে অপেক্ষারতদের তুলে দেওয়া হচ্ছিল বিজিবি-হাতে।

এ বার পদ্ধতি ভিন্ন।

হাকিমপুর সীমান্তে যাঁরা ভিড় করেছেন, তাঁদের অনেকেরই প্রশ্ন, বিএসএফ চেকপোস্টে নাম নথিভুক্ত করার পরে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে? এ বার আর সরাসরি সীমান্তের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না শুনে তাঁদের আশঙ্কা, তবে কি গ্রেফতার করবে? তাঁদের জন্য আশ্বাস আসছে জমায়েতের মধ্যে থেকেই, “না না, গ্রেফতার করবে কেন? শুভেন্দু অধিকারী তো বলেছেন, কাউকে আটকাব না। যারা চলে যেতে চায়, তাদের চলে যেতে দেওয়া হবে।”

তা হলে হোল্ডিং সেন্টার কেন? সেখানে ক’দিন থাকতে হবে? থাকা-খাওয়া ঠিকঠাক মিলছে তো? আমাদের নামে মামলা হবে না তো? চিন্তান্বিত মুখ নিয়ে এমন নানা প্রশ্ন নানা জনের।

Scenes are different at Hakimpur Border, Six months back it was something else, what has changed and why

অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের চিন্তায়! —নিজস্ব চিত্র।

আসলে অনুপ্রবেশকারী বলে কেউ চিহ্নিত হলেই তাঁকে হোল্ডিং সেন্টারে (আটক শিবির) পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে রাজ‍্য সরকার। সে জন‍্য জেলায় জেলায় অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টারও খুলে গিয়েছে রাতারাতি। অতএব গত চার-পাঁচ দিন ধরে যাঁরা হাকিমপুর চেকপোস্টের বাইরে এসে জড়ো হচ্ছেন, তাঁদের বাংলাদেশি নথি বিএসএফ-এর পাশাপাশি পুলিশও পরীক্ষা করে দেখছে। তাঁদের নাম নথিভুক্ত করার পরে ১০০ থেকে ১৫০ অনুপ্রবেশকারীর এক একটি দলকে বাসে চাপিয়ে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে হোল্ডিং সেন্টারে। সেখানে আটকদের থাকাখাওয়ার বন্দোবস্ত করছে স্থানীয় প্রশাসন। তার পরে বাংলাদেশ থেকে বিএসএফের কাছে বার্তা এলে হোল্ডিং সেন্টার থেকে আটকদের ফের সীমান্তে আনছে পুলিশ। তাঁদের সীমান্ত পার করিয়ে বিজিবি-র হাতে তুলে দিচ্ছে বিএসএফ।

স্বরূপনগরে তিনটি হোল্ডিং সেন্টার আপাতত চলছে। একটি তেঁতুলিয়ায় ‘পথের সাথী’ অতিথিশালায়। পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার সুবিধার জন্য রাজ্য জুড়ে এমন বহু অতিথিশালা তৈরি হয়েছিল তৃণমূল আমলে। দ্বিতীয় হোল্ডিং সেন্টারটি চলছে চারঘাট হাইস্কুল সংলগ্ন ফ্লাড শেল্টারে। তৃতীয়টি মেদিয়ার একটি স্কুলে। সর্বত্রই পুলিশ মোতায়েন। আটকদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয় দেখভালের জন‍্য আশা কর্মীরা যাতায়াত করছেন। মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন স্থানীয় মেডিক্যাল অফিসার সৌরভ আচার্যও। বুধবার তেঁতুলিয়ার হোল্ডিং সেন্টারে আটক অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ছিল ১১৬। তাঁদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বিডিও অফিসের পক্ষ থেকে। অন্য দিকে, চারঘাট হাইস্কুলে আটক ৬৩ জন এবং মেদিয়ার স্কুলের হোল্ডিং সেন্টারে আটক ৫২ জনের জন্য রান্নার দায়িত্ব পড়েছে স্কুলেরই মিড ডে মিল কর্মীদের উপর। তাঁদের গরমের ছুটি আপাতত বাতিল। দুপুরে এবং সন্ধ্যায় স্কুলে গিয়ে রান্না করছেন মিড ডে মিল কর্মীরা। আর জলখাবারের জন‍্য স্বরূপনগর বিডিও অফিস থেকে নানা রকম শুকনো খাবার পাঠানো হচ্ছে। বুধবার দুপুরে চারঘাট হাইস্কুল চত্বরে যখন দাঁড়িয়ে আছি, তখনই খবর এল, আরও ৭০ জন অনুপ্রবেশকারীকে আনা হচ্ছে হোল্ডিং সেন্টারে। ফলে তৎপরতা বাড়ল। হোল্ডিং সেন্টারগুলির পরিচ্ছন্নতা এবং অন‍্যান‍্য ব‍্যবস্থাপনা দেখভাল করতে স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রতিনিধিরাও সক্রিয়। চারঘাট গ্রাম পঞ্চায়েতের বিজেপি সদস্য রাজেশ মণ্ডল এবং বিজেপি সমর্থিত নির্দল সদস্য মানস বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, মঙ্গলবার রাতে বিডিও-র তরফ থেকে তাঁদের হোল্ডিং সেন্টার তৈরি করার কথা জানানো হয়। মধ্যরাত থেকেই পঞ্চায়েত সদস্যরা সক্রিয় হন। কেউ কেউ বুধবার ভোর পর্যন্ত স্কুলে দাঁড়িয়ে থেকে সব বন্দোবস্ত সুনিশ্চিত করে তার পর ঘরে ফিরেছেন।

Scenes are different at Hakimpur Border, Six months back it was something else, what has changed and why

সীমান্ত পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা মহিলারা। —নিজস্ব চিত্র।

বুলডোজ়ারের ভয়!

ছ’মাস আগের আর এখনকার পরিস্থিতির মধ্যে ফারাক আরও এক জায়গায়। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে যাঁরা বাংলাদেশে ফিরছিলেন তাদের বক্তব্য ছিল, “এসআইআর হচ্ছে, আমাদের তো আর থাকতে দেবে না, তাই চলে যাচ্ছি।’’ অর্থাৎ, সে বার নিজেদের ইচ্ছায় স্বদেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অনুপ্রবেশকারীরা। সে দফায় মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকারা এ বার ফিরে যাচ্ছেন বাধ্য হয়ে। নিউটাউন সংলগ্ন ঘুনি বস্তি হোক বা এয়ারপোর্টের কাছে বাঁকড়া, হাওড়ার কোনও বস্তি থেকে আসা পরিবার হোক বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার দক্ষিণ বারাসত থেকে আসা মহিলা, সবার মুখে একই কথা। “যাদের বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, তারা আর থাকতে দিচ্ছে না। বলছে, তোমরা থাকলে আমাদের বিপদ হবে। পুলিশ এসে আমাদের ধরে নিয়ে যাবে। আমাদের বাড়ি বুলডোজ়ার দিয়ে ভেঙে দেবে। তোমরা চলে যাও।’’

ঘুনি বস্তি থেকে সীমান্তে পৌঁছোনো মফিজুল মোল্লা পুলিশি হানার কথাও শোনাচ্ছেন। বলছেন, ‘’আগের বারই পুরো বস্তি প্রায় খালি হয়ে গিয়েছিল। শুধু আমরা ২০-২২ ঘর রয়ে গিয়েছিলাম। তার পরে আগুন লেগে পুরো বস্তি পুড়ে গেল। পাশের পাড়াগুলোয় ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করলাম। কিন্তু সরকার বদলে যাওয়ার পরে মাঝেমধ্যেই পুলিশ আসছিল। ভয়ে রাতে বাড়িতে থাকতে পারছিলাম না। বাড়িওয়ালাও বলল, আর এক দিনও থাকা যাবে না। এখনই চলে যাও।’’

উধাও তৃণমূল

ফারাক আরও একটা চোখে পড়ছে হাকিমপুরে। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে চেকপোস্টের বাইরের জমায়েতকে ঘিরে স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশমুখী অনুপ্রবেশকারীরা কী খাবেন, তাঁদের মাথার উপরে কী রকম ছাউনি দিতে হবে, সমস্ত দেখভালের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন স্থানীয় তৃণমূল নেতারা। এমনকি এই অনুপ্রবেশকারীরা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন কি না, বললে ক’জনের সঙ্গে বলবেন, কতটুকু বলবেন, কী প্রশ্ন করা যাবে আর কী যাবে না, সে সবের নিয়ন্ত্রণও ছিল তৃণমূলের হাতে। সংবাদমাধ্যমের কয়েকজন প্রতিনিধির উপরে সে বার হামলাও হয়েছিল। এ বার সে সব ছবি উধাাও। সেই থমথমে আবহ এ বার নেই। হাকিমপুর চেকপোস্টের ত্রিসীমানায় আর কোনও তৃণমূল নেতাকে দেখা যাচ্ছে না। শাসানি, চোখরাঙানি অতীত। অথচ স্থানীয় পঞ্চায়েতের বোর্ড ছ’মাস আগে যাদের দখলে ছিল, এখনও তাদের দখলেই রয়েছে। প্রধান, উপ-প্রধান তখন যাঁরা ছিলেন, এখনও তাঁরাই রয়েছেন। শুধু ছ’মাস আগের স্বঘোষিত ‘দায়দায়িত্ব বোধ’ গায়েব হয়ে গিয়েছে।

এক বদলেই বেমালুম বদলে গিয়েছে হাকিমপুর সীমান্ত!

Indo-Bangladesh Border Gathering Infiltrators TMC Bangladeshi Infiltration
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy