E-Paper

আবেগ উস্কে প্রচারই সার, দেখা নেই ভাষা-ভালবাসার

বিভাজন ও মেরুকরণের রাজনীতির প্রতিস্পর্থী হিসাবে বাঙালি পরিচিতির সংহতির রাজনীতি কতটা কার্যকর? খোঁজ নিল আনন্দবাজার।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:৪৮

—প্রতীকী চিত্র।

হঠাৎ করেই নজরে পড়ে দোকানটি। কলকাতা পুরসভার মূল ভবনের গায়েই লাগানো সেই দোকানের নাম বাংলায় লেখা নেই! নাম-ফলকে রয়েছে ভিন্ রাজ্যের দু’টি ভাষা। রাতারাতি দীর্ঘ দিনের আলোচনা জল-বাতাস পায়। নির্দেশ দেওয়া হয়, শহরের সমস্ত দোকানের নাম অন্য ভাষার পাশাপাশি বাংলা হরফেও লিখতে হবে বাধ্যতামূলক ভাবে। যে দোকান দেখে টনক নড়েছিল, সেটির নামফলকে বদল আসে রাতারাতি। কিন্তু শহরের সর্বত্র কি এই নিয়ম কার্যকর হয়েছে? উত্তর, হয়নি। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি বাঙালি অস্মিতা-কেন্দ্রিক প্রচারের আবহেই তড়িঘড়ি ওই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল? আদতে যা ছিল শুধু ‘বাংলা-বাঙালি লাইন’-এর প্রচারের একটি কৌশল?

নির্বাচনের আগে শহরের নানা অংশেই এই আলোচনা চলছে। শাসকদলের অন্দরও এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। এতে অবাঙালি ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ ক্ষুব্ধ হতে পারেন বলে তাঁরা দলীয় আলোচনায় জানিয়ে রেখেছেন। একে জোর করে ‘বাংলা চাপানোর অপরাধ’ হিসাবেও বর্ণনা করেছেন কেউ কেউ।

রাজ্যে গত তিনটি বড় নির্বাচনে শাসকদলের প্রচারের অভিমুখ ছিল ‘বাংলা এবং বাঙালি’। ২০২৬-এর ভোটেও যে তারা সেই পথেই হাঁটছে, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। ভিন্ রাজ্যে বাঙালিদের হেনস্থা, হত্যা, বাংলার প্রতি বঞ্চনা, মনীষীদের অপমান ইত্যাদি নিয়ে উচ্চগ্রামে প্রচার শুরু হয়েছে। সমান্তরাল ভাবে চলছে ‘বাংলা-বিরোধী’ প্রচারেও শান দেওয়া। এই পরিস্থিতিতে শহরের নানা প্রান্তে ঘুরে দেখা গেল, কলকাতার ব্যবসায়ীদের সিংহভাগই অবাঙালি। বেশির ভাগই কথা বলেন মূলত হিন্দিতে, বাঙালি ক্রেতার সঙ্গেও। এখানেই প্রশ্ন ওঠে, বাংলা হরফই কি বাংলা ভাষার সব? ধর্মতলায় পুরভবনের বাইরেই যেমন হিন্দিভাষী ছোলা বিক্রেতাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কত দিন কলকাতায় আছেন? বাংলা বলতে পারেন? মাঝবয়সি ছোলা বিক্রেতার জবাব, ‘‘পঁয়তিস সাল বিত গয়া। কভি বাংলা বোলনেকা মওকা হি নহি মিলা। সবহি লোগ হিন্দি বোলতা হ্যায়।’’ পাশে দাঁড়ানো ক্রেতার মন্তব্য, ‘‘প্রতিযোগিতার নামে জোর করে এঁদের বাংলা লিখতে-পড়তে এবং বলতে বাধ্য করলে কি বাংলা ভাষা তথা বাঙালি অস্মিতার শ্রী-সম্মান বাড়বে? বাঙালি অস্মিতার রাজনীতিতে নামা লোকজন বুঝবেন কি, বাংলায় বসে অন্য কোনও ভাষায় ভাবের আদানপ্রদানে বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও আদতে একপ্রকার উগ্রতা?’’

শহরের বাসিন্দাদের বড় অংশেরই দাবি, বাঙালি অস্মিতার লড়াইয়ের চেয়েও এখন বেশি জরুরি বাংলা ভাষার শিক্ষায় জোর দেওয়া। তার বদলে রাজনীতির জন্য শুধু বাঙালি আবেগ উস্কে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁরা বলছেন, ভাষা ও অস্মিতা রক্ষার স্বার্থে বুনিয়াদি শিক্ষায় মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। শৈশব থেকে মাতৃভাষার প্রতি পড়ুয়াদের আগ্রহী করে তুলতে প্রয়োজনে পাঠ্য বিষয় ও ভাষা সংস্কারের কথা বিবেচনা করা উচিত। উত্তর কলকাতার একটি স্কুলের এক শিক্ষক বললেন, ‘‘এ কালে বহু শিক্ষিত বাঙালির কাছেই বাংলা ভাষা অপাঙ্‌ক্তেয়। তাঁরা ইংরেজি বলতে বা পড়তে না পারলে যে চাপে পড়েন, নির্ভুল ভাবে বাংলা বলতে বা পড়তে না পারলে তার ছিটেফোঁটা লজ্জাও পান না। তাঁদের বিশ্বাস, বাংলা ভাবের ভাষা হলেও কাজের ভাষা নয়। তাই তৃতীয় বা ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে বহু বেসরকারি স্কুলে বাংলা ভাষা টিকে আছে। কখনও কখনও জার্মান বা অন্য বিদেশি ভাষার সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে। তাই শিক্ষককেও তাকিয়ে থাকতে হয় পড়ুয়া বা অভিভাবকের বাংলা ভাষার প্রতি আবেগ আছে কিনা, তার উপরে। এই পথে বাঙালি অস্মিতা বা জাত্যভিমানের ধুয়ো তোলা যায়, লড়াই টিকিয়ে রাখা যায় না।’’

শহরেরই আর এক শিক্ষকের দাবি, ‘‘নতুন প্রজন্মের কাছে ২১ ফেব্রুয়ারি যতটা না স্বতঃস্ফূর্ত, তার চেয়ে বেশি আনুষ্ঠানিকতা। সরকারি স্কুলে পড়ুয়াদের ফেরানো ও পরিকাঠামোর সার্বিক উন্নয়ন দরকার। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করে স্কুলগুলির প্রতি আস্থা ফেরানো প্রয়োজন। শিক্ষান্তে নিজের রাজ্যে কর্মসংস্থানও জরুরি।’’
দক্ষিণ কলকাতার এক বাসিন্দার মন্তব্য, ‘‘এর বদলে এক দিকে অবৈধ খাজনা আদায়ের সর্বগ্রাসী সিন্ডিকেট সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ, পর পর নারী-নির্যাতনের ঘটনা, আর অন্য দিকে বিভাজনের রাজনীতির ক্রমবর্ধমান চাপ। তার
পাল্টা আবার বাঙালি অস্মিতার রাজনীতি। এই সমীকরণ পশ্চিমবঙ্গ আগে দেখেনি।’’

পূর্ব কলকাতার এক বাসিন্দা আবার শোনালেন তাঁর পরিচারিকা আয়েশার আতঙ্কের কথা। কাগজ দেখিয়ে তাঁদের ভোটার তালিকায় নাম তুলতে হবে। কাগজ দেখাতে যে কাউকেই ডাকা হতে পারে বলায় ওই পরিচারিকার মন্তব্য, ‘‘বাঙালিদের ভয় নেই। ভয় আমাদের।’’ আমাদের মানে? উত্তর ছিল, ‘‘মুসলিমদের।’’ বোঝানো হয়েছিল, মুসলিম কি বাঙালি নয়? যাঁরা বাংলায় কথা বলেন, তাঁরা সকলেই বাঙালি। দিনকয়েক বাদেই আয়েশার কান্না। ভিন্ রাজ্যে কাজে যাওয়া তাঁর ছেলেকে বাঙালি বলে মেরেছে! ওই বাসিন্দার মন্তব্য, ‘‘রাজ্যে কেউ আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছে বাঙালি নয় বলে। অন্য রাজ্যে কেউ দিশাহারা হচ্ছে বাঙালি বলে! কোন রাজনীতি এঁদের বাঁচাবে। আদৌ বাঁচাবে কি?’’

(শেষ)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Sign board Bengali Language Kolkata Municpal Corporation KMC West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy