বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-কে বৈধ বলল সুপ্রিম কোর্ট। নির্বাচন কমিশনের এসআইআর করার ক্ষমতা আইনেই রয়েছে বলে জানাল শীর্ষ আদালত। বুধবার রায় ঘোষণা করে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল মনুভাই পাঞ্চোলির বেঞ্চ জানায়, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরি করার ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। তারা ভোটার তালিকা যাচাই করতে পারে। অবৈধ ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার মধ্যে কোনও অন্যায় নেই। কমিশন ভোটারদের নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারে বলেও জানায় সুপ্রিম কোর্ট। তবে তা সীমিত পরিসরে। আইনজীবীরা জানান, এসআইআরের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে বিহারের মামলার এই রায় সারা দেশের জন্যই প্রযোজ্য হবে।
ভোটার তালিকা ঝাড়াই-বাছাই করতে দেশ জুড়ে এসআইআর করার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। গত বছর প্রথমে বিহার থেকে ওই কাজ শুরু হয়। পরে ধাপে ধাপে সারা দেশে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন শুরু করে কমিশন। পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গেও এসআইআর হয়। এসআইআরের নিয়ম নীতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। কমিশনের এসআইআর করার ক্ষমতা রয়েছে কি না সেই প্রশ্নও তোলা হয়। গত জানুয়ারি মাসে ওই মামলার শুনানি শেষ হয়। এত দিন রায় ঘোষণা স্থগিত ছিল। বুধবার প্রধান বিচারপতি কান্তের বেঞ্চ রায় ঘোষণা করে।
আদালত জানায়, কমিশনের ওই কাজ বেআইনি নয়। তারা নিজের ইচ্ছামতো ক্ষমতা ব্যবহার করেনি। সংবিধানই কমিশনকে ভোটার তালিকা সঠিক রাখার ক্ষমতা দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের মতে, ভারতের গণতন্ত্র সঠিক ভোটার তালিকার উপর দাঁড়িয়ে আছে। যদি ভোটার তালিকায়— মৃত ব্যক্তি, একই ব্যক্তির একাধিক নাম এবং অন্য জায়গায় চলে যাওয়া মানুষের নামও থেকে যায়, তবে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না। কমিশনের দায়িত্ব হল তালিকাকে পরিষ্কার ও নির্ভুল রাখা। নিশ্চিত করা অযোগ্য লোক ভোটার তালিকায় যেন ঢুকে না পড়েন।
বিহারে ২০০৩ সালে শেষ বার নিবিড় সংশোধন হয়েছিল। এত দিন পরে সেই কাজ হলে, গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর অপ্রয়োজনীয় আঘাত বলা যায় না বলে জানায় শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের মতে, কমিশনের ওই পদক্ষেপ অযৌক্তিক নয়। গত ২২ বছর ধরে এই সংশোধন হয়নি। যার ফলে ভোটার তালিকায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তবে এর জন্য অনেক মানুষ সমস্যায় পড়েছেন বলেও স্বীকার করে আদালত। রায়ে বলা হয়, যদি কারও নাম আগের ভোটার তালিকায় থাকে, তবে সাধারণ ভাবে ধরে নেওয়া হয় তিনি বৈধ ভোটার। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ভবিষ্যতে আর কখনও ওই ব্যক্তির ভোটার যোগ্যতা যাচাই করা যাবে না। প্রয়োজন হলে ভোটার তালিকা পুনরায় পরীক্ষা করা যেতে পারে। না হলে ভুয়ো ভোটার কখনও ঠিক করা সম্ভব হবে না।
আইন মেনে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আগে প্রত্যেক ভোটারকে প্রমাণ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানায় আদালত। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, কাউকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আগে কারণ জানিয়েছে কমিশন। তারা আপত্তি এবং শুনানির সুযোগও দিয়েছে।
বিহারের এসআইআরে ১১টি নথিকে মান্যতা দিয়েছিল কমিশন। মামলায় প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, কেন ওই ১১টি নথিকেই বেছে নেওয়া হল? কোন নথি গ্রহণ করা উচিত সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কি কমিশনের রয়েছে? উত্তরে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ভোটার তালিকা তৈরি ও সংশোধন করা কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তাই যাচাইয়ের জন্য কী ধরনের নথি লাগবে তা নির্ধারণ করার ক্ষমতাও তাদের রয়েছে। ২০০৩ সালের তুলনায় এ বার আরও বেশি নথি গ্রহণ করা হয়েছে।
কমিশন ভোটারদের আংশিক নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারে বলে জানায় সুপ্রিম কোর্ট। তারা প্রাথমিক ভাবে দেখতে পারে— কোনও ব্যক্তি ভোটার হওয়ার যোগ্য কি না, তিনি ভারতীয় নাগরিক কি না। তবে কমিশনের ওই ক্ষমতা ভোটার তালিকায় নাম থাকা এবং ভোট দেওয়ার অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তারা কারও নাম বাদ দিল মানেই তিনি বিদেশি নাগরিক নন। চূড়ান্ত নাগরিকত্ব ঠিক করার কাজ কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
কমিশন যে এক্রিয়ারের বাইরে গিয়ে কোনও কাজ করেনি রায়ে সে কথা ছত্রে ছত্রে উল্লেখ করেছে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। তারা বুধবার সব মামলার নিষ্পত্তি করে দেয়।