×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৮ জুন ২০২১ ই-পেপার

রায়ের আগেই টাটা জমি ফেরাক, আর্জি পার্থর

নিজস্ব সংবাদদাতা
সিঙ্গুর ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ০৩:৩৮
সিঙ্গুর দিবসে সিঙ্গুরে পার্থ চট্টোপাধ্যায়। রয়েছেন বেচারাম মান্নাও। বৃহস্পতিবার। —নিজস্ব চিত্র।

সিঙ্গুর দিবসে সিঙ্গুরে পার্থ চট্টোপাধ্যায়। রয়েছেন বেচারাম মান্নাও। বৃহস্পতিবার। —নিজস্ব চিত্র।

সুপ্রিম কোর্ট সিঙ্গুর নিয়ে রায় দেওয়ার আগে টাটা গোষ্ঠীকে আদালতের বাইরে সমঝোতায় আসার জন্য পরোক্ষে বার্তা দিলেন তৃণমূলের মহাসচিব তথা প্রাক্তন শিল্পমন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়।

বৃহস্পতিবার, ‘সিঙ্গুর দিবস’-এ সিঙ্গুরে গিয়ে টাটাকর্তাদের উদ্দেশে পার্থবাবু বললেন, “আপনারাই বলে দিন, আদালতের বাইরে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে জমি ফেরত দেব।” সিঙ্গুরের জমি ফেরত নেওয়া নিয়ে টাটাদের সঙ্গে রাজ্যের যে মামলা চলছে, শীঘ্রই তার রায় ঘোষণা হওয়ার কথা। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সেই রায় যে তাঁদের পক্ষে না-ও যেতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে যে বিড়ম্বনা আরও বাড়ার সম্ভাবনা, তা মাথায় রেখেই সম্ভবত এই বিকল্প রাস্তা খোলার চেষ্টা।

পার্থবাবু এ দিন বলেন, “টাটাভাইরা বুঝুন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পুলিশ এখানকার অনিচ্ছুক কৃষকদের উপর গুলি চালিয়ে, অত্যাচার করে আন্দোলন থেকে সরাতে পারেনি। তাই টাটাভাইদের কাছে আমাদের আবেদন, এখানকার মানুষের গণভোটকে সম্মান জানিয়ে অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফেরত দিন।” যে সিপিএম টাটাদের সিঙ্গুরে নিয়ে এসেছিল, জনতার আদালতে যে ইতিমধ্যে তাদের বিচার হয়ে গিয়েছে তা-ও মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি পার্থবাবু। বরং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সিঙ্গুরের মানুষের মন বোঝার পরামর্শই দিয়েছেন তিনি।

Advertisement

পার্থবাবুরা যখন এই ভাবে পাল্টা চাপ তৈরির চেষ্টা করছেন, মানুষকে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন যে দায় আসলে তাঁদের নয়, জমিদাতাদের অধিকাংশই ছিলেন প্রায় নির্বিকার। এক সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভরসাতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সিঙ্গুরের মাঠে হাজির হয়েছেন ‘অনিচ্ছুক’ চাষিরা। তিন বছর হয়ে গেল, তাঁর দল সরকারে। এক জনও জমি ফেরত পাননি, বরং পরিস্থিতি জটিলতর। জমি যে ফেরত পাবেন, এমন আশা ছেড়ে দিয়েছেন অনেকে। তাই ‘সিঙ্গুর দিবস’-এ ওঁদের আর কোনও হেলদোল হয় না।

২০০৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর যে ব্লক অফিস থেকে পুলিশ টেনে-হিঁচড়ে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছিল, সেখানেই বাঁধা মঞ্চে সিঙ্গুরে মমতার লেফটেন্যান্ট বেচারাম মান্নাকে তাই বলতে হল, “দিদির উপর আস্থা রাখুন। জমি আপনারা ফেরত পাবেন।” মঞ্চে তিনি আর পার্থবাবু ছাড়াও ছিলেন উপস্থিত ছিলেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী। ছিলেন না শুধু স্থানীয় বিধায়ক তথা সিঙ্গুর আন্দোলনের অন্যতম মুখ রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। আর ছিলেন না ‘অনিচ্ছুক’ কৃষকদের বেশির ভাগই। বরং হরিপাল, তারকেশ্বর বা চণ্ডীতলার তৃণমূল কর্মী-সমর্থকরাই ভিড় বাড়িয়ে রেখেছিলেন।

এখনও পর্যন্ত ঘটনার যা গতিপ্রকৃতি, তাতে ‘অনিচ্ছুক’ চাষিদের উৎসাহ থাকার কথাও নয়। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে মমতা জমি ফেরতের তোড়জোড় করতেই আদালতে চলে গিয়েছিল টাটারা। কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, সরকারের জমি ফেরতের প্রক্রিয়া ‘অসাংবিধানিক’। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য। আগামী ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টে রায় ঘোষণার কথা। পার্থবাবুর দাবি, “সিঙ্গুরের কৃষিজমি রক্ষায় দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনশন, ধর্না-অন্দোলন বিফলে যাবে না। আদালত এখানকার মানুষের কন্ঠস্বর শুনবে বলে আমরা আশাবাদী।” আদালত যে জনমতের ভিত্তিতে রায় দেয় না, নির্দিষ্ট আইনের ভিত্তিতে দেয় তা তৃণমূল নেতাদের অজানা নয়। কিন্তু আইন কতটা তাঁদের পক্ষে যাবে, সে ব্যাপারে অনিশ্চিত বলেই এখন আশা আঁকড়ে থাকা ছাড়া তাঁদের গত্যন্তর নেই।

তাতে অবশ্য চিঁড়ে ভিজছে না। আশ্বস্ত হতে পারছেন না ‘অনিচ্ছুক’ চাষিরা। গ্রামের বাড়িতে বসে তাঁদের অনেকেই জানিয়ে দিয়েছেন, প্রতিশ্রুতি শুনতে-শুনতে তাঁরা ক্লান্ত। গোপালনগর ঘোষপাড়ার হরি ঘোষ বলেন, “এখন আর কোনও কথাতেই বিশ্বাস হয় না। আগে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিক। তার পরে ভাবা যাবে।” তাঁর সংশয়, “রায় যদি আমাদের পক্ষেও আসে, তার বিরুদ্ধে যে আবার মামলা হবে না, সেটা কে বলতে পারে!” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চাষি বলেন, “এখন মিটিং-মিছিলে যাওয়া স্রেফ সময় নষ্ট বলে মনে হয়। তাই আজ যাইনি। এতগুলো দিন কেটে গেল। আর কবে জমি ফেরত পাব?”

Advertisement