সকাল-সকাল গ্রামের আটচালায় হাজির স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকেরা। টেবিল-চেয়ার পেতে বসে পাড়ার লোকজনকে জানালেন, পাঁচ বছর বয়স পেরিয়ে যাওয়া যে সব খুদে এখনও স্কুলে ভর্তি হয়নি, তাদের অভিভাবকেরা যেন এসে দেখা করেন। খবর পেয়ে অভিভাবকেরা হাজির হতেই, কাগজপত্র বার করে শুরু হল ভর্তির প্রক্রিয়া।
বাঁকুড়ার রাইপুরের গ্রামে এই ছবি দেখা যাচ্ছে ২৮ ডিসেম্বর থেকে। করোনা-কালে দীর্ঘদিন প্রাথমিক স্কুল বন্ধ। নতুন ছাত্রছাত্রী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে কি না, এ বিষয়ে সন্দিহান প্রত্যন্ত এলাকার বহু অভিভাবক। ফলে, নির্দিষ্ট বয়স হলেও অনেক শিশু পড়াশোনার বৃত্তের বাইরে রয়ে যেতে পারে, আশঙ্কা রাইপুরের চাতরি নিম্ন বুনিয়াদি আবাসিক স্কুলের শিক্ষকদের। তা আটকাতে নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে শুরু করেছেন ‘দুয়ারে শিশু ভর্তি’ কর্মসূচি।
স্কুলটির প্রধান শিক্ষক উত্তমকুমার মণ্ডল জানান, নবম থেকে দ্বাদশের ক্লাস চালু হলেও, প্রাথমিক স্কুল বন্ধই রয়েছে। তবে ২১ নভেম্বর থেকে প্রাথমিকে নতুন পড়ুয়া ভর্তি শুরু হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘অভিভাবকদের একাংশের কাছে হয়তো সে খবর পৌঁছয়নি। ফলে, ভর্তির প্রক্রিয়ায় গতি ছিল না। তাই এলাকায় গিয়ে ভর্তি নেওয়া শুরু করেছি।’’ তিনি জানান, দুন্দার পঞ্চায়েতের স্থানীয় বিজেপি সদস্য জ্যোৎস্না সর্দারকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ায়-পাড়ায় যাচ্ছেন স্কুলের চার শিক্ষক এবং দুই পার্শ্বশিক্ষক-শিক্ষিকা। স্কুলে এসে মাত্র জনা পাঁচেক শিশু ভর্তি হয়েছিল। এলাকায় গিয়ে প্রথম তিন দিনে দশ জনকে ভর্তি করানো হয়েছে।
পঞ্চায়েত সদস্য জ্যোৎস্না জানান, করোনা-পরিস্থিতিতে স্কুলে ভর্তির প্রক্রিয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন অনেক অভিভাবক। চাষের কাজে ব্যস্ত থাকাতেও অনেকে স্কুলে গিয়ে শিশুকে ভর্তি করানোর সময় পাননি। তাঁর কথায়, ‘‘এ সব কারণেই ধীর গতিতে ভর্তি প্রক্রিয়া এগোচ্ছিল। শিক্ষকেরা পাড়ায় হাজির হওয়ায়, বাসিন্দাদের সুবিধা হয়েছে।’’
অভিভাবক পঞ্চানন গরাই, বিশ্বজিৎ মণ্ডলদের দাবি, ‘‘শিক্ষকেরা দোরগোড়ায় আসায় বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করাতে পেরেছি। খুব উপকার হল।’’ রাইপুরের বাসিন্দা, রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষক জগবন্ধু মাহাতোর মতে, করোনা-পরিস্থিতির মধ্যে কখন স্কুলে ভর্তি চলছে, তা গ্রামের সব মানুষ না-ও জানতে পারেন। তিনি বলেন, ‘‘সে কথা মাথায় রেখে ওই শিক্ষকেরা যে ভাবে এগিয়ে এসেছেন, সাধুবাদ জানাই।’’
বাঁকুড়া জেলা স্কুল পরিদর্শক (প্রাথমিক) জগবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষজন এখন স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারছেন না। ফলে, অনেক তথ্যও জানতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে রাইপুরের স্কুলের শিক্ষকদের এই কর্মসূচি অন্য স্কুলের কাছেও দৃষ্টান্ত হতে পারে।’’
(সহ-প্রতিবেদন: রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়)