Advertisement
E-Paper

কাহিনির টানেই জনপ্রিয়তা বেড়েছে মনোহরশাহী ঘরানার

স্বেদ ও পুলক। হর্ষ ও রোষ। প্রেম ও বিরহ। লোককথা ও শাস্ত্রচর্চা জড়িয়ে আছে প্রতিটি চরণে। বাংলার নবজাগরণে ভাষা ও ভাব নদীর মতো ধারণ করেছিল কীর্তন। তার অন্তরের খোঁজ নিচ্ছে আনন্দবাজার।সুসজ্জিত এবং বিরাট এক নাটমন্দির। সাদা মার্বেলের মেঝের উপর ফরাস পাতা। মাথার উপরে বিরাট ঝাড় লন্ঠন। সামনে রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ। অন্য ধারে চৈতন্যদেবের পটচিত্র। তাঁকে বাঁ দিকে রেখে নিবেদিত কণ্ঠে শুরু হয়েছে কীর্তন।

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০২:৩৭
নবদ্বীপ রাধারমণ বাগ সমাজবাড়ির সৌজন্যে পাওয়া নগর সংকীর্তনের একটি প্রাচীন চিত্র।

নবদ্বীপ রাধারমণ বাগ সমাজবাড়ির সৌজন্যে পাওয়া নগর সংকীর্তনের একটি প্রাচীন চিত্র।

সুসজ্জিত এবং বিরাট এক নাটমন্দির। সাদা মার্বেলের মেঝের উপর ফরাস পাতা। মাথার উপরে বিরাট ঝাড় লন্ঠন। সামনে রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ। অন্য ধারে চৈতন্যদেবের পটচিত্র। তাঁকে বাঁ দিকে রেখে নিবেদিত কণ্ঠে শুরু হয়েছে কীর্তন। প্রবীণ কীর্তনিয়া সরস্বতী দাস গাইছেন “শচীর দুলাল খেলত হো হো রঙ্গে হোরি, প্রিয় গদাধর সঙ্গে মন আনন্দে লেই বহু রঙ্গ পিচকারি।”

শ্রীপঞ্চমী তিথি থেকেই বৈষ্ণব মন্দিরে মনে করা হয় বসন্ত এসে গেছে। ফলে কীর্তনের রাগও বসন্ত। মৃদঙ্গে বাজছে ২০ মাত্রার আড়তাল। সঙ্গে হারমোনিয়াম, বাঁশি, কর্তাল এবং মন্দিরা।

অগুরু চন্দনের সঙ্গে সুগন্ধী ধূপের ভারি ধোঁয়া পাক খেয়ে গোটা এলাকা মাতিয়ে তুলেছে। গোলাপ, রজনীগন্ধার মৃদু সুবাস। শ্রোতাদের কপালে অগুরু মেশানো জলে গোলা তিলক মাটি গাঁদা ফুলে মাখিয়ে কপালে টিপ এঁকে দিচ্ছেন এক বাবাজি। কীর্তন রসভারতী সরস্বতী দেবী গাইছেন মনোহরশাহী ঢঙে।

মনোহরশাহী। বাংলা কীর্তনের প্রচলিত ধারাগুলির মধ্যে এখন অন্যতম প্রধান ঘরানা। কীর্তনের অন্য ধারাগুলি ক্ষীণ হয়ে গেলেও একমাত্র মনোহরশাহী ঘরানাই এখন বাংলা কীর্তনের মূল ধারা হিসাবে টিকে রয়েছে। একটা সময়ে বাংলা কীর্তনে প্রচলিত ছিল একাধিক ধারার কীর্তন। গরানহাটি, মনোহরশাহী, রেনেটি, মন্দারণী ও ঝাড়খন্ডী ঘরানা। এ ছাড়া, ময়নাডাল নামে আরও একটি ধারা প্রচলিত ছিল। তবে ময়নাডাল কীর্তন ঘরানা আসলে মনোহরশাহীর একটি রূপভেদ। তবে এই মুহূর্তে মনোহরশাহী ছাড়া আর কোন ঘরানার কীর্তনই সে ভাবে শোনা যায় না।

ঝাড়খন্ডী ঘরানার কীর্তনও মিশে গিয়েছে ঝুমুর গানে। কীর্তনের নিজস্ব তালে ঝাড়খণ্ডী কীর্তন গীত হয় না। পণ্ডিতদের মতে কীর্তনের নিজস্ব তালে গাওয়া না হলে তাকে কীর্তন বলা যায় না। ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে নরোত্তম দাস ঠাকুরের নিজস্ব উদ্ভাবন কীর্তনের গরানহাটি ধারাটি। বাংলাদেশের রাজশাহীতে উৎপত্তি হলেও গরানহাটি কীর্তনের বিস্তারভূমি ছিল নদিয়া এবং মুর্শিদাবাদ। মূলত নরোত্তম ঠাকুরের শিষ্যরা এই ঘরানার কীর্তন গাইতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেছে এই ধারা। হাতে গোনা কিছু দক্ষ কীর্তনিয়া গরানহাটি ঘরানার গানের নমুনা আসরে উপস্থাপন করলেও ওই ঘরানার কীর্তন গাওয়ার শিল্পী দ্রুত কমে আসছে।

১) গরানহাটি ঘরানা—নরোত্তম দাস ঠাকুর রাজশাহী জেলার গরানহাটি পরগনার খেতুরি গ্রামে মহোৎসবের আয়োজন করে কীর্তনের যে নতুন ধারার প্রচলন করেন, তাকে বলা হয় গরানহাটি রীতির কীর্তন।

২) মনোহরশাহী ঘরানা—বর্ধমান জেলার শ্রীখণ্ড অঞ্চলের মনোহরসাই পরগনায় এই বিশেষ ঘরানার কীর্তনের উদ্ভব। কেউ কেউ বলেন শ্রীখণ্ডের কাছে কাঁদরা নিবাসী বংশীবদন ঠাকুর এবং তাঁর সঙ্গীতগুরু আউলি মনোহর দাস এই ঢঙের উদ্ভাবক। কেউ কেউ বলেন শ্রীনিবাস আচার্য এই ঘরানার উদ্ভাবক।

৩) রেনেটি ঘরানা—কুলীন গ্রামের কাছে দেবীপুর রানিহাটি পরগণার বাসিন্দা বিপ্রদাস ঘোষ এই বিশেষ ধারার কীর্তনের উদ্ভাবক। এই ধারার কীর্তনের সুর ছিল সরল। লয় সংক্ষিপ্ত। গতি দ্রুত। এই কীর্তন পশ্চিম রাঢ়বঙ্গে জনপ্রিয় ছিল।

৪) মন্দারণী ঘরানা—হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমার পশ্চিমের মন্দারন অঞ্চলে এই ধারাটির সৃষ্টি। প্রবর্তক বংশীবদন। এই ধারা কীর্তনের সুর রেনেটির মতোই সহজ সরল। পাঁচালী ও মঙ্গলগানের সুরের মিশ্রণে এই ঢং গড়ে উঠেছিল।

৫) ঝাড়খন্ডী ঘরানা—পুরুলিয়া জেলার সেরগড় পরগণার ঝাড়খণ্ড। এই অঞ্চলে প্রচলিত কীর্তন ধারা ঝাড়খণ্ডী ঘরানা বলে প্রচলিত। মূলত ঝুমুর গানের জন্য প্রসিদ্ধ ঝাড়খন্ডের কীর্তন ধারায় অনিবার্য ভাবেই ঝুমুর বিশেষ করে ‘বৈঠকি ঝুমুরের’ প্রবল প্রভাব লক্ষণীয়।

কিন্তু বাঙলা সঙ্গীতের প্রধান সম্পদ কীর্তনের কেন এমন হাল?

প্রবীণ সরস্বতী দাস থেকে দীনেন্দ্র নন্দী, শুক্লা হাজরা থেকে সুমন ভট্টাচার্যের মতো এই সময়ের প্রধান কীর্তনিয়ারা এই সম্পর্কে তাঁদের অভিজ্ঞতা লব্ধ ভাবনা জানিয়েছেন।

সরস্বতী দাসের কথায়, চৈতন্য পরবর্তী কালে নরোত্তম দাস ঠাকুর বাংলা কীর্তনকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইলেন। এ জন্য তিনি খেতুরি গ্রামে মহোৎসবের আয়োজন করেন। সেখানে নরোত্তম তাঁর নিজের সৃষ্টি এক নতুন কীর্তনধারার প্রচলন করেন। যদিও চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই বঙ্গদেশে কীর্তনের প্রচলন ছিল।

চৈতন্য পরবর্তী যুগে নরোত্তম দাস তখন বৈষ্ণবসমাজের অন্যতম প্রধান আচার্য। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পারদর্শী নরোত্তম দাস চেয়েছিলেন কীর্তনের মধ্যে দিয়ে বৈষ্ণবতত্ত্বের গোড়ার কথা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কাঠামোয় ধরে রাখতে। ফলে তাঁর প্রচলিত গরানহাটি কীর্তনধারায় পদের প্রাধান্য বেশি। মূলপদের উপর গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়। ‘লীলা’ বর্ণনা সম্পূর্ণ না হলেও চলে। আখরের কারুকাজ নেই বললেই চলে। কীর্তন গান যে তালে যে লয়ে শুরু, সেই তাল-লয়েই শেষ হয়। বিলম্বিত, ধীর গতির এই ধারার কীর্তন গাম্ভীর্যে ধ্রুপদ গানের সঙ্গে তুলনীয়। এবং ভীষণ ভাবে রাগ প্রধান। দশকোশী, একতালি, তেওট, লোফার মতো দীর্ঘ তালে গাওয়া হত গরানহাটি ঘরানার কীর্তন। যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বিলম্বিত তালে গাওয়া ওই কীর্তন সাধারণ শ্রোতার কাছে একঘেয়ে হয়ে ওঠে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষা ছাড়া ওই কীর্তন বোঝা সম্ভবপর ছিল না।

সুমন ভট্টাচার্যরও মতে, প্রাকচৈতন্য যুগের কীর্তনের শাস্ত্রীয় রূপটি ধরা পড়ে জয়দেবের গীতগোবিন্দে। অন্য দিকে, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে’ ধরা আছে কীর্তনের লোকায়ত ধারাটি। চৈতন্য পরবর্তী যুগে নরোত্তম দাস চেয়েছিলেন কীর্তনের মধ্যে দিয়ে বৈষ্ণবতত্ত্বের গোড়ার কথা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কাঠামোয় ধরে রাখতে। এ জন্য তিনি খেতুরি গ্রামে মহোৎসবের আয়োজন করেন। সেখানে নরোত্তম তাঁর নিজের সৃষ্টি এক নতুন কীর্তনধারার প্রচলন করেন। খেতুরি মহোৎসব বাংলা কীর্তনের ক্ষেত্রে একটি নতুন পথ নির্দেশ দেয়। পরবর্তী কালে গরানহাটি ধারার কীর্তন থেকেই রূপ বদলে কীর্তনের অন্য ঘরানাগুলির উদ্ভব। বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নির্ভর এই ঘরানা নরোত্তম দাসের অনুগামী ছাড়া শ্রোতাদের কাছে খুব বিরাট ভাবে জনপ্রিয় হয়নি।

সরস্বতীদেবীর কথায়, ‘‘সম্পূর্ণ লীলাকীর্তন বলতে যে রূপটি বোঝেন শ্রোতা, তাই মনোহরশাহী গান। একটি পদে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন পদাবলীর সাহায্যে নাটকীয় ভাবে সাজিয়ে গৌরচন্দ্রিকা থেকে মিলন পর্যন্ত পর্যায়গুলি ক্রমানুসারে পরিবেশন করা হয়। মূলপদের শেষে পদের ভাবানুসারে আখরের ব্যবহার এই ঘরানার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লীলাকে সাজাতে মহাজনী পদের বাইরে এইসব কথার গুরুত্ব অপরিসীম। কখনও রাগ সঙ্গীত আবার কখনও আঞ্চলিক সুরের প্রয়োগে মনোহরশাহী ঘরানার কীর্তন ক্রমশই মনোরঞ্জক হয়ে ওঠে। যা ছিল মুখ্যত নাগরিক।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy