রাজ্যসভা ভোটে তিনি বরাবরই চমক দেন। এ বারেও দিয়েছেন। প্রতি বারই তৃণমূলের রাজ্যসভার প্রার্থিতালিকা ঘোষণার আগে বিভিন্ন ধরনের গুজব এবং গালগল্প ছড়াতে থাকে। কেউ সরল ভাবে বিশ্বাস করে বসেন। আবার পোড়খাওয়া কেউ কেউ অপেক্ষা করেন। দিনের শেষে দেখা যায়, কোনও ‘সম্ভাব্য’ নামই তালিকায় নেই। উল্টে মাথার টুপি উল্টে জাদুকরের খরগোশ বার করে আনার মতো অভাবনীয় সব প্রার্থীর নাম নিয়ে হাজির হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এ বারেও তার ব্যতিক্রম হল না। তবে ফারাক একটা তৈরি হল। অন্যান্য বার রাজ্যসভা ভোটে মমতা এবং তৃণমূলের অন্যতম শীর্ষনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পারস্পরিক আলোচনাসাপেক্ষে এমন প্রার্থী বাছা হয়, যাঁদের মনোনয়নের মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজকে বার্তা দেওয়া যাবে। যেমন সংখ্যালঘু মুসলিম বা খ্রিস্টান মুখ, যেমন মহিলা, যেমন আদিবাসী সমাজের প্রতিনিধি। কিন্তু এ বার তৃণমূল রাজ্যসভার ভোটের জন্য যে প্রার্থিতালিকা পেশ করেছে, তাতে দলের অন্দরে বার্তা দেওয়ার লক্ষণই স্পষ্ট। পাশাপাশিই, চার জন প্রার্থীকেই বাছা হয়েছে সমাজের ‘উচ্চপর্যায়’ থেকে। যাতে শহুরে জনতারও দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।
আপাতদৃষ্টিতে দেখলে চমকটাই আগে নজরে পড়ে। কিন্তু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এতে সমাজের শহুরে অংশকে (যে অংশে পশ্চিমবঙ্গে স্থিতাবস্থা বিরোধিতার প্রবণতা রয়েছে। যা লোকসভা ভোটের ফলাফলে স্পষ্ট ছিল। সারা রাজ্যের মোট ৭৬টি পুরসভায় পিছিয়ে ছিল তৃণমূল) যেমন বার্তা দেওয়া হয়েছে, তেমনই দলের ভিতরেও সঙ্কেত দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি নামের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে খুশি বা অখুশি হওয়ার মতো কয়েকটি নাম।
কোয়েল মল্লিক
কোয়েলের মনোনয়ন বিস্ময়কর হতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে খুবই নিরীহ এবং নিরাপদ মনোনয়ন। কিন্তু কোয়েল যেমন বাংলা ছবির জগতের দাপুটে অভিনেত্রী, তেমনই শিক্ষিত এবং সফল সংসারী। তাঁর এবং তাঁর পরিবারের সহবত বোধ যথেষ্ট প্রশংসিত এবং আলোচিত। তাঁর পারিবারিক পটভূমিকাও সামাজিক দিক দিয়ে প্রণিধানযোগ্য। তিনি টলিউডে সে অর্থে ‘শ্রমিকশ্রেণি’ নন। মডার্ন হাইস্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী কোয়েল। টালিগঞ্জ ফিল্মপাড়ায় পরিবারের সঙ্গে মমতার সম্পর্ক বরাবরই ঘনিষ্ঠ। কোয়েলের বাবা প্রবীণ অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক তৃণমূলনেত্রীর কাছের মানুষ। ফলে কেউই খুব একটা আশ্চর্য হননি, যখন অভিষেক রঞ্জিতের বাড়িতে গিয়ে তাঁর হাতে রাজ্য সরকারের ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ তুলে দিলেন। তখনও অবশ্য কেউ ভাবতে পারেননি, কয়েক মাস পরে মল্লিক পরিবারের কন্যা কোয়েল তৃণমূল তথা সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিয়ে রাজ্যসভার সাংসদ হতে চলেছেন। কিন্তু কোয়েলের মনোনয়নেও বার্তা আছে। সে বার্তা অধুনা টলিউডের কেষ্টু-বিষ্টুদের জন্য। তাঁরা হলেন অরূপ বিশ্বাস এবং স্বরূপ বিশ্বাস। কারণ, টালিগঞ্জ পাড়ায় সকলেই জানেন, কোয়েলের প্রযোজক স্বামী নিসপাল সিংহ এখন ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে মুখ্যমন্ত্রীর অন্যতম ‘আস্থাভাজন’। আগে যে জায়গাটা ছিল শ্রীকান্ত মোহতার। গত কয়েক বছরে প্রায় নিঃশব্দেই পটবদল ঘটে গিয়েছে। টালিগঞ্জের বিধায়ক হওয়ার সুবাদে মন্ত্রী অরূপ এবং ফেডারেশনের কর্তা হিসাবে তাঁর ভাই স্বরূপের ‘অভিভাবকত্ব’ নিয়ে ইন্ডাস্ট্রির একটি অংশের ক্ষোভ রয়েছে। গত কয়েক বছরে বার বার সংঘাত বেধেছে। তা ঢাকাচাপা দিয়েই কাজ চলছে। কিন্তু সম্প্রতি অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে অঘোষিত ভাবে ‘নিষিদ্ধ’ করা নিয়ে পরিস্থিতি আবার জটিল হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন দেব-শুভশ্রীর মতো সেলুলয়েডের হিট জুটি। অনির্বাণের হয়ে ‘ক্ষমা’ চেয়েছেন তাঁরা। ক্ষমা চেয়েছেন পরিচালক তথা তৃণমূল বিধায়ক রাজ চক্রবর্তী।
এই আবহে কোয়েলকে রাজ্যসভার সাংসদ মনোনীত করে নিসপালকেই আরও ‘শক্তিশালী’ করলেন মমতা। বার্তা দিলেন বিশ্বাস ভ্রাতৃদ্বয়কে। কোয়েলের রাজ্যসভায় মনোনয়নে অরূপ-স্বরূপের খুশি হওয়ার কারণ নেই। এ-ও কি নেহাতই কাকতালীয় যে, যেদিন রাতে কোয়েলের নাম ঘোষিত হল, সেদিনই ‘অনির্বাণ-জট’ কাটার একটা ইঙ্গিত পাওয়া গেল?
বাবুল সুপ্রিয়
নরেন্দ্র মোদীর অধীনে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে তৃণমূলে এসে মোটামুটি ভালবাসার উপরেই থেকেছেন বাবুল। ভোটে লড়েছেন। রাজ্যের মন্ত্রী হয়েছেন। মমতা প্রকাশ্যেই মন্ত্রী হিসাবে তাঁর কাজের প্রশংসা করেছেন। বাবুলের সুকণ্ঠেরও দরাজ ব্যবহার করেছেন। অভিষেকেরও আস্থাভাজনই ছিলেন বাবুল। কারণ, যাঁর হাত ধরে তাঁর বিজেপি থেকে তৃণমূলে যোগদান, সেই ডেরেক ও’ব্রায়েন অভিষেকের ‘ঘনিষ্ঠ এবং আস্থাভাজন’ বলেই দলের অন্দরে পরিচিতি পেয়ে থাকেন। শুধু একজনের ভালবাসা থেকে বাবুল বরাবর বঞ্চিত থেকে গিয়েছেন— ইন্দ্রনীল সেন। দু’জনেই সুগায়ক (ঘনিষ্ঠমহলে কেউই গায়ক হিসাবে অন্যকে খুব নম্বর দিতে চান না। প্রকাশ্যে অবশ্য খুবই গলাগলি)। দু’জনেই রাজ্যের মন্ত্রী। ইন্দ্রনীল আবার মমতার অধীনে তথ্যসংস্কৃতি দফতরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী। অর্থাৎ, সরকারি অনুষ্ঠানে কে, কখন মঞ্চ পাবেন, সেটি তাঁর নিয়ন্ত্রণে। বাবুলের ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য, এমনকিছু অনুষ্ঠানে কিছু কিছু ঘটনা ঘটেছিল, যা দু’জনের সম্পর্ককে ‘মধুর’ থেকে ‘মধুরতর’ করেছে। এ ছাড়া, বিধানসভা ভবনে প্রকাশ্যে তর্কাতর্কি তো রয়েছেই।
বালিগঞ্জ উপনির্বাচনে বাবুল মনোমতো ব্যবধানে না-জেতায় তৃণমূলের অন্দরে কিছু ফিসফাস শুরু হয়েছিল। ঠিক হয়েছিল, তাঁকে এ বার আর বালিগঞ্জে টিকিট দেওয়া হবে না। তার বদলে আসানসোল দক্ষিণ আসনে তাঁকে মনোনয়ন দিতে চেয়েছিল দল। একটিই দায়িত্ব— অগ্নিমিত্রা পালকে হারাতে হবে। বাবুল নির্বাচনের কিছু আগে থেকেই সঙ্গীতে বেশি মনোনিবেশ করার কথা বলছিলেন। অর্থাৎ, ঠারেঠোরে বোঝাচ্ছিলেন যে, তিনি ভোটে লড়তে আগ্রহী নন। আবার একই সঙ্গে ঘনিষ্ঠদের বলছিলেন, দিদি এবং অভিষেক তাঁকে ছাড়বেন না। দেখা গেল, মমতা-অভিষেক তাঁকে ছাড়লেন না। আবার ছাড়লেনও। রাজ্য থেকে তাঁকে পাঠানো হল দিল্লিতে। যেখানে তিনি এর আগেও কাজ করেছেন লোকসভার সাংসদ হিসাবে।
খুশি হলেন ইন্দ্রনীল। কারণ, তাঁকে আর মন্ত্রিসভার বৈঠকের আগে-পরে বাবুলকে মিহি টিপ্পনী করতে হবে না। বদলে বাবুলের থেকে চোখা জবাবও শুনতে হবে না। সংসদের কাজে বাবুল একটা বড় সময় দিল্লিতে থাকবেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন কমিটির হয়ে দেশ-বিদেশ সফর তো আছেই। ফলে রাজ্য এবং মমতার মঞ্চে গায়ক হিসাবে ইন্দ্রনীলই রাজত্ব করবেন।
রাজীব কুমার
নবান্ন যখন তাঁকে রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত ডিজি পদে বর্ধিত মেয়াদে রাখল না, তখন সকলেই ভেবেছিলেন, রাজীবের বোধহয় ‘দুর্দিন’ শুরু হল। শাসকদলের ভিতরে-বাইরে কৌশলে এমন সঙ্কেতও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, রাজীব আর মুখ্যমন্ত্রী মমতার ততটা ‘আস্থাভাজন’ নেই। অভিষেকের খাতাতেও তাঁর নম্বর ভাল নয়। সেই ধারণাকে দৃঢ়তর করতে সাহায্য করেছিল প্রকাশ্য বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতার রাজীবকে তিরস্কার এবং যুবভারতীতে মেসিকাণ্ডের পরে ডিজি হিসাবে তাঁকে রাজ্য সরকারের শো কজ় করা। গত ৩১ জানুয়ারি রাজীবের বিদায় সংবর্ধনায় তৃণমূলের অন্দরে খুশি হওয়ার লোকের অভাব ছিল না। তাঁরা ভেবেছিলেন, দক্ষ আইপিএস রাজীবকে এ বার একটি নিঝুম অবসরজীবন কাটাতে হবে। তাঁরা যে কতটা ভ্রান্ত ছিলেন, তা শুক্রবার রাতে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। রাজীব কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করায় একটা ইঙ্গিত তৈরি হয়েছিল। কারণ, ওই মামলা যতটা না মানহানির ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল ‘রাজনৈতিক বার্তা’ পৌঁছে দেওয়ার। প্রথমত, অবসরপ্রাপ্ত এক আইপিএস ব্যক্তিগত উদ্যোগে এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করতে তখনই যাবেন, যখন তাঁর সঙ্গে কোনও না কোনও ‘শক্তি’ থাকবে। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করার অর্থ কেন্দ্রের বিরুদ্ধেই মামলা করা। এতদ্দ্বারা বোঝানো গেল যে, রাজীব কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী এজেন্সিতে অবসরের পরে যোগ দিতে পারেন বলে যে রটনা হচ্ছিল, তার কোনও সারবত্তা নেই। পাশাপাশিই, পুলিশজীবনে রাজীব যে ভাবে মমতার পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাতে অবসরের পরে তাঁর ‘রাজনৈতিক নিরাপত্তা’ প্রয়োজন ছিল।
রাজীবের এই আকস্মিক উত্থানে খুশি হবেন না কুণাল ঘোষ। এর আগে একাধিক বার তিনি রাজীবকে প্রকাশ্যেই আক্রমণ করেছেন। সারদা মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করেছিলেন বিধাননগরের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব। সে ক্ষোভ কুণালের মন থেকে চলে গিয়েছে, এমন খবর নেই। রাজীব ভারপ্রাপ্ত ডিজি হওয়ার পরে কুণাল তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েও সমাজমাধ্যমে ন্যায়ের পাঠ দিয়েছিলেন। রাজীবের রাজ্যসভায় মনোনয়নের খবরের পরে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় কেটে গিয়েছে। কুণালের সমাজমাধ্যম এ বিষয়ে নীরব। বস্তুত, চার জনের মনোনয়ন নিয়েই নীরব। দলের অন্দরে কুণালের নিন্দকেরা বলছেন, বুধবার রাতে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে অভিষেকের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই ঘটনাক্রম তিনি আশা করেননি। অসমর্থিত সূত্রের দাবি, কুণাল নিজেও রাজ্যসভার প্রত্যাশী ছিলেন। যদিও তিনি নিজে বরাবর সে জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন।
মেনকা গুরুস্বামী
সুপ্রিম কোর্টের কৃতী আইনজীবী মেনকা ন্যাশনাল ল স্কুল অফ ইন্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী। তিনি রোড্স স্কলারও ছিলেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ভারত, পাকিস্তান এবং নেপালে সংবিধানবাদ। মেনকা কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিআর অম্বেডকর রিসার্চ স্কলার এবং লেকচারার ছিলেন। শিক্ষকতা করেছেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তৃণমূলের রাজ্যসভার প্রার্থিতালিকায় সকলে রাজীবের নাম সঙ্গত কারণেই সবচেয়ে বড় চমক বলে মনে করছেন। কিন্তু ৫১ বছরের মেনকার মনোনয়ন তার চেয়েও বেশি চমকপ্রদ। প্রথমত, একটি মূলস্রোতের রাজনৈতিক দল মেনকার মতো একজন ঘোষিত সমকামীকে সংসদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এ ঘটনা চমকিত করার মতোই। দ্বিতীয়ত, মেনকা সম্প্রতি এসআইআর মামলায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হয়ে জোরালো সওয়াল করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে বিপক্ষের আইনজীবীর মন্তব্য সরাসরি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় খণ্ডন করেছেন।
মেনকার যা আইনি পড়াশোনার পটভূমিকা এবং দেশের শীর্ষ আদালতে আইনজীবী হিসাবে তাঁর যা কাজ রয়েছে, তা অনেকেরই নেই। মেনকার এই মনোনয়নে তৃণমূলের অপর আইনজীবী-সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের খুব খুশি হওয়ার কথা নয়। এতদিন পর্যন্ত তিনিই ছিলেন তৃণমূলের একমাত্র আইনজীবী-সাংসদ। সুপ্রিম কোর্ট বা কলকাতা হাই কোর্টে তিনিই দল এবং সরকারের মামলা লড়তেন। এ বার দলের অন্দরে দ্বিতীয় আইনজীবী-সাংসদ চলে আসবেন। সুপ্রিম কোর্ট এবং কলকাতা হাই কোর্টে মমতার খাতায় কল্যাণ যে ‘একাধিপত্য’ ধরে রেখেছিলেন, তা খানিকটা খর্ব তো হবেই।