এক দিকে দলের অন্দরের ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রশমন ও পুরপরিষেবা সচল রাখার কড়া নির্দেশ, অন্য দিকে কালীঘাটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এক গুরুত্বপূর্ণ মেয়র পারিষদের অনুপস্থিতি— এই দুইয়ে মিলে তৃণমূলের অন্দরে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার কালীঘাটে মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদদের নিয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকের মূল আলোচ্যসূচি ছিল পুরসভার অভ্যন্তরীণ কাজ। অন্য দিকে, দলের এক নবনির্বাচিত বিধায়কের অনুপস্থিতি এবং বিধানসভায় তাঁর গতিবিধি ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক জল্পনা।
মঙ্গলবারের বৈঠকে মেয়র ফিরহাদ হাকিম-সহ কলকাতা পুরসভার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ মেয়র পারিষদ হাজির ছিলেন। তৃণমূল সূত্রে জানা যাচ্ছে, পুরসভার বর্তমান অন্দরমহল ও দলের রণকৌশল নিয়ে বৈঠকে অত্যন্ত স্পষ্ট ও কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। পুরসভার অন্দরমহলে যে এক ধরনের ‘অচল অবস্থা’ বা টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তা নেতৃত্ব মেনে নিয়েছেন। বিশেষ করে পুরসভার অধিবেশন এবং পুলিশের খাতায় মেয়র পরিষদ বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের নাম ‘বেআইনি ভাবে’ ওঠার মতো বিষয় নিয়ে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছে। বৈঠকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, তৃণমূল একটি ‘লড়াকু পার্টি’ এবং এই লড়াই জারি রাখতে হবে। ক্ষমতার অলিন্দে বা ঠান্ডা ঘরে বসে বড় বড় কথা না বলে, জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি মানুষের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ যে সমস্ত নাগরিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, সবার আগে তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। নেত্রীর বার্তা, দলের ভাল-মন্দ পরে বিচার করা যাবে, কিন্তু এই মুহূর্তে জনপ্রতিনিধিদের মনে রাখতে হবে যে তাঁরা নির্বাচিত এবং তাঁদের সামনে মানুষের ভোটের দায়বদ্ধতা রয়েছে। লড়াই থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে দলের ক্ষতি হবে, আর দলনেত্রী মমতা কোনও অবস্থাতেই হার মানতে রাজি নন। আগামী ১ জুন বা জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকেই এই জনসংযোগ ও পুরপরিষেবার নতুন রূপরেখা কার্যকর হতে চলেছে।
কালীঘাটের এই বৈঠকে যখন পুরসভার ভবিষ্যৎ রণকৌশল ঠিক হচ্ছে, তখন সেখানে গরহাজির ছিলেন মেয়র পারিষদ (শিক্ষা) তথা এন্টালির নবনির্বাচিত বিধায়ক সন্দীপন সাহা। তাঁর এই অনুপস্থিতি নিয়ে দলের অন্দরে যখন গুঞ্জন শুরু হয়, ঠিক তখনই বিধানসভায় এক নাটকীয় চিত্রনাট্য তৈরি হতে দেখা যায়। কালীঘাটে বৈঠক চলাকালীন সন্দীপন বিধানসভায় হাজির হন। তিনি উলুবেড়িয়া পূর্বের তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে স্পিকার রথীন্দ্র বসুর ঘরে যান। তবে রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি শোরগোল ফেলেছে স্পিকারের ঘরে উপস্থিত অন্য ব্যক্তিত্বদের নাম। সেই সময় স্পিকারের ঘরে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপি বিধায়ক শংকর ঘোষ এবং বর্ষীয়ান নেতা তাপস রায়। একই সময়ে কালীঘাটের বৈঠক এড়িয়ে বিরোধী শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে সন্দীপনের স্পিকারের ঘরে যাওয়া নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই নানামুখী প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
তবে বিধানসভার এই গতিবিধি বা সন্দীপনের অনুপস্থিতি নিয়ে কালীঘাটের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা নিজে কোনও উচ্চবাচ্য বা প্রকাশ্য ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। তিনি কলকাতার পুরপরিষেবা স্বাভাবিক রাখা এবং দলের আগামী দিনের রণকৌশল নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখেন। ফিরহাদ-সহ অন্যান্যদের নিয়ে জুনের প্রথম সপ্তাহে যে কর্মসূচি শুরু হচ্ছে, তা কী ভাবে সফল করা যায়, সেই নির্দেশই দেন তিনি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাইরে প্রকাশ না করলেও পুরসভা এবং দলের শৃঙ্খলার প্রশ্নে আগামী দিনে কড়া পদক্ষেপ করতে পারে তৃণমূল।