Advertisement
E-Paper

প্রশান্ত বর্মণকে দেখেই ঠিক করি, কোনও ভাবে ছাড়া যাবে না! জামিন-সংবাদ পেয়ে বিস্মিত সেই ‘নাছোড়’ সাকিল

প্রশান্ত প্রভাবশালী জানতেন বলেই সমাজমাধ্যমে লাইভ করা শুরু করেন সাকিল। কেন? সাকিল জানান, তাঁর মনে হয়েছিল, মানুষকে লাইভ ছবি না-দেখালে প্রভাব খাটিয়ে পালিয়ে যেতে পারেন প্রশান্ত।

সিজার মণ্ডল

শেষ আপডেট: ২৬ মে ২০২৬ ২২:১৪
(বাঁ দিকে) সাকিল আহমেদ। প্রশান্ত বর্মণ (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) সাকিল আহমেদ। প্রশান্ত বর্মণ (ডান দিকে)। ছবি: সংগৃহীত।

পুলিশ অফিসার নন! সুপার হিরোও নন! সাত মাস ধরে ‘ফেরার’ থাকা খুনে অভিযুক্ত অপসারিত বিডিও-কে কার্যত পাকড়াও করেন এক জন সাদামাটা যুবক!

তিনি সাকিল আহমেদ। তাঁর জন্যই নিউ টাউনের ইকো পার্ক থানা এলাকায় পুলিশ গ্রেফতার করতে পেরেছিল প্রশান্তকে। যদিও কয়েক ঘণ্টার মাথায় জামিনও পেয়ে যান অপসারিত বিডিও। আর তাতেই হতবাক সাকিল! তিনি জানান, প্রশান্ত প্রভাবশালী জেনেও এগিয়ে গিয়েছিলেন। শুরু করেছিলেন লাইভ। তবে এত তাড়াতাড়ি তিনি জামিন পেয়ে যাবেন, ভাবতেও পারেননি বলে জানান সাকিল।

বছর তিরিশের সাকিল মুর্শিদাবাদের কান্দির বাসিন্দা। পড়াশোনার জন্য থাকেন নিউটাউনের কাছেই। সোমবার রাতে ১০টা নাগাদ একটি রেস্তরাঁর সামনে অপেক্ষা করছিলেন এক বন্ধুর জন্য। তার পরের ঘটনা সিনেমার মতোই এত দ্রুত এগিয়ে গিয়েছে যে, পরের দিন সন্ধ্যার ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না খোদ সাকিলই। তাঁর কথায়, ‘‘রাস্তার ধারে স্কুটার পার্ক করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ করে এক জন হুমড়ি খেয়ে পড়লেন আমার স্কুটারের উপর। পাশ দিয়ে দ্রুত গতিতে বেরিয়ে গেল একটা কালো চারচাকার গাড়ি।’’ নিমেষে তিনি বুঝতে পারেন, কালো গাড়িটা ওই পথচারীকে ধাক্কা মেরে পালাচ্ছে। আর কিছু না ভেবে স্কুটারে স্টার্ট দিয়ে কালো গাড়িটি ধাওয়া করেন সাকিল।

কপালের জোরই বটে! ১০০ মিটার এগিয়ে সিগন্যালে অন্য গাড়ির পিছনে আটকে যায় সেই কালো গাড়িটা। সাকিল গত রাতের ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘‘আমি দ্রুত কালো জিপগাড়ির সামনে স্কুটারটা রেখে চালকের দিকে এগিয়ে যাই। এগোতেই দেখি চালক তো সেই প্রশান্ত বর্মণ! সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সমাজমাধ্যমের কল্যাণে তাঁর সব কথাই জানি। আর তাঁকে দেখেই ঠিক করলাম কোনও ভাবে ছাড়া যাবে না।’’

প্রশান্ত প্রভাবশালী জানতেন বলেই সমাজমাধ্যমে লাইভ করা শুরু করেন সাকিল। কেন? সাকিল জানান, তাঁর মনে হয়েছিল, মানুষকে লাইভ ছবি না-দেখালে প্রভাব খাটিয়ে পালিয়ে যেতে পারেন প্রশান্ত। লাইভ শুরু করতেই প্রশান্ত গালিগালাজ শুরু করেন বলে অভিযোগ। শুরু হয় হুমকিও। কিন্তু তাতেও দমেননি সাকিল। তিনি প্রশান্তকে গাড়ি থেকে নামতে বলেন। তাঁর ভিডিয়োতেই ধরা পড়েছে।

তত ক্ষণে সামনের মোড়ে থাকা পুলিশকর্মীরাও একে একে পৌঁছে যান ঘটনাস্থলে। সাকিলের অভিযোগ, মত্ত ছিলেন প্রশান্ত। তিনি পুলিশকর্মীদের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করতে থাকেন। প্রায় ২০ মিনিট তর্কাতর্কির পরে পুলিশের গাড়িতে ওঠেন প্রশান্ত। দুর্ঘটনায় আহত মুর্শিবাদাবাদের ধুলিয়ানের বাসিন্দা মোতালেব শেখকে পুলিশের কথামতো রেকজোয়ানি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান তিনি। এর পরে ইকো পার্ক থানায় যান অভিযোগ দায়ের করতে। সেখানে পুলিশের কথামতো অভিযোগ দায়ের করে রাত ২টোর সময় বাড়ি যান সাকিল। তিনি বলেন, ‘‘আমি নিউটাউনে থেকে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমিও প্রশান্তের মতো সরকারি চাকরি করতে চাই। কিন্তু প্রশান্ত হতে চাই না। এই লোকটি একটা দুষ্কৃতী।’’

মঙ্গলবার যখন আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে কথা বলছেন সাকিল, তখনই খবর আসে আদালত থেকে জামিন পেয়ে বাড়ি রওনা দিয়েছেন প্রশান্ত। খবর শুনে রীতিমতো হতবাক সাকিল। তিনি বলেন, ‘‘প্রশান্ত প্রভাবশালী জেনেই এগিয়েছিলাম। আমাকে দেখে নেবেন বলে হুমকিও দিয়েছেন। আমার ছবিও তুলেছেন। তা-ও ভয় পাইনি। আইনের উপর ভরসা করেছি। এত তাড়াতাড়ি প্রশান্ত ছাড়া পেয়ে যাবেন ভাবতে পারিনি।’’

পথসুরক্ষা বিধি ভেঙে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন প্রশান্ত। অভিযোগ, সোমবার রাতে নিউ টাউনের ইকো পার্ক থানা এলাকায় আচমকা প্রশান্তের গাড়ি প্রথমে এক পথচারীকে ধাক্কা মারে। যেখানে ঘটনাটি ঘটে, সেখান থেকে কিছুটা দূরে একটি স্কুটার দাঁড় করানো ছিল। ওই পথচারী ছিটকে গিয়ে ওই স্কুটার আরোহীর গায়ে পড়েন বলে অভিযোগ। ওই ব্যক্তির পায়ে চোট লেগেছে বলে জানা গিয়েছে। স্কুটার আরোহী সাকিলই প্রশান্তের গাড়ি আটকান। পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছোয় পুলিশ।

প্রশান্তের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)-র ২৮১, ১২৫বি এবং মোটর ভেহিকল আইনের ১৮৪, ১৮৫ ধারায় এফআইআর রুজু হয়। বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালানোর অভিযোগে ওই মামলা রুজু হয়েছিল। মঙ্গলবার তাঁকে বারাসত আদালতে হাজির করানো হয়। যখন প্রশান্তকে হাজির করানো হয়, তখন বিচারক নথি চান। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেট অপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু নথি না পৌঁছোনোয় জামিন পেয়ে বাড়ি চলে যান প্রশান্ত।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৯ অক্টোবর নিউটাউন থানার যাত্রাগাছির খালধার থেকে সল্টলেকের দত্তাবাদে স্বর্ণব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যার দেহ উদ্ধার হয়। তাঁকে অপহরণ করে খুন করা হয় বলে অভিযোগ। ওই খুনের ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত প্রশান্ত। বারাসত ও বিধাননগর মহকুমা আদালত থেকে আগাম জামিন পেয়েছিলেন প্রশান্ত বর্মণ। তার বিরোধিতা করে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় বিধাননগর পুলিশ। হাই কোর্ট সেই আগাম জামিনের নির্দেশ খারিজ করে তাঁকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিল। পরে গত ২৩ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টও তাঁকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও এত দিন পুলিশের নাগালের বাইরেই রয়ে গিয়েছিলেন রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও। শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার হলেও জামিন পেয়ে গেলেন তিনি।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy