নদিয়ার কল্যাণীতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠক ছিল মঙ্গলবার। এপিজে আব্দুল কালাম প্রেক্ষাগৃহে উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া ও হুগলি জেলার প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে ওই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তিন জেলার সব বিজেপি সাংসদ ও বিধায়ককে। ডাকা হয়েছিল বিরোধী দল তৃণমূলের কয়েক জন সাংসদ এবং বিধায়ককেও। তাঁদের মধ্যে তৃণমূলের এক সাংসদ এবং ছ’জন বিধায়ক হাজির হয়েছিলেন। ঘটনাচক্রে, তাঁরা সকলেই উত্তর ২৪ পরগনার।
তৃণমূলের সাংসদ-বিধায়কদের সকলকে যে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর বক্তব্যে তার ইঙ্গিত মিলেছে। মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে তাঁরা ‘অনাহুত’ বলে জানিয়েছেন তিন জেলার কয়েক জন তৃণমূল জনপ্রতিনিধিও। আবার কেউ কেউ আমন্ত্রণ পেয়েও কল্যাণীতে যাননি বলে দাবি করেছেন।
বারাসতের প্রবীণ তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। উপস্থিত ছিলেন দেগঙ্গার সদ্যনির্বাচিত তৃণমূল বিধায়ক আনিসুর রহমান বিদেশ, বাদুড়িয়ার বুরহান-উল- মুকদ্দিন (লিটন), স্বরূপনগরের বীণা মণ্ডল, বসিরহাট দক্ষিণের সুরজিৎ মিত্র (বাদল), মিনাখার উষারানি মণ্ডল এবং হাড়োয়ার আব্দুল মতিন। স্বাভাবিক ভাবে কাকলিদের নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে। বিশেষত কাকলিকে নিয়ে। কারণ, বিধানসভা ভোটে ফলপ্রকাশের পরে তৃণমূলের সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতকের পদ থেকে তাঁকে সরানোকে চার দশকের আনুগত্যের ‘পুরস্কার’ বলেছিলেন তিনি। তবে অনেকেই দীর্ঘ ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’র বদল হিসাবেও দেখছেন এই ঘটনাকে। এর আগে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধী জনপ্রতিনিধিদের দেখা যেত না। বিজেপির দাবি, তাদের বিধায়কদের ডাকাই হত না। শুভেন্দু সেই ‘সংস্কৃতি’র বদল ঘটিয়েছেন।
সম্প্রতি উত্তরবঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, এ বার ওই সমস্ত বৈঠকে বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হবে। যদিও কল্যাণীর বৈঠকে বিরোধীদের সকলে আমন্ত্রণ পাননি। মুখ্যমন্ত্রী মঙ্গলবার বলেন, ‘‘আমরা ঠিক করেছিলাম কিছু বিশেষ বিশেষ সাংসদকে আমন্ত্রণ জানাব। বিধায়কদেরও ডাকা হয়েছিল। ওঁরা এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে এক জন বলার সুযোগ পেয়েছেন।’’
শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিনি বৈঠকে আমন্ত্রণ পাননি। কল্যাণ বলেন, ‘‘হুগলির সাংসদদের কি ডাকা হয়েছিল? আমি জানি না। আর ডাকলেও যাওয়ার প্রশ্ন ছিল না। ফ্যাসিবাদী সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আমার বৈঠক করা সাজে না। যখন আমার দলের কর্মীরা আক্রান্ত, তাঁদের জীবিকা আক্রান্ত, তখন গিয়ে আমি বৈঠক করব? বিজেপির সঙ্গে যাঁদের প্রেম আছে তাঁরা করুন।’’
শুধু তিনি নন, হুগলি জেলার তিন জন তৃণমূল সাংসদের কেউই কল্যাণীর বৈঠকে আমন্ত্রণ পাননি বলে কল্যাণের দাবি। হুগলি জেলার আরামবাগের তৃণমূল সাংসদ মিতালী বাগ বলেন, ‘‘আমি প্রশাসনিক বৈঠকের কোনও আমন্ত্রণ পাইনি। তাই যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’’
নদিয়ার কালীগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক আলিফা আহমেদ আবার আমন্ত্রণ প্রাপ্তির কথা জানিয়ে বলেন, ‘‘পূর্ব নির্ধারিত অনুষ্ঠান ছিল। তাই যেতে পারিনি।’’ গরহাজির অন্য বিধায়কদের মধ্যে পলাশিপাড়ার রুকবানুর রহমান বলেন, ‘‘কোরবানি নিয়ে আমার বিধানসভা এলাকায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। বৈঠকে যোগদানের আমন্ত্রণ এসেছিল, কিন্তু দায়িত্ব পেয়েছি, সমস্যা ছেড়ে যেতে পারিনি।’’ মধ্যমগ্রামের বিধায়ক রথীন ঘোষের মন্তব্য, ‘‘পায়ে আঘাত লেগেছে, তাই জেলাশাসকের দফতরে জানিয়েছিলাম, যেতে পারব না।’’ হুগলির চণ্ডীতলার স্বাতী খন্দকারও জানিয়েছেন, পা ভাঙার কারণেই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে যোগ দেননি।
আরও পড়ুন:
আমডাঙার তৃণমূল বিধায়ক কাশেম সিদ্দিকি আবার তাঁর গরহাজিরাকে ‘দলনেত্রীর সিদ্ধান্ত’ বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমি দলনেত্রীকে জিজ্ঞাসা করি, তিনি আমাকে যেতে নিষেধ করেছেন। তাই যাইনি।’’ কামারহাটির মদন মিত্র, ধনেখালির অসীমা পাত্র, চাপড়ার জেবের শেখের মতো মঙ্গলবারের বৈঠকে গরহাজির বিধায়কেরা ফোন ধরেননি। ফলে তাঁরা আমন্ত্রণ পেয়েছেন কি না, স্পষ্ট নয়।
ফোন ধরেননি কৃষ্ণননগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রও। দলীয় সূত্রের খবর, মহুয়া এখন দিল্লিতে রয়েছেন।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে ওই তিন জেলা মিলে তৃণমূলের মোট ৭ জন লোকসভা সাংসদ এবং ১৫ জন বিধায়ক রয়েছেন। হুগলিতে রয়েছেন ৩ সাংসদ এবং ২ জন বিধায়ক। নদিয়ায় ১ জন সাংসদ এবং ৩ জন বিধায়ক। উত্তর ২৪ পরগনায় ৩ জন সাংসদ এবং এবং ১০ বিধায়ক। তৃণমূল সাংসদ হাজি নরুল ইসলামের মৃত্যুর কারণে বসিরহাট লোকসভা আসনটি শূন্য রয়েছে।
বিজেপি সূত্রে খবর, মুখ্যমন্ত্রীর কথাতেই কাকলি-সহ তৃণমূলের প্রতিনিধিদের ডাকা হয়েছে। এখানে কোনও রাজনীতি নেই। একই কথা বলছেন শুভেন্দুর বৈঠকে উপস্থিত তৃণমূল বিধায়কেরাও। বীণার কথায়, ‘‘আমি আমার বিধানসভা এলারকার উন্নয়নের জন্য প্রশাসনিক বৈঠকে এসেছি।’’ হাড়োয়ার বিধায়ক বলেন, ‘‘রাজ্য সরকার ডেকেছে। তাই এসেছি। আগে কী হয়েছে, বলতে পারব না। বিধায়ক হিসাবেই এসেছি।’’ দেগঙ্গার বিধায়ক আনিসুর বলেন, ‘‘আমার বিধানসভা এলাকার অধিকাংশই প্রান্তিক জায়গা। সার্বিক উন্নয়নের জন্য রাজ্য সরকারের সহযোগিতা কাম্য।’’
তবে শুভেন্দুর বৈঠকে কাকলির উপস্থিতি রাজ্য রাজনীতিতে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’। সম্প্রতি কাকলিকে তৃণমূলের সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ওই দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কিন্তু অভিমানি কাকলি সমাজমাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট করেন। তিনি লেখেন, ‘‘৭৬ থেকে পরিচয়, ৮৪-তে পথ চলা শুরু। চার দশকের আনুগত্যের জন্য আজ পুরস্কৃত হলাম।’’ ঘটনাক্রমে রবিবারই বারাসত সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল সভাপতির পদ থেকেও ইস্তফা দিয়েছেন তিনি। ফলে শুভেন্দুর প্রশাসনিক বৈঠকে তাঁর উপস্থিতিকে ইঙ্গিতপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। শুভেন্দুর বৈঠকে যোগদান নিয়ে কাকলি একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রশাসন সবার।” অন্য দিকে, কাকলির চেয়েও শুভেন্দুর প্রশাসনিক বৈঠকে যাঁর উপস্থিতি তৃণমূল নেতৃত্বকে ‘অধিক বিস্মিত’ করেছে, তিনি বিদেশ।