আগের বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা থেকে পরবর্তী বিধানসভাতেই মুখ্যমন্ত্রী। সরাসরি এই রূপান্তর বেনজির! শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে সেই দৃষ্টান্ত তৈরি হতেই রাজ্য বিধানসভার চিত্রটাই পাল্টে গেল! নতুন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এগিয়ে গেলেন তৃণমূল কংগ্রেসের বহু বিধায়ক। দিনের শেষে দু’পক্ষই অবশ্য এই সাক্ষাৎকে ‘সৌজন্য’ আখ্যা দিয়েছেন। পাশাপাশিই, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর মত, প্রাক্তন শাসক দলের বিধায়কেরা এখন ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’ পেয়েছেন!
রাজ্যে গত শাসক-বিরোধী সম্পর্ক ছিল ‘তিক্ত’। সৌজন্য তো দূরের কথা, বরং চরম বিবাদ গড়িয়েছিল বিরোধী দল বিজেপির বিধায়কদের বারবার নিলম্বিত (সাসপেন্ড) করার ঘটনায়। নজিরবিহীন ভাবে পাঁচ বছরে পাঁচ বার নিলম্বিত হয়েছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সেই শুভেন্দুরই প্রথম দিন বিধানসভা প্রবেশের পথ ছিল লাল কার্পেটে মোড়া। ব্যবস্থা ছিল ‘গার্ড অফ অনারে’রও। আর টানা ১৫ বছরের স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় জমানা বদলের পরে কার্যত নিঃশব্দে শপথ নিয়ে গিয়েছেন বিধায়ক হিসেবে।
বিধানসভায় বুধবার ছিল জয়ী প্রার্থীদের শপথ গ্রহণের প্রথম দিন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু, পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ, পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া, অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু, ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ এবং উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক প্রথমে শফথ নিয়েছেন বিধায়ক হিসেবে। তার পরে কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কালিম্পং, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিধায়কদের শপথ পাঠ করিয়েছেন প্রোটেম স্পিকার তাপস রায়। নির্দিষ্ট প্রার্থীদের মধ্যে ৬ জন এ দিন অনুপস্থিত ছিলেন, তাঁরা পরে শপথ নেবেন। বাকি ১১টি জেলার বিধায়কদের শপথ নেওয়ার কথা আজ, বৃহস্পতিবার। স্পিকার নির্বাচন হওয়ার কথা কাল, শুক্রবার।
শপথ গ্রহণের সময় মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগে পর্যন্ত একটানা বিধানসভা কক্ষের ভিতরেই ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বিধানসভা প্রাঙ্গণে ‘গান স্যালুটে’র পরে বিধানসভার সিঁড়িতে প্রণাম করে অধিবেশন কক্ষে ঢোকেন তিনি। সিতাইয়ের তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক সঙ্গীতা রায় বসুনিয়া শপথ গ্রহণের আগে পর্যন্ত বিজেপি বিধায়কদের সঙ্গেই বসে ছিলেন। তাঁকে বেশ কিছুক্ষণ একান্তে শুভেন্দুর সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। পরে অবশ্য সঙ্গীতা জানান, দেরি হয়ে যাওয়ায় তিনি ভুল দরজা দিয়ে ঢুকে পড়েছিলেন! তিনিই তৃণমূল সাংসদ জগদীশ বাসুনিয়ার স্ত্রী ও বিধায়ক কি না, খোঁজ নেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে এর পরেও একের পর এক তৃণমূল বিধায়ককেও একই রকম সৌজন্য দেখাতে দেখা যায়। ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’র বিধায়ক হুমায়ুন কবীর নতুন মুখ্যমন্ত্রীর জন্য মনোহরা নিয়ে এসেছিলেন। আবার তৃণমূল বিধায়ক কানাইয়ালাল আগরওয়ালের সঙ্গে হাত জোড় করে সৌজন্য বিনিময় করেন কালিয়াগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক উৎপল ব্রক্ষচারী। দিলীপ তৃণমূল বিধায়কদের আসনে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কিছুক্ষণ খোশগল্প করেন। বিধানসভা কক্ষ ছেড়ে মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে গেলে শুভেন্দুর সঙ্গে সেখানে দেখা করতে যান মুর্শিদাবাদের তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামান, ইমানি বিশ্বাস এবং নিয়ামত শেখ।
শপথ নিয়েছেন সিপিএমের একমাত্র বিধায়ক মুস্তাফিজুর রহমানও (রানা)। শপথ নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘বিধানসভায় ২৯৪ আসনের মধ্যে বামপন্থী এক জনকে নির্বাচিত করায় দলের পক্ষ থেকে তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এক জন থেকেও একশো জনের কাজ করা যায়। বিধানসভায় বিরোধী আসনে যোগ্য ভূমিকা পালনের সব রকম চেষ্টা করব।’’ পরে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সিপিএমের রাজ্য দফতরে গিয়ে বিমান বসু-সহ দলের নেতাদের সঙ্গেও দেখা করেছেন নবীন বিধায়ক। বিধানসভায় অন্য কাজে এসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে গিয়েছেন সিপিএমের প্রাক্তন বিধায়ক তন্ময় ভট্টাচার্যও।
বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ-মাংস বন্ধ করে দেবে বলে ভোটের আগে ধারাবাহিক প্রচার চালিয়েছিল তৃণমূল। বিধানসভায় শপথ নেওয়ার পরে বিধায়কদের এ দিন উল্টে মাছ-ভাতই খাওয়ানো হয়েছে! শাসক তো বটেই, বিরোধী বিধায়কেরাও এ দিন খুশি মনে সেই মধ্যাহ্নভোজে যোগ দিয়েছিলেন। যদিও কিছু ‘অব্যবস্থা’ও ছিল। সুজাপুরের তৃণমূল বিধায়ক সাবিনা ইয়াসমিনের কথায়, ‘‘শুরুটা খুব ভাল হল। বিরোধী নেতা নির্বাচনের প্রচারে যা যা বলেছিলেন, সেটা তো একটা অংশ। কিন্তু এখন তিনি মুখ্যমন্ত্রী। আশা করব, উনি সকলের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে উঠবেন। আমাদের তরফে ওঁর প্রতি শুভেচ্ছা রইল।’’ বিধানসভায় এসে তৃণমূল পরিষদীয় দলের সচেতক ফিরহাদ (ববি) হাকিমের মন্তব্য, ‘‘জীবন মানেই পরিবর্তন। ব্যক্তি আমি প্রথমে ছেলে, তার পরে স্বামী ও বাবা হয়েছি। বিধানসভাতেও আগে বিরোধী ছিলাম, পরে ১৫ বছর শাসক। এখন আবার বিরোধী আসনে। গণতন্ত্রে মানুষ যা দায়িত্ব দিয়েছেন, পালন করব।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)