তিনি এককালের ডাকসাইটে হিন্দু মহাসভার নেতা। তিনি তৃণমূল সাংসদের পিতাও বটে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভামঞ্চে তাঁর দ্বিতীয় পরিচয়টি শনিবার উল্লেখ করা হয়নি। উল্লেখ করার কথাও ছিল না। কিন্তু ৭৮ বছর আগে মালদহের জন্য তিনি যে ‘ভূমিকা’ নিয়েছিলেন, মালদহের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী শনিবার সে কথা স্মরণ করায় তৃণমূল সাংসদও ‘গর্বিত’।
মালদহের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী মোদীকে শুক্রবার বঙ্গ বিজেপি প্রথমেই যে উপহারটি দিয়েছে, তা হল ফ্রেমে বাঁধানো একটি বিরাট ছবি। ছবিটি শিবেন্দুশেখর রায়ের। প্রাক্ স্বাধীনতা পর্বেই আইনজীবী হিসাবে মালদহ জেলায় খ্যাতি অর্জন করেছিলেন শিবেন্দুশেখর। হিন্দু মহাসভার মালদহ জেলা সম্পাদক ছিলেন তিনি। ঘনিষ্ঠ ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ পর্বে মালদহকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে মুসলিম লিগ যখন অনড়, তখন শ্যামাপ্রসাদের দ্বারস্থ হয়ে নিজের জেলাকে ভারতে রাখার পথ খুঁজে বার করেছিলেন তিনিই। শিবেন্দুশেখরের পুত্র হলেন সুখেন্দুশেখর রায়। রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ।
শনিবার প্রধানমন্ত্রীর হাতে প্রথম উপহার হিসাবে যখন শিবেন্দুশেখরের ছবি তুলে দিচ্ছেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, তখন অনেকেই চমকিত। প্রধানমন্ত্রীকে বিজেপি সংবর্ধনা দিচ্ছে তৃণমূল সাংসদের বাবার ছবি দিয়ে! রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখরও সে দৃশ্য দেখে তখন চমকে গিয়েছিলেন কি না জানা কঠিন। তবে প্রতিক্রিয়ায় তিনি সংযতই থেকেছেন।
শুধু ছবি আদানপ্রদানে সীমাবদ্ধ থাকেনি সুখেন্দুর জনক শিবেন্দুশেখরের স্মৃতিচারণ। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণেও উঠে আসে তাঁর নাম। মোদী ভাষণের শুরুর দিকেই বলেন, ‘‘আমি সর্বপ্রথম মালদহের মহান সুপুত্র শিবেন্দুশেখর রায়কে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাচ্ছি। যাঁর প্রচেষ্টায় মালদহের পরিচয় বেঁচে রয়েছে।’’ মালদহের ‘পরিচয়’ কী ভাবে বাঁচিয়েছিলেন শিবেন্দুশেখর? তাঁর সাংসদ পুত্র জানাচ্ছেন, দেশভাগের সময়ে মালদহের পূর্ব পাকিস্তানভুক্তির সম্ভাবনা যখন প্রবল, তখন শিবেন্দুশেখর উদ্যোগী হয়েছিলেন তা আটকাতে। ‘বেঙ্গল বাউন্ডারি কমিশনের’ (র্যাডক্লিফ কমিশন) কাছে মালদহের ইতিহাস, তৎকালীন পরিস্থিতি এবং জনবিন্যাস সংক্রান্ত বিষয় যুক্তি-সহ তুলে ধরার আর্জি নিয়ে ব্যারিস্টার এনসি চট্টোপাধ্যায়ের (সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাবা) দ্বারস্থ হয়েছিলেন শিবেন্দুশেখর। কিন্তু ব্যারিস্টার চট্টোপাধ্যায় তখন দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকার সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে এমনিতেই কমিশনে দৌড়ঝাঁপ করছেন। তাই মালদহের দায়িত্ব নিতে অপারগতার কথা জানিয়ে দেন। তবে শিবেন্দুশেখর হাল ছাড়েননি। শ্যামাপ্রসাদকে পরিস্থিতি জানান। শ্যামাপ্রসাদ কথা বলেন ব্যারিস্টার চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। শ্যামাপ্রসাদের কথা মতো ব্যারিস্টার চট্টোপাধ্যায় শিবেন্দুশেখরকে বুঝিয়ে দেন যে, কী ভাবে তিনি নিজেই বেঙ্গল বাউন্ডারি কমিশনের কাছে মালদহের ভারতভুক্তি সংক্রান্ত যুক্তি তুলে ধরতে পারবেন। সে কাজে অধ্যাপক বিধুশেখর শাস্ত্রী এবং ইতিহাসবিদ স্যার যদুনাথ সরকারও শিবেন্দুশেখরকে সাহায্য করেছিলেন বলে সুখেন্দুশেখরই জানাচ্ছেন।
আরও পড়ুন:
মালদহের ইতিহাস তথা দেশভাগ নিয়ে স্মৃতিচারণ করলেও প্রধানমন্ত্রীর সভায় তাঁর বাবাকে নিয়ে চর্চার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সুখেন্দুশেখর আবেগে বাঁধ দিয়েছেন। তিনি যে ‘খুশি’, তা গোপন করেননি সুখেন্দু। তবে প্রতিক্রিয়া পরিমিত। তাঁর বক্তব্য, ‘‘৭৮ বছর আগে আমার বাবা যে ভূমিকা মালদহের জন্য নিয়েছিলেন, এখন তা বিস্মৃত। গোটা পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে দিন, মালদহের বর্তমান প্রজন্মও শিবেন্দুশেখর রায়ের সেই ভূমিকার কথা জানেন না। মালদহের মাটিতে দাঁড়িয়ে এত বছর পরে শিবেন্দুশেখর রায়ের সেই ভূমিকার কথা যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, তা হলে তাঁর বংশজেরা তো গর্ব অনুভব করবেনই।’’