শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার সি সুধাকর এবং দার্জিলিঙের সদ্য প্রাক্তন জেলাশাসক মণীশ মিশ্রকে ডেপুটেশনে চেয়ে রাজ্যকে চিঠি দিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। একটি সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর উত্তরবঙ্গ সফর ঘিরে কেন্দ্র এবং রাজ্যের মধ্যে যে ‘বিতর্ক’ শুরু হয়েছে, তার প্রেক্ষিতেই নবান্নে চিঠি পাঠিয়েছে শাহের মন্ত্রক। তবে নবান্নের তরফে কোনও জবাব পাওয়া যায়নি বলে সূত্রের খবর।
প্রসঙ্গত, গত ৭ মার্চ শিলিগুড়ি সফরে এসেছিলেন রাষ্ট্রপতি মুর্মু। অভিযোগ ওঠে, সেই সফরের সময় তাঁর নিরাপত্তা এবং প্রোটোকল যথাযথ ভাবে মানা হয়নি। সূত্রের দাবি, তার পরেই সি সুধাকর এবং তৎকালীন জেলাশাসক মণীশ মিশ্রকে ডেপুটেশনে চেয়ে চিঠি পাঠাল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। রাষ্ট্রপতি দেশের সাংবিধানিক প্রধান হওয়ায় তাঁর নিরাপত্তা বা প্রোটোকল সংক্রান্ত কোনও ত্রুটি সামনে এলে কেন্দ্র সরাসরি পদক্ষেপ করতে পারে। জানা গিয়েছে, এই দুই আধিকারিকই পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের আইপিএস ও আইএএস কর্মকর্তা। তাঁদের ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। ফলে প্রয়োজন হলে কেন্দ্র তাঁদের ডেপুটেশনে ডেকে নিতে পারে। কিন্তু পাঠানো না পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনেকাংশে রাজ্য সরকারের উপর নির্ভর করে। তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার চাইলে মেনে নিতে পারে, না-ও নিতে পারে, অথবা বিকল্প প্রশাসনিক পদক্ষেপ করতে পারে। এ প্রসঙ্গে সি সুধাকর বলেন, ‘‘আমি কিছু জানি না। তাই এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে পারব না।’’ অন্য দিকে, দার্জিলিঙের তৎকালীন জেলাশাসক ফোন ধরেননি। জবাব দেননি হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজেরও।
আবার রাজ্য সরকার চাইলে কেন্দ্রের অনুরোধ মেনে দুই আধিকারিককে ডেপুটেশনে পাঠাতে পারে। এতে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত এড়ানো যায়। সাধারণত যদি বিষয়টি রাষ্ট্রপতির প্রোটোকল ভাঙার মতো সংবেদনশীল হয়, তখন অনেক সময় রাজ্য সমঝোতার পথ বেছে নেয়। অথবা ডেপুটেশনের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানও করতে পারে রাজ্য। সে ক্ষেত্রে রাজ্য যুক্তি দিতে পারে, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। প্রশাসনিক প্রয়োজনের কারণে তাঁদের ছাড়া যাচ্ছে না। অল ইন্ডিয়া সার্ভিসের নিয়ম অনুযায়ী রাজ্যের সম্মতি ছাড়া সাধারণত ডেপুটেশন কার্যকর করা কঠিন।
এ ছাড়া বিকল্প রাস্তা হিসাবে রাজ্য আরও কিছু সময় চাইতে পারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে পরে পাঠানোর কথা জানাতে পারে বা অন্য কোনও আধিকারিককে পাঠানোর প্রস্তাব দিতে পারে। রাজ্য সরকার এটাও বলতে পারে প্রোটোকল ভাঙা হয়েছে কি না তা রাজ্য প্রশাসন নিজেই খতিয়ে দেখবে। প্রয়োজনে বিভাগীয় তদন্ত বা রিপোর্ট তৈরি করে কেন্দ্রকে পাঠাবে।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার আন্তর্জাতিক আদিবাসী কনফারেন্সে যোগ দিতে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন মুর্মু। শিলিগুড়ির বিধাননগরে যেখানে তাঁর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, সেই স্থান পরিবর্তন করা হয়। নিরাপত্তার কারণে বাগডোগরার কাছে গোঁসাইপুরে রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানের বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। এই স্থান পরিবর্তন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি পরে বিধাননগরে পৌঁছে যান এবং সেখান থেকে রাজ্য প্রশাসন ও মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তোপ দাগেন। কেন মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর মন্ত্রিসভার কোনও সদস্য বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে যাননি, সেই প্রশ্নও তোলেন। বিষয়টি নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ভাবে রাষ্ট্রপতির অপমানের অভিযোগ তোলে বিজেপি। রাষ্ট্রপতিকে ‘অসম্মান’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও। এই অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যখ্যা দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। রাষ্ট্রপতির এই সফর সংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সচিবালয় এবং নবান্নের মধ্যে কিছু নথি চালাচালিও প্রকাশ্যে আনেন তিনি। সেই নথি দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাষ্ট্রপতির এই সফরে তাঁকে স্বাগত বা বিদায় জানানোর জন্য তাঁর থাকার কথা ছিল না। প্রশাসনের তরফে শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব, দার্জিলিঙের জেলাশাসক মণীশ মিশ্র এবং শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার সি সুধাকরের থাকার কথা ছিল। বিমানবন্দরে তাঁরা রাষ্ট্রপতিকে স্বাগতও জানান।
এই ‘টানাপড়েন’ শুরু হতেই রাষ্ট্রপতির সফরের ক্রমসূচির খুঁটিনাটি জানতে চেয়ে রাজ্যের কাছে রিপোর্ট তলব করেছিল শাহের মন্ত্রক। রাষ্ট্রপতি পশ্চিমবঙ্গ সফরে প্রোটোকল মানার প্রশ্নে কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, তা রিপোর্টে সবিস্তার কেন্দ্রকে জানায় নবান্ন। এই ‘টানাপড়েনের’ আবহেই এ বার শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার এবং দার্জিলিঙের সদ্য প্রাক্তন জেলাশাসককে ডেপুটেশনে চাইল কেন্দ্র।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবারই দার্জিলিঙের জেলাশাসক বদলের নির্দেশ জারি হয়। দার্জিলিঙের জেলাশাসক করা হয়েছে সুনীল আগরওয়ালকে। আর মণীশকে করা হয়েছে হোম অ্যান্ড হিল অ্যাফেয়ার্স দফতরের বিশেষ সচিব।