সরকারের ফাঁকা স্থায়ী পদে নিয়োগের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ভাবে হাতে রাখার সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে রাজ্য সরকার। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, এ ব্যাপারে একপ্রকার মনস্থির করে ফেলেছে সরকারের শীর্ষমহল। সব ঠিক থাকলে, চলতি সপ্তাহেই সরকারের অধীনস্থ নিয়োগ-কমিশনগুলির সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বৈঠকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। নিয়োগ-দুর্নীতি এবং অনিয়মের অভিযোগ যে ভাবে বিগত তৃণমূল সরকারকে গ্রাস করেছিল, তাতে ভুগতে হয়েছে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীকে, সে দিক থেকে এই পরিকল্পনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি), স্কুল-কলেজ সার্ভিস কমিশন, স্বাস্থ্য-পুলিশ ক্ষেত্রে নিয়োগ-বোর্ড ইত্যাদি রয়েছে পৃথক ভাবে। বিভিন্ন দফতরের অধীনেও নানা পদ্ধতিতে নিয়োগ হয়ে থাকে। অতীতে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিভিন্ন সময়ে কোনও না কোনও নিয়োগ সংক্রান্ত অসঙ্গতির অভিযোগ হয় উঠেছিল, না হয় নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ে মামলা হয়েছিল সরকারের বিরুদ্ধে। উভয় ক্ষেত্রেই সরকারের ভাবমূর্তি ব্যাপক ভাবেধাক্কা খেয়েছিল।
এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের শীর্ষমহল যে পরিকল্পনা করেছে তাতে, সব ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ থাকবে একটি হাতেই। সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেমন খুশি তেমন নিয়োগের বিষয়টিতে রাশ টানতেই একজানলা পদ্ধতির সিদ্ধান্ত হতে পারে শীঘ্রই। সূত্রের দাবি, সোমবার সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলির সঙ্গে বৈঠকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে অন্তত ৫০ হাজার সরকারি ফাঁকা পদে নিয়োগের কথা জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। ভোটের প্রচারেও নিয়মিত ভাবে সরকারি শূন্য পদ পূরণের প্রতিশ্রুতিওদিয়েছিল বিজেপি।
কী ভাবে এই নিয়ন্ত্রণ আনা হবে, তা নিয়ে মূলত তিনটি জল্পনা রয়েছে। এক, সরাসরি সরকারি স্তরে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমেই সব ধরনের নিয়োগ হতে পারে। তাতে ওই কমিশনের ক্ষমতা, বহর, লোকবল আরও বাড়বে। দুই, সরকার পোষিত-অধিগৃহীত স্কুল-কলেজের ক্ষেত্রে অভিন্ন কোনও কমিশনের পরিকল্পনা হতে পারে। কারণ, গ্রান্ট-ইন-এড স্তরে পিএসসি নিয়োগ করে না। আবার পঞ্চায়েত-পুরসভা, স্বশাসিত সংস্থার মতো, সরকার অনুদানভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলির নিয়োগও কোনও অভিন্ন মাধ্যমে করার চেষ্টা করতে পারে সরকার। তিন, যারাই নিয়োগ প্রক্রিয়া চালাক না কেন, অভিন্ন একটি মাধ্যমে গোটা পদ্ধতির উপর নজরদারি এবং যাচাই থাকবে। আগামী শুক্রবার মুখ্যমন্ত্রী পিএসসি-সহ প্রত্যেক নিয়োগ সংস্থাকে নিয়ে বৈঠক করবেন। সেই বৈঠকে প্রত্যেক সংস্থা থেকে মত নেওয়ার পরে রাজ্য সরকার নিজের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবে।
বিগত সরকারের আমলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক— তিনটি স্তরেই নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। একাধিক ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশে বহু মানুষের চাকরি যায়। কিছু বিষয় এখনও আদালতের বিবেচনাধীন। এসএসসি কেলেঙ্কারিতে তৃণমূল সরকারের শিক্ষামন্ত্রীকে পর্যন্ত জেল খাটতে হয়েছে। বিপুল সংখ্যক চাকুরিরতকে নতুন করে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত উৎকণ্ঠা কাটছে না সংশ্লিষ্টদের। পাশাপাশি, পুরসভাগুলিতেও নিয়োগ দুর্নীতি রাজ্য রাজনীতিতে আঁচ ফেলেছে। এই সব দুর্নীতির তদন্ত করছে ইডি-সিবিআই। গ্রেফতার হয়েছেন তৃণমূলের বহু নেতা-কর্মী। নিয়োগ প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মামলা হয়েছে আদালতে। যার ফলে চাকুরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
যদিও এর মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, নিট থেকে শুরু করে একাধিক পরীক্ষা সামলানোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থাগুলির নাজেহাল দশা, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের প্রতিফলন রাজ্যেও দেখা যাবে না তো? প্রশাসনের এক কর্তার মতে, তেমন যাতে না হয়, সে জন্যসব ধরনের সুরক্ষাকবচের ব্যবস্থা রাখার ভাবনা রয়েছে।
নবান্নের অন্দরের বক্তব্য, নতুন সরকার গোড়া থেকেই বিধি বহির্ভূত নিয়োগ-ব্যবস্থা রুখতে রাশ নিজেদের হাতে রাখতে চাইছে। এক কর্তার কথায়, ‘‘অতীতে শিক্ষা-নিয়োগে দুর্নীতির সময়ে বিগত সরকারের মন্ত্রীরা বলতেন, স্কুল সার্ভিস কমিশন স্বশাসিত সংস্থা। অথচ মেঘের আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ চলত, তা এখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। সরকারের নজরদারির বাইরে যাতে কোনও নিয়োগ-প্রক্রিয়া না হয়, তা-ই নিশ্চিত করতে চাইছে নতুন সরকার।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)