Advertisement
E-Paper

কয়েক ঘণ্টাতেই ‘ভারতবিখ্যাত’ নাম-না-জানা দল! সুদীপ, কাকলি, মালাদের নয়া ঠাঁই এনসিপিআই কাদের তৈরি? চালানই বা কারা?

রবিবার সন্ধ্যার পর এনসিপিআই-এর নাম ভেসে ওঠে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দেখা যায় ২০২৩ সালে ত্রিপুরার বিধানসভা নির্বাচনে দু’টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এই দলের প্রার্থীরা। পেয়েছিলেন ৮২২টি ভোট।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ ১৮:০১
এনসিপিআই দলের দুই সদস্য। (বাঁ দিকে) মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে উত্তীয় কুন্ডু। তাঁর স্ত্রী শিউলি কুন্ডু (ডান দিকে)।

এনসিপিআই দলের দুই সদস্য। (বাঁ দিকে) মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে উত্তীয় কুন্ডু। তাঁর স্ত্রী শিউলি কুন্ডু (ডান দিকে)। ছবি: সংগৃহীত।

ত্রিপুরার দু’টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটে লড়ে যে দল মাত্র ৮২২টি ভোট পেয়েছিল, সেই দলেই এখন রয়েছেন ২০ জন সাংসদ। কার্যত কুলগোত্রহীন এই দলের নাম ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই। লোকসভায় তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ রবিবার এই দলের সঙ্গে নিজেদের ব্লককে মিশিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তার পরেই রাতারাতি গোটা দেশের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে এই এনসিপিআই।

রবিবার সন্ধ্যার পর এনসিপিআই-এর নাম ভেসে ওঠে। কিন্তু এমন নামে যে কোনও দল আছে, তা মনে করতে পারছিলেন না কেউই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দেখা যায় ২০২৩ সালে ত্রিপুরার বিধানসভা নির্বাচনে দু’টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এই দলের প্রার্থীরা। পেয়েছিলেন ৮২২টি ভোট। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট ঘেঁটে জানা যায়, ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া নামের একটি দল ২০২৩ সালে আরইউপিপি (রেজ়িস্টার্ড আনরেকগনাইজ়ড পলিটিক্যাল পার্টি) তালিকাভুক্ত হয়। এখনও পর্যন্ত এটি কমিশনের অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল।

হাওড়ায় এনসিপিআই-এর কার্যালয়।

হাওড়ায় এনসিপিআই-এর কার্যালয়। —নিজস্ব চিত্র

রবিবার সন্ধ্যাতেই জানা গিয়েছিল যে, ২০২২ সালে দলটি নথিবদ্ধ হয়। দলটির ঠিকানা হিসাবে দেখানো হয় হাওড়ার সাঁকরাইল থানা এলাকার একটি বাড়িকে। সবুজ রঙে রাঙানো বা়ড়িটির নাম ‘জাগো বিশ্ব’। ঠিকানা সাঁকরাইল থানা এলাকার হাটগাছা গ্রাম। এই বাড়ির মালিক উত্তীয় কুন্ডু এবং‌ তাঁর স্ত্রী শিউলি কুন্ডু। ওই বাড়িতেই একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা এনজিও চালান তাঁরা। উত্তীয় এনসিপিআই-এর ‘সভাপতি’। আর তাঁর স্ত্রী দলের ‘প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট’। শিউলি অবশ্য জানান, তিনি পদ ছেড়ে দিয়েছেন। তবে তৃণমূল থেকে যে সাংসদেরা নতুন দলে আসছেন, তাঁদের স্বাগত জানিয়েছেন শিউলি। এ-ও জানিয়েছেন যে, তাঁদের দল বিজেপির নেতৃত্বাধীন শাসকজোট এনডিএ-র শরিক।

এনসিপিআই-এর ‘ ‘ন্যাশনাল অর্গানাইজ়িং জেনারেল সেক্রেটারি’ পদে রয়েছেন শান্তনু দে। রবিবার তিনি বলেছিলেন, “আমি এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। আজকের এই ঘটনার বিষয় কিছু জানানো হয়নি। যদি জানতাম তা হলে আমি এর বিরোধিতা করতাম। এখনও বিরোধিতা করছি।” সোমবার অবশ্য অবস্থান বদলান তিনি। জানান দলের ‘চাপেই’ তাঁর এই সিদ্ধান্ত বদল। আনন্দবাজার ডট কম-কে তিনি বলেন, “দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যেরা বলল, আমাদের ছোট দল। তাই তাঁরা (তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদেরা) আসতে চাইলে তা ভালই হবে। আমরা এক সঙ্গে এনডিএ-তে থেকে কাজ করব।” নিজের পরিচয় দিয়ে শান্তনু জানান, তিনিই দলের নীতিনির্ধারক। দলের পতাকা তৈরি করা, ত্রিপুরায় প্রচার করা— সব দায়িত্বই পালন করেছেন তিনি।

হাওড়ায় এনসিপিআই-এর কার্যালয়ে ঢোকার দরজায় লেখা রয়েছে উত্তীয় কুন্ডু এবং শিউলি কুন্ডুর নাম।

হাওড়ায় এনসিপিআই-এর কার্যালয়ে ঢোকার দরজায় লেখা রয়েছে উত্তীয় কুন্ডু এবং শিউলি কুন্ডুর নাম। —নিজস্ব চিত্র

বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের যোগদান নিয়ে আপত্তি জানানোয় রবিবার শান্তনুকে নিশানা করেছিলেন উত্তীয়। তিনি বলেছিলেন, “দলে তাঁর (শান্তনু) কার্যকালের যে মেয়াদ ছিল, তা শেষ হয়ে গিয়েছে।” সোমবার শান্তনু অবস্থান বদল করার পর অবশ্য উত্তীয়র বক্তব্য জানা যায়নি। শিউলির দাবি, শান্তনু কেবল ত্রিপুরার নির্বাচনের দায়িত্বে ছিলেন। তার পর দলের আর কোনও পদে ছিলেন না বলেই দাবি তাঁর। এনসিপিআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে দলের পদাধিকারীই জানাবেন বলে জানিয়েছেন শিউলি।

সোমবার এনসিপিআই-এর ঘোষিত কার্যালয়ে গিয়ে অবশ্য উত্তীয়, শিউলি কিংবা শান্তনু— কারও দেখা মেলেনি। এক আবাসিক জানান, রাজনৈতিক বিষয়ে যা বলার উত্তীয় এবং শিউলিই বলবেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায় সেখানকার আবাসিকরা উত্তীয় এবং শিউলিকে যথাক্রমে বাবা এবং মা বলে সম্বোধন করে থাকেন।

সোমবার হাটগাছায় এনসিপিআই-এর কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় লোহার দরজার দুই প্রান্তের এক দিকে উত্তীয়ের নাম লেখা। আর এক দিকে শিউলির নাম লেখা। উত্তীয়ের একাধিক পরিচয়ের কথাও সেখানে উল্লিখিত রয়েছে। উত্তীয় যোগা প্রশিক্ষক, অঙ্কের শিক্ষক। একই সঙ্গে একটি বাংলা সংবাদপত্রের সম্পাদক বলে উল্লেখ করা। শিউলির পরিচয় হল তিনি কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী। আইনের পাশাপাশি তাঁর অঙ্কের ডিগ্রি রয়েছে বলেও বাড়ির দরজায় উল্লেখ করা হয়েছে। দরজার পাশেই কালো ফলকে লেখা বাড়ির নাম ‘জাগো বিশ্ব’।

রবিবার সন্ধ্যার পর কার্যত অস্বিস্তহীন এই দলটিকে ঘিরে আলোচনা শুরু হতেই হাটগাছার দলীয় কার্যালয়ের সামনে বহু মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেন। তবে সেখানে গিয়ে ডাকাডাকি করেও কাউকে পাওয়া যায়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এনসিপিআই-এর কার্যালয়ের সামনে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটের সময় হাওড়ার ঝোড়হাট গ্রাম পঞ্চায়েতের একটি গ্রামসভা আসনে এনসিপিআই প্রার্থী দেওয়ার পর প্রথম বার তাঁরা এই রাজনৈতিক দলের নাম জানতে পারেন। তার পর লোকসভা এবং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় দলটিকে খুব একটা সক্রিয় হতে দেখা যায়নি বলে স্থানীয়দের দাবি।

দলটিকে নিয়ে কৌতূহল তৈরি হতেই রবিবার তাদের তরফে একটি ফেসবুক পেজ খোলা হয়। সেই পেজে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের ছবি দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। অন্য একটি পোস্টে এনসিপিআই-এর তরফে একটি গ্রাফিক পোস্ট করে দাবি করা হয় যে, লোকসভার সাংসদসংখ্যার বিচারে তারাই পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম দল। ওই গ্রাফিকে দেখা যাচ্ছে, এই রাজ্যে বিজেপির ১২ জন লোকসভার সাংসদ রয়েছেন। তৃণমূলের সাংসদসংখ্যা ৮। কংগ্রেসের এক। আর লোকসভায় এনসিপিআই-এর সাংসদসংখ্যা ২০। এই গ্রাফিকের সঙ্গে লেখা হয়, “লোকসভায় ২০টি আসন নিয়ে এনসিপিআই এখন সংসদীয় শক্তির বিচারে পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম শক্তি। জাতীয় স্তরে রাজ্যের কণ্ঠস্বর।” অন্য একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে, তৃণমূলের অনেক কর্মী এনসিপিআই-এর সঙ্গে যুক্ত হতে চাইছেন।

একটি সূত্রের দাবি, এনসিপিআই-এর প্রতিষ্ঠাতাদের বর্তমান ঠিকানা হাওড়া হলেও তাঁদের কেউ কেউ আদতে নদিয়ার বাসিন্দা। নদিয়ায় এই দলের বেশ কয়েক জন সদস্য-সমর্থক রয়েছেন। ওই সূত্রটির এ-ও দাবি যে, এই দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং কর্মীদের একটা বড় অংশ প্রয়াত মুকুল রায়ের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। দলটির সদস্য-সমর্থকদের বড় অংশ আবার মতুয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। গত কয়েকটি নির্বাচনেই মতুয়া ভোট মোটের উপর বিজেপির ঝুলিতেই গিয়েছে।

জল্পনা সত্ত্বেও রবিবার তৃণমূলে থেকে নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করেননি লোকসভার বিদ্রোহী ২০ জন সাংসদ। তাঁরা আশ্রয় নেন নতুন দল এনসিপিআই-এর। মনে করা হচ্ছে যে, বিধানসভায় পরিষদীয় দলের বিদ্রোহ পরবর্তী পরিস্থিতি দেখে ‘সাবধানি’ হয়ে যান লোকসভার বিদ্রোহীরা। লোকসভায় ভাঙন ধরার আগেই তৃণমূল বিধায়কদের মধ্যে বিদ্রোহ প্রকট হয়। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরিষদীয় দলনেতা বেছে নেন বিদ্রোহী বিধায়কেরা। তিনিই এখন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। তৃণমূলের সিংহভাগ বিধায়কের সমর্থনও রয়েছে তাঁর প্রতি। কিন্তু তা নিয়ে আদালতে মামলাও হয়েছে। দল থেকে বহিষ্কৃত কেউ কী ভাবে বিরোধী দলনেতা হতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাই কোর্টে মামলা করেছে তৃণমূল। ওই মামলা এখনও বিচারাধীন। আইনি দিক বিবেচনা করেই বিদ্রোহী সাংসদেরা ‘ঝুঁকি’ এড়িয়ে গেলেন বলে মনে করা হচ্ছে।

TMC Sudip Bandyopadhyay
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy