Advertisement
E-Paper

কিছু বিধি না বদলালে অনিয়ম কিন্তু চলবেই

বৈঠকে ডেকে মুখ্যমন্ত্রীর ধমক কিংবা স্বাস্থ্যকর্তাদের ঘন ঘন খোঁজখবরে না হয় আপাতত দিন কয়েক কাজ হবে। কিন্তু তার পর? ভবিষ্যতেও বেসরকারি হাসপাতালগুলির ‘অনিয়ম’ আটকানো যাবে কী ভাবে? বিধির বাঁধনে না বাঁধলে স্থায়ী সমাধান কি আদৌ সম্ভব?

সোমা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ০৩:২৫
হাসপাতাল কর্তাদের মুখোমুখি মুখ্যমন্ত্রী। বুধবার টাউন হলে রণজিৎ নন্দীর তোলা ছবি।

হাসপাতাল কর্তাদের মুখোমুখি মুখ্যমন্ত্রী। বুধবার টাউন হলে রণজিৎ নন্দীর তোলা ছবি।

বৈঠকে ডেকে মুখ্যমন্ত্রীর ধমক কিংবা স্বাস্থ্যকর্তাদের ঘন ঘন খোঁজখবরে না হয় আপাতত দিন কয়েক কাজ হবে। কিন্তু তার পর? ভবিষ্যতেও বেসরকারি হাসপাতালগুলির ‘অনিয়ম’ আটকানো যাবে কী ভাবে? বিধির বাঁধনে না বাঁধলে স্থায়ী সমাধান কি আদৌ সম্ভব? ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট অ্যাক্টে বর্তমানে যা আছে আর খসড়া সংশোধনীতে যা রাখা হয়েছে, সেটাই কি যথেষ্ট? ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট অ্যাক্ট ২০১০-এর যে সংশোধনী খসড়া তৈরি হয়েছিল ২০১৫ সালে, সেটি এ বার প্রয়োগ হতে চলেছে। পাশাপাশি, বেসরকারি হাসপাতালগুলির রেগুলেটরি কমিশনকেও ওই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তাতে হাসপাতালগুলিকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতাও সরকারের হাতে থাকবে।

কিন্তু চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ, আইনজীবী মহল এবং স্বাস্থ্য দফতরের শীর্ষকর্তারা অনেকেই মনে করছেন, ওই সংশোধনীতে আরও কিছু যোগ করা জরুরি, যাতে বেসরকারি হাসপাতালগুলির একাংশের বাড়তি মুনাফার প্রবণতা এবং রোগীদের নিত্য ভোগান্তি স্থায়ী ভাবে ঠেকানো যায়।

ঠিক কোন ধরনের ঘটনার কথা বলছেন তাঁরা? সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযোগের নজির সামনে এনেছেন স্বাস্থ্য দফতরের কর্তারাই।

সল্টলেকের দু’টি হাসপাতালে একই রকম ঘটনা। একটিতে হার্ট অ্যাটাকের পরে দুপুরে রোগীকে ভর্তি করা হয়েছিল হাসপাতালে। রাত ১০টা পর্যন্ত কোনও কার্ডিওলজিস্ট তাঁকে দেখেননি। ওই সময়ে হাসপাতালের রেসিডেন্ট মেডিক্যাল অফিসারের (যিনি এমবিবিএস নাকি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক— তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে!) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। করা হয় কিছু পরীক্ষানিরীক্ষাও। সেই পরীক্ষার রিপোর্ট বুঝে উঠতে পারেননি সংশ্লিষ্ট আরএমও। রাত ১০টায় যখন কার্ডিওলজিস্টের আসার সময় হয়, তখন আর কিছু করার নেই। অন্য একটি ঘটনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আসেন মধ্যরাতের পরে। ততক্ষণে চিকিৎসা পরিভাষায় হার্ট অ্যাটাকের পরের ‘গোল্ডেন আওয়ারস’ পেরিয়ে গিয়েছে। ওই দু’টি হাসপাতালকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য কোনও বিধি কিন্তু নেই। অথচ ইমার্জেন্সি বিভাগ যখন রয়েছে, হার্ট অ্যাটাকের রোগী যখন ভর্তি হচ্ছেন এবং সেই বাবদ মোটা অঙ্কের বিল ধরানো হচ্ছে, তখন ভর্তির সঙ্গে সঙ্গে বা অল্প কিছু সময়ের মধ্যে কোনও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তো তাঁকে দেখা উচিত। ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট অ্যাক্টে এই বিষয়টি স্পষ্ট করা নেই।

বাইপাসের এক হাসপাতালে এক কিডনি রোগীর বুকের যন্ত্রণা হচ্ছিল। সঙ্গে প্রবল জ্বর। বার বার বলা সত্ত্বেও নার্স তা বুঝতে পারেননি। কারণ উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে আসা ওই নার্স বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি কোনও ভাষাই বোঝেন না। ঘণ্টা কয়েক ওই ভাবে কাটানোর পরে রোগীর যখন নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়, তখন ঘটনাচক্রে মেট্রন এসে হস্তক্ষেপ করেন। কিন্তু এর কিছু পরেই রোগীর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে রোগীর পরিবারের অভিযোগ এখনও ঝুলে রয়েছে স্বাস্থ্য দফতরে। সংশোধিত আইন চালু হলেও তার ভিত্তিতে হাসপাতালকে কড়া শাস্তি দেওয়া যাবে না। তাই এখানেও বদল দরকার, বলছেন কর্তারা।

আইনজীবীরা অনেকেই মনে করছেন, একটি চিকিৎসা কেন্দ্র বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালু করতে গেলে কী ভাবে লাইসেন্স পাওয়া যায়, কী না মানলে লাইসেন্স বাতিল হতে পারে, চিকিৎসাকর্মীদের সাধারণ যোগ্যতা

বা পরীক্ষানিরীক্ষার মান কেমন হওয়া দরকার ইত্যাদি বিষয়গুলি আইনে রয়েছে। কিন্তু পরিষেবার এমন কিছু খুঁটিনাটি দিক রয়েছে, যে গুলি আলাদা ভাবে উল্লেখ না থাকলে কোনও ভাবেই বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে তা মানতে বাধ্য করা যায় না।

ফাঁক ভরাতে

• ইমার্জেন্সিতে রোগী ভর্তির পরেই দেখবেন বিশেষজ্ঞ

• রোগী কী বলছেন, বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে নার্সকে

• কোনও পরিষেবায় বাড়তি টাকা নিলে কারণ জানাক হাসপাতাল

• রোগীর অবস্থা এবং বিল সম্পর্কে বাড়ির লোককে জানাতে হবে

• আইসিইউ/আইটিইউ-র কর্মীদের দরকারি যন্ত্রের ব্যবহার জানতে হবে

• বিল মেটাতে না পারলে রোগী আটকানো চলবে না

* স্বাস্থ্যকর্তা, আইনজীবী, চিকিৎসকদের একাংশের মত

আইনজীবী সঞ্জয় বসু যেমন মনে করেন, ঠিক যে ভাবে ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি ওষুধের নির্দিষ্ট দাম বেঁধে দেয়, কিছু কিছু পরিষেবার খরচও সে ভাবেই নির্দিষ্ট হওয়া উচিত। যদি কেন্দ্রীয় ভাবে না হয়, তা হলে রাজ্যকেই নিজেদের মতো করে করতে হবে। কোনও হাসপাতাল যদি পরিষেবার দাম অন্য একাধিক জায়গার চেয়ে অনেকটাই বাড়িয়ে রাখে, তা হলে কেন বাড়ানো হচ্ছে, তার কারণ দেখাতে হবে তাদের।

রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং হাসপাতালের বিল সম্পর্কে নিয়মিত বাড়ির লোককে জানানো যে বাধ্যতামূলক, সেটাও আইনে নির্দিষ্ট ভাবে উল্লেখ থাকা জরুরি। সঞ্জয়বাবু বলেন, ‘‘বার বার বলা হয়, রোগীর বাড়ির লোককে নাকি হাসপাতালের তরফে সমস্ত খরচের কথা আগাম বুঝিয়‌ে বলা হয়েছে। কিন্তু কী ভাবে বলা হয়েছে, কে বলেছেন, যাঁকে বলা হয়েছে, তিনি সেই ভাষাটা বুঝতে পেরেছেন কি না, সেটার নির্দিষ্ট মাপকাঠি থাকা দরকার।’’ এখানেই শেষ নয়। তাঁর কথায়, ‘‘অনেক সময়েই দেখা যায়, যাঁরা আইসিইউ বা আইটিইউ-এ কাজ করছেন, তাঁরা বহু যন্ত্রের ব্যবহার জানেন না! নিয়মে কোথাও সুস্পষ্ট ভাবে এটা উল্লেখ করা নেই। অথচ এর ওপরে রোগীর বাঁচা-মরা অনেকটাই নির্ভর করে।’’

আরও পড়ুন:মুখ্যমন্ত্রী মমতা রুষ্ট, ‘শরীর ভাল নেই, বুকে ব্যথা হচ্ছে’ মদন মিত্রের

বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে বাগে আনতে ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট অ্যাক্ট-ই এই মুহূর্তে রাজ্যের অন্যতম হাতিয়ার। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বার বার এই আইনের ওপরেই জোর দিচ্ছেন। আপাতত স্থির হয়েছে, এপ্রিল মাসের মধ্যেই ওই আইনের সংশোধনী কার্যকর হয়ে যাবে। বস্তুত স্বাস্থ্যকর্তারা বলছেন, মুখ্যমন্ত্রী চান ২০১৭ সালেই সম্পূর্ণ নবকলেবরে আসুক ওই আইন। দফতরের এক শীর্ষ কর্তা বলেন, ‘‘ইদানিং কোনও রোগীর মৃত্যুর পরে বিল মেটাতে না পারলে মৃতদেহ আটকে রাখার ঘটনা খুব বেড়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার ভার বহন করতে না পেরে অনেকেই সরকারি হাসপাতালে রোগীকে স্থানান্তরিত করতে চান। সে ক্ষেত্রে বিল মেটাতে না পারলে বেসরকারি হাসপাতাল রোগীকে আটকে রাখে। শুক্রবার সঞ্জয় রায়ের ক্ষেত্রেও এটাই হয়েছিল। ভবিষ্যতে এটা আটকাতে চাইলে আইনে তার স্পষ্ট উল্লেখ দরকার।’’ আর্থিক ভাবে অপারগ কোনও পরিবার প্রয়োজনে যাতে কিস্তিতে বকেয়া বিল মেটাতে পারে, তার স্পষ্ট নিয়মও থাকা দরকার বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যকর্তারা।

স্বাস্থ্যকর্তাদের আশঙ্কা, আইনের ফাঁক খুঁজে বার করতে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলি চেষ্টার কসুর করবে না। কারণ তারাও এখন মরিয়া। এক কর্তার কথায়, ‘‘আগে যে লোকটি সাধারণ চুরি করত, সে এখন নানা প্রযুক্তি শিখে অনলাইন হ্যাকিং করে। তাকে ঠেকাতে তো পুলিশকেও প্রযুক্তি শিখতে হবে। এটাও অনেকটা সে রকম। সরকারকে সব রকম ভাবে তৈরি থাকতে হবে।’’

কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা কি করা যাবে? স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথী বলেন, ‘‘সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং সব রকম ভাবে চেষ্টা করছেন। আমরা চেষ্টা করছি, যাতে সব রকম ফাঁক ভরাট করা যায়। আমরা এক চুল গাফিলতির রাস্তাও রাখতে চাই না।’’

সব দিক থেকে কষে বাঁধার কাজ আদৌ কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয়ও আছে। ক্রেতা সুরক্ষা আদালতের আইনজীবী প্রবীর বসুর বক্তব্য, পরিষেবার দাম বেঁধে দেওয়ার কোনও সুযোগ ক্রেতা সুরক্ষা আইনে নেই। ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট আইনেও হয়তো তা রাখা যাবে না। তিনি বলেন, ‘‘একই রকম ভাবে বিল বকেয়া রেখে হাসপাতাল থেকে রোগীকে বার করাকেও আইনি বৈধতা দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ এতে বাঁধ ভেঙে যাবে। বহু ভুল লোক ভুল কারণে এর ব্যবহার করবে। তখন সবচেয়ে সমালোচিত হতে হবে সরকারকেই। তাই এত বড় ঝুঁকি সরকার হয়তো নেবে না।’’

Clinical Establishment Act State Government Nursing Homes
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy