শিয়ালদহ স্টেশনের পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মে এখন আর ঘুগনির গন্ধ নেই। হাওড়া স্টেশনের বাইরেও দেখা যায় না জামাকাপড়ের ঠেলা। কয়েক দিন আগে যেখানে হাজার হাজার যাত্রীর ভিড়ের মধ্যে ছোট ছোট দোকান ঘিরে চলত বেচাকেনা, সেখানে এখন ভাঙা কাঠ, বন্ধ দোকানের কাঠামো।
রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরে স্টেশন চত্বর থেকে ‘অবৈধ’ হকার উচ্ছেদে জোর দিয়েছে প্রশাসন। রেলের দাবি, নিরাপত্তা এবং জরুরি পরিষেবার সুবিধায় এই অভিযান। কয়েক দশক ধরে ব্যবসা করে আসা বহু মানুষের প্রশ্ন, পুনর্বাসনহীন উচ্ছেদের পরে তাঁদের বিকল্প কী? নতুন সরকার গঠনের পরে এত দ্রুত রেল অভিযান শুরু করা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক মহলে।
এরই মধ্যে হাওড়া স্টেশন সংলগ্ন ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র রোড এলাকার হকারদের অনিশ্চিত জীবনে সামান্য স্বস্তি দিল উচ্ছেদের নোটিসে কলকাতা হাই কোর্টের অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ। শুক্রবার, বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের নির্দেশ, ৩০ জুন পর্যন্ত উচ্ছেদ করা যাবে না। হকারদের আবেদন বিবেচনা করবেন পূর্ব রেলের বিভাগীয় অধিকর্তা (ডিআরএম)।
যা শুনে হকার সংগঠনের দাবি, এই আলোচনাটাই তো দরকার। সেটারই সুযোগ মেলেনি এ বার। অথচ ১৯৮২, ১৯৯৫ এবং ২০০২ সালে উচ্ছেদ অভিযানের সময়ে আন্দোলন ও আলোচনা চলেছিল।
হকারদের দাবি, শিয়ালদহ স্টেশনে ৬ মে মাইকে উচ্ছেদের ঘোষণা করা হয়। ১৫ মে-র রাত পর্যন্ত স্বাভাবিক বেচাকেনার পরে আচমকাই শাটার নামিয়ে একসঙ্গে বন্ধ করা হয় দোকান। হকারদের অভিযোগ, মালপত্র সরিয়ে নেওয়ার সময়ও দেওয়া হয়নি। এখন দোকানহীন হকারেরা প্রতিদিন শিয়ালদহ স্টেশন চত্বরে জড়ো হচ্ছেন। ভবিষ্যৎ চিন্তা, সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ও বিকল্প জায়গার খোঁজে কাটছে সময়।
শিয়ালদহের পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ৪০ বছর ধরে ঝালমুড়ির দোকান চালাতেন রঞ্জনা ঘোড়ুই। তিনি বলেন, “এই আয়েই পুরো সংসার চলে। এখন কী ভাবে চলবে বুঝতে পারছি না।” দুশ্চিন্তায় শিয়ালদহ উত্তর শাখার প্ল্যাটফর্ম চত্বরে জল-লেবুর শরবতের দোকানদার হাবরার বিশ্বনাথ সাহা। এখন সেই জায়গা ফাঁকা। তাঁর বক্তব্য, “আগে যদি অন্য ব্যবস্থা করা হত, তা হলে সমস্যা কিছুটা কম হত। এখন রোজের খরচ চালানোই কঠিন।”
হকার সংগঠনের গোপাল ঘোষ উচ্ছেদ হওয়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তাঁর কথায়, “অধিকাংশই দীর্ঘদিনের ছোট ব্যবসায়ী। প্রশাসন ভেন্ডিং জ়োন বা লাইসেন্স ব্যবস্থার কথা ভাবতে পারত। উচ্ছেদ করে স্থায়ী সমাধান হয় না।”
একই ছবি হাওড়া স্টেশন চত্বরেও। স্টেশনের বাইরে ফুটপাতে ২৫ বছরের জামাকাপড়ের ঠেলা ছিল তারক দাসের। তাঁর অভিযোগ, “বুলডোজ়ার দিয়ে দোকানগুলো গুঁড়িয়ে দিল। সরকার তার কাজ করুক। কিন্তু আমাদের কথাও ভাবা দরকার।” মাথায় হাত ২০ বছরের পুরনো হকার, পরিবারের একমাত্র রোজগেরে নরেশ চৌধুরীর।
রেলের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে স্টেশন চত্বরের বড় অংশ অনুমোদনহীন হকারের দখলে চলে গিয়েছিল। শিয়ালদহ ও হাওড়ার মতো বড় প্ল্যাটফর্ম ও সাবওয়ের বড় অংশে অস্থায়ী দোকান বেড়ে যাওয়ায় ভিড় নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠছিল বলে দাবি প্রশাসনের একাংশের। এর ফলে যাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিষেবা দিতে সমস্যা হচ্ছিল।
এ দিকে উচ্ছেদের পরেও অনেক হকার সীমিত পরিসরে ব্যবসা চালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে পুলিশি হস্তক্ষেপে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)