Advertisement
E-Paper

ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রকে মারধরের অভিযোগ

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়াকে খুন করার মতলবে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধরের অভিযোগে গ্রেফতার হলেন একই কলেজের পাঁচ ছাত্র। অভিযোগ রয়েছে আরও তিন জনের বিরুদ্ধে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৩:০২
হলদিয়া মহকুমা হাসপাতালে আহত ছাত্র অঙ্কিত কুমারের সঙ্গে দেখা করলেন তমলুকের সাংসদ শুভেন্দু অধিকারী। — নিজস্ব চিত্র

হলদিয়া মহকুমা হাসপাতালে আহত ছাত্র অঙ্কিত কুমারের সঙ্গে দেখা করলেন তমলুকের সাংসদ শুভেন্দু অধিকারী। — নিজস্ব চিত্র

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়াকে খুন করার মতলবে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধরের অভিযোগে গ্রেফতার হলেন একই কলেজের পাঁচ ছাত্র। অভিযোগ রয়েছে আরও তিন জনের বিরুদ্ধে। আক্রান্ত এবং অভিযুক্তেরা হলদিয়ার সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ‘সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ প্লাস্টিকস্ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’ (সিপেট)-র পড়ুয়া।

অঙ্কিত কুমার নামে অভিযোগকারী ছাত্রের দাবি, প্রথম বর্ষের এক সহপাঠীর দাদার বিরুদ্ধে তিনি আগে র‌্যাগিংয়ের অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। অভিযোগের ভিত্তিতে শাস্তিও হয়। তার বদলা নিতে এই হামলা। তবে জেলা পুলিশের এক কর্তা জানান, ঠিক কী কারণে হামলা হয়েছে, তা নিয়ে তাঁরা এখনই নিশ্চিত হতে পারছেন না।

হলদিয়া আদালতে হাজির করানো হলে এ দিন বিচারক ধৃতদের চার দিন পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন। পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার অলোক রাজোরিয়া বলেন, ‘‘ছেলেটির বাবাও (বিহার পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর) পুলিশকে ফোন করেছিলেন। পাঁচ জনকে ধরা হয়েছে। বাকিদের খোঁজ চলছে।’’

বিহারের বাসিন্দা অঙ্কিত প্লাস্টিক টেকনোলজিতে ডিপ্লোমা পড়ছেন। মাস দু’য়েক আগে তৃতীয় বর্ষের তিন ছাত্রের বিরুদ্ধে র‌্যাগিংয়ের অভিযোগ এনেছিলেন তিনি। এঁদের মধ্যে এক জনের ভাই অঙ্কিতের সহপাঠী। অঙ্কিতের দাবি, শুক্রবার সকালে ওই সহপাঠী বিনা প্ররোচনায় তাঁকে একপ্রস্ত মারধর করে। পরে সন্ধ্যায় আরও কয়েকজন সহপাঠী এবং ‘সিনিয়র’কে নিয়ে সে দ্বিতীয় দফায় হামলা করে হস্টেলের ঘরে। অভিযোগ, সে সময় মারধর করে কেড়ে নেওয়া হয় অঙ্কিতের ল্যাপটপ। মুখে-চোখে কাপড় বেঁধে তাঁকে জোর করে একটি গাড়িতে তোলা হয়।

পুলিশকে অঙ্কিত জানিয়েছেন, মাঝপথে কিছুক্ষণের জন্য গাড়ি থামে। হামলাকারীদের কথা শুনে তিনি বোঝেন, তারা বিয়ার কিনেছে। সেই বিয়ারের বোতল-ভাঙা টুকরো এবং ব্লেড দিয়ে তাঁর শরীরের নানা অংশে আঘাত করা হয়। জখম অবস্থায় কোলাঘাটের কাছে তাঁকে গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয়। রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ মেচেদা থেকে অঙ্কিতকে উদ্ধার করে হলদিয়া হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ।

হাসপাতালে গিয়ে এ দিন দেখা গেল, বাঁ হাতে চোটের চিহ্ন রয়েছে অঙ্কিতের। বছর উনিশের ছাত্রটির দাবি, ‘‘ওরা যখন বিয়ার কিনতে নেমেছিল, তখন পকেটের মোবাইল হাতড়ে-হাতড়ে এক সহপাঠীকে ফোন করতে পেরেছিলাম। আর ওরা যেখানে ফেলে দিয়েছিল, সেখান থেকে হেঁটে একটা হোটেলে যাই। ওখানকার মালিকই পুলিশে খবর দেন।’’ খবর পেয়ে অঙ্কিতের হস্টেল সুপারও পুলিশে অভিযোগ জানান। পরে অঙ্কিতের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ আট জনের বিরুদ্ধে খুনের জন্য অপহরণের মামলা রুজু করে। অভিযুক্তদের মধ্যে ছ’জন প্রথম বর্ষের, বাকিরা তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।

তবে পুলিশ সূত্রের দাবি, তদন্ত নেমে তাদের কানে এসেছে ‘হামলা’র অন্য ‘ব্যাখ্যা’ও। অঙ্কিতের একাধিক সহপাঠী, হস্টেলের আবাসিকদের অনেকে পুলিশকে জানিয়েছেন, একটি মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে অঙ্কিতের সঙ্গে তাঁর সহপাঠীর বিবাদের সূত্রপাত। সেই সুবাদেই সহপাঠীর দাদা ও তাঁর বন্ধুদের (একই কলেজের তৃতীয় বর্যের পড়ুয়া) সঙ্গে বচসা হয়েছিল অঙ্কিতের। এর পরেই কেন্দ্রীয় সরকারের অ্যান্টি র‌্যাগিং হেল্পলাইনে ফোন করে অভিযোগ জানান অঙ্কিত। তারা জানায় কলেজ কর্তৃপক্ষকে। কলেজের অ্যান্টি র‌্যাগিং কমিটির কাছেও লিখিত অভিযোগ জানান অঙ্কিত। তার ভিত্তিতে তৃতীয় বর্ষের অভিযুক্ত তিন পড়ুয়াকে সাসপেন্ড করা হয়। সে সময় র‌্যাগিংয়ের প্রমাণ মিলেছিল বলে দাবি কলেজ কর্তৃপক্ষের।

পুলিশকে অঙ্কিত জানিয়েছেন, দাদা শাস্তির মুখে পড়ায় ওই সহপাঠীই বন্ধুদের নিয়ে ছক কষে তাঁকে অপহরণ করেছিল। মেয়েটির সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে তিনি মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন। তবে অঙ্কিতের বয়ানের কয়েকটি অংশ ধন্দে ফেলেছে পুলিশকে। প্রথমত, শুক্রবার সন্ধ্যায় যে সময় (সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা) ওই ছাত্রকে হস্টেল থেকে জোর করে চোখ বেঁধে গাড়িতে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ, তখন হস্টেলে অন্য আবাসিকেরাও ছিলেন। গেটে ছিলেন নিরাপত্তারক্ষীরা। তার পরেও কী ভাবে বিষয়টি সকলের নজর এড়িয়ে গেল, সে প্রশ্ন থাকছে।

অঙ্কিতের অন্য দাবিগুলিও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয় বলে মনে করেছে পুলিশের একাংশ। গাড়িতে মুখ-চোখ বাঁধা অবস্থায় কী ভাবে তিনি মোবাইল থেকে বন্ধুকে ফোন করলেন, চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়ার পরেও তাঁর শরীরের অন্যত্র ততটা জখম হয়নি কেন জানতে চাওয়া হলে অঙ্কিতের জবাব, ‘‘এ নিয়ে আমি কোনও কথা বলব না।’’

হস্টেলের আবাসিকদের একাংশ আবার পুলিশ এবং ‘আনন্দবাজার’কে অন্য কথা বলছেন। তাঁদের দাবি, ওই আট জনের সঙ্গে শুক্রবার সন্ধ্যায় স্বেচ্ছায় গিয়েছিলেন অঙ্কিত। জোরাজুরির প্রশ্নই ছিল না। তা হলে এখন কেন এমন অভিযোগ করবেন অঙ্কিত? এ আবার ওই ছাত্রেরা বলছেন, ‘‘মদ, বচসা, বাবা পুলিশের লোক— এর বেশি বলার নেই।’’

কলেজ কর্তৃপক্ষ অবশ্য অঙ্কিতের অভিযোগকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। প্রতিষ্ঠানের চিফ ম্যানেজার (প্রজেক্ট) দেবাশিস ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘এটা বিক্ষিপ্ত ঘটনা। তবে যেহেতু ওই ছাত্র আগে এক বার র‌্যাগিংয়ের অভিযোগ করেছিলেন, তাই আমরা ফের অ্যান্টি র‌্যাগিং কমিটির সঙ্গে আলোচনা করব।’’

অঙ্কিতের সঙ্গে দেখা করতে এ দিন হলদিয়া হাসপাতালে যান তমলুকের তৃণমূল সাংসদ শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘‘যা-ই হয়ে থাক, দুঃখজনক ঘটনা। এটা প্রত্যাশিত নয়।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy