পুলিশ সাজার শখই পুলিশে ধরাল যুবককে।
চেহারা অনুযায়ী শখটাও পেয়েছিল বটে। ছ’ফুটের কাছাকাছি উচ্চতা। ইংরেজিতে চোস্ত। রকম সকম দেখে ভয়-ভক্তি হবেই।
এমন চেহারা নিয়ে পুলিশ হওয়ার শখ তার ছোট থেকে। কিন্তু হলে কী হবে, নানা কারণে পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। তাই পুলিশের ভেক ধরেই স্বপ্নপূরণের পথ খুঁজে নিয়েছে দেগঙ্গার ঝাঁপার বাসিন্দা বছর তিরিশের যুবক। আসল নাম, রবিউল ইসলাম। ঝুঁকির কাজ করতে গিয়ে পাবলিকের হাতে ধোলাই খেয়েছে। আন্দাজ করা যায়। প্রতারণার দায়ে হাজতবাসও হয়েছে। বছর তিনেক আগে বারাসত আদালতের ভিতরে ঢুকে ধরা পড়ে সে। পায়ের জুতো দেখে পুলিশের সন্দেহ হওয়ায় সে বার ফেঁসে গিয়েছিল রবিউল। বছর খানেক আগে শাসনে গোলমাল ঠেকানোর নাম করে পুলিশের বেশে ঢুকে ধরা পড়ে। মঙ্গলবার বিকেলে তৃতীয়বারের জন্য ধরা পড়েছে।
প্রতিবারই যাঁর নাম করে পুলিশ সেজে মোটরবাইক নিয়ে কখনও স্রেফ রোয়াব দেখিয়ে, কখনও তোলাবাজি করে বেরিয়েছে রবিউল, বর্তমানে হাড়োয়া থানার সেই ওসি মনিরুল ইসলামের চেহারার সঙ্গে তার মিল বিস্তর। এই কাকতালীয় সাদৃশ্য, আর পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন— দুইয়ের বিপজ্জনক মিশেলে রবিউল দিন দিন নিজেকে অপ্রতিরোধ্য ভাবতে শুরু করেছিল। কী ভাবে ধরা পড়ল সে?
ঘটনার শুরু মাস দু’য়েক আগে। দেগঙ্গার কার্তিকপুর বাজারের পোশাক ব্যবসায়ী মতিয়ার রহমানের কাছে কনস্টেবলের পোশাকে হাজির হয়ে এক যুবক জানায়, হাড়োয়া থানার বড়বাবু আসবেন ‘শপিং’ করতে। শুনে তো টুল ছেড়ে তড়াক করে লাফিয়ে পড়ার জোগাড় মতিয়ারের। হাঁকডাক শুরু করে দেন, ‘‘ওরে ঠান্ডা, গরম কিছু এনে রাখ। স্যারের কী মেজাজ-মর্জি তো জানা নেই!’’
দোহারা চেহারার সেই ‘স্যার’ সে বার বেশ কিছু জামাকাপড় কিনে চলে যান। মাসখানেক আগে ফের দোকানে কেনাকাটা করতে এসে বেগুনি শার্টের বুকে ‘মনিরুল ইসলাম, ওসি হাড়োয়া থানা’ লেখা ব্যাজ দেখে বিনয়ে ঝুঁকে পড়েছিলেন দোকানি। সেই ‘স্যার’ই যখন মনিরুলের ছেলে মিজারুল রহমানকে হাড়োয়া থানার কনস্টেবল পদে চাকরি করে দেবেন বললেন, তখন হাতে চাঁদ পেয়েছিলেন মতিয়ার।
দেগঙ্গা থানায় করা অভিযোগে মিজারুল জানান, চাকরি পাওয়ার আশায় ৪০ হাজার টাকা দিয়ে দেন বাবা। কিন্তু তারপরেই পাখি হাওয়া!
মঙ্গলবার ব্যক্তিগত কাজে বারাসতে এসে মিজানুর দেখেন, মোটরবাইক দাঁড় করিয়ে হেলমেট মাথায় সিগারেট ফুঁকছেন সেই ‘স্যার’। মিজানুরকে দেখে মোটরবাইক নিয়ে টাকি রোড ধরে ধাঁ ‘স্যার’। পিছু নেন মিজানুর। দেগঙ্গায় পড়শিদের ফোনে খবর দেন তিনি। তাঁরাই কার্তিকপুর বাজারের কাছে পথ আটকান ‘স্যার’-এর। তখনও দাপট কমেনি রবিউলের। সন্দেহ গাঢ় হওয়ায় তাঁকে আটকে দেগঙ্গার এক পুলিশ কর্মীকে ডাকা হয়। তিনি জানিয়ে দেন, আসল মিজানুরের উচ্চতা ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি। তাঁর থেকে ইঞ্চি কয়েক খাটো এই ব্যক্তি। এরপরে জনতা আর নিজেদের পদ্ধতিতে ‘উচিত শিক্ষা’ দিতে দেরি করেনি রবিউলকে।
মনিরুল ইসলাম গত কয়েক বছরে যখন যে থানায় কর্মরত ছিলেন, সেখানেই ভেক ধরে দাপিয়ে বেরিয়েছে রবিউল। সব শুনে মনিরুল নাকি লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছেন, এ কে নিয়ে কী যে করি! আর তিনবার ধরা পড়ে কী বলছে রবিউল? ধোলাই খেয়ে সে অবশ্য কথা বলার অবস্থায় নেই।
মনোবিদ গৌতম সাহার মত, চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে এমন পথ বেছে নিয়ে থাকতে পারেন ওই যুবক। এটা এক ধরনের মনোরোগ। চিকিৎসা হওয়া উচিত।