Advertisement
E-Paper

কী হবে না ভেবে জাপটে ধরি ছেলেটাকে

কালো জ্যাকেট পরা ছেলেটাকে অনেক ক্ষণ ধরেই ঘোরাফেরা করতে দেখেছি। অফিস বাড়িটার সামনে একটি সাদা রঙের বড় গাড়ি দাঁড়ানো ছিল। গাড়িতে আরও কয়েকজন বসে ছিল। সকলকেই যুবক বলা যায়।

সুলেখা বৈদ্য (বন্ধন ব্যাঙ্কের গ্রাহক)

শেষ আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০১৫ ০২:৫৩
ব্যাঙ্ক ডাকাতির ঘটনায় ধৃতেরা। মঙ্গলবার তোলা নিজস্ব চিত্র।

ব্যাঙ্ক ডাকাতির ঘটনায় ধৃতেরা। মঙ্গলবার তোলা নিজস্ব চিত্র।

কালো জ্যাকেট পরা ছেলেটাকে অনেক ক্ষণ ধরেই ঘোরাফেরা করতে দেখেছি। অফিস বাড়িটার সামনে একটি সাদা রঙের বড় গাড়ি দাঁড়ানো ছিল। গাড়িতে আরও কয়েকজন বসে ছিল। সকলকেই যুবক বলা যায়। জ্যাকেট পরা ছেলেটাও মাঝেমধ্যে গাড়িতে গিয়ে বসছিল, আবার নেমেও আসছিল। খানিকটা অস্থির ছিল যেন। ভেবেছিলাম, আমাদের মতো ওরাও বোধ হয় ঋণের টাকা নিতেই এসেছে। ভাবতে পারিনি যে আমরা যে টাকা নেওয়ার জন্য সকাল থেকে বসে আছি, সেটাই লুঠ করার মতলব নিয়ে সকাল থেকে আমাদের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে আছে। আমার মতো অনেকেই এ দিন সকাল সকাল শক্তিগড়ের ব্যাঙ্কের শাখা অফিসে চলে এসেছিলেন। সবাই অপেক্ষা করছিলাম, কখন টাকা বিলি শুরু হবে। ব্যাঙ্ক থেকে বলেছিল, হেড অফিস থেকে ‘ম্যাডাম’ ফিরে এলেই টাকা দেওয়া হবে। নিজেদের মধ্যে গল্প করেই ঘণ্টাখানেক কেটে যায়।

সাড়ে বারোটা নাগাদ সরস্বতী (সরকার) ম্যাডাম এবং রিঙ্কু (মণ্ডল) ম্যাডাম দু’জনে একটি স্কুটি চেপে অফিসে আসে। অফিস মানে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা তিনতলা বাড়ি। নীচতলা এবং দোতলায় ব্যাঙ্কের কাজকর্ম হয়। বাড়ির সামনে দরজা থাকলেও সেটি বন্ধ থাকে। প্যাসেজ দিয়ে পিছনের দিকের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকতে হয়। সামনে পাঁচিল ঘেরা জায়গায় আমরা গ্রাহকরা বসি, গল্প করি। ম্যাডামরা স্কুটিটা আমাদের পাশে রেখেই, সিটের নীচ থেকে একটা নীল রঙের ব্যাগ বের করে প্যাসেজের দিকে এগিয়ে যান। তখন দেখি সেই কালো জ্যাকেট পড়া ছেলেটা ম্যাডামদের পেছনে দৌড়ে গেল। গাড়িটা থেকে নেমে আরও তিন-চারজন দ্রুত ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎই ‘ডাকাত-ডাকাত’ বলে ম্যাডামদের চিৎকার শুনতে পাই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখেছি তিন জন দৌড়ে বেরিয়ে গাড়িটায় উঠে পড়ল। তখনও ভিতরে চিৎকার হচ্ছে। ম্যাডামের গলা থেকে শুনতে পাচ্ছি, ‘সব টাকা নিয়ে নিল।’ আতঙ্কিত হয়ে আমিও প্যাসেজের দিকে এগোতে যাব তখনই দেখি কালো জ্যাকেট পরা ছেলেটা দৌড়ে বেরিয়ে আসছে, ওর হাতে সেই নীল ব্যাগটা। যেটা ম্যাডামদের স্কুটির ডিকি থেকে বের হয়েছিল। ততক্ষণে বুঝে গিয়েছি, আমাদের জন্য ওই ব্যাগেই হেড অফিস থেকে টাকা এসেছে। সেটি নিয়ে পালাচ্ছে আমার সামনে এসে পড়া ছেলেটা।


কী ভাবে দুষ্কৃতীদের হাত থেকে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নিলেন তা দেখাচ্ছেন সুলেখাদেবী।

Advertisement

কী হবে তা ভাবার সময় পাইনি, আমাদের টাকা নিয়ে পালাচ্ছে ভেবেই দুষ্কৃতীকে জাপটে ধরি। এমনটা হবে বোধহয় ছেলেটা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেনি, কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল। ততক্ষণে পেছন থেকে মঞ্জু (পাল দেব) আর কল্পনাও (মণ্ডল) এসে ছেলেটার জ্যাকেট খামচে ধরেছে। ও তখন নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ওর জ্যাকেটও ছিঁড়ে যায়। আমরা তিন জনে মিলে ধরেছিলাম, তাই সহজে পেরে ওঠেনি। প্রায় এক মিনিট ধস্তাধস্তিতে কেটে যাওয়ার পরে অন্য মহিলারাও চলে এসে ছেলেটাকে ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। হঠাৎই খুব জোরে হাত পা ছোড়ায় আমরা কয়েকজন ভারসাম্য না রাখতে পেরে সরে যাই। তখন ছেলেটার পথ আগলে দাঁড়ায় আরেকজন (সাগর রায়)। পরে জেনেছি, উনি এক গ্রাহকের স্বামী। ছেলেটা কোমর থেকে একটা রিভলভার বের করে ওঁর দিকে তাক করে। সাগরবাবুর হাতেও মারে। কিন্তু ততক্ষণে ছেলেটার হাত থেকে টাকার ব্যাগ পড়ে গিয়েছে। কল্পনা গিয়ে টাকার ব্যাগটা তুলে নেয়। ছেলেটার অবশ্য তখন ব্যাগের দিকে নজর ছিল না। কোনও মতে হাত পা ছুঁড়ে গাড়িতে গিয়ে ওঠে। গাড়িটাও চলে যায়।

শুনলাম, ব্যাগে নাকি ৫ লক্ষ টাকা ছিল। আমি ঘর-সংসার করি। খরচ বাঁচিয়ে টাকা জমাই। কারণ, আমার স্বামী রঙের কাজ করে। টাকা জমিয়ে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছি। চেয়েছিলাম, সেই টাকা দিয়ে একটা রঙের দোকান করার পরিকল্পনা আছে। রঙের দোকান হয়ে গেলে আমাদের অবস্থাও ফিরে যাবে। সেই টাকা চোখের সামনে দিয়ে কেউ ছিনিয়ে নিয়ে চলে যাবে, এটা মানতে পারিনি। তবে এখন অবশ্য একটু ভয় ভয় লাগছে।

ছবি: বিশ্বরূপ বসাক।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy