আলোচনা ছিল পাচার রুখতে পথ খোঁজা নিয়ে। সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা, শিশু ও সমাজ কল্যাণ দফতরের সচিব রোশনী সেন তুলে ধরতে চাইলেন ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের সাফল্য। দাবি করলেন, রাজ্যের এই প্রকল্প মেয়েদের পড়াশোনায় আকৃষ্ট করতে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এবং সাফল্যের সঙ্গে কমাতে পেরেছে পাচারের সংখ্যা।
কিন্তু রোশনী যে মঞ্চ থেকে এই বক্তব্য রাখলেন, মার্কিন কনস্যুলেট ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শক্তি বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই আলোচনাচক্রে এসে অন্যরা জানান পৃথক তথ্য। যা থেকে প্রশ্ন উঠল, ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প কি পুরোপুরি বিয়ের নামে পাচার রোধ করতে পেরেছে? যারা এই প্রকল্পের আওতায় আসছে না, তাদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে রাজ্য সরকার, রয়ে গেল সেই প্রশ্নও।
জাতীয় ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) দেওয়া তথ্য অনুসারে, মেয়ে পাচারে এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ এক নম্বরে। আলোচনাচক্রের পাশাপাশি ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সেই প্রসঙ্গও উল্লেখ করলেন কোনও কোনও সমাজকর্মী। ‘কন্যাশ্রী’ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খুবই প্রিয় প্রকল্প। এই প্রকল্পে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রীদের মাসিক ভাতা দেওয়া হয়। রোশনী এ দিন এই প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে জানান, নাবালিকা মেয়েদের জোর করে বিয়ে দেওয়া পাচারেরই ঘটনা। কোথাও বিয়ে দিতে গিয়ে পাচারকারীর খপ্পরে পড়ছেন বাবা-মা। কোথাও টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বিয়ে করে নিয়ে যাচ্ছে পাত্রপক্ষ। কিন্তু গত আড়াই বছরে ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের মাধ্যমে কম বয়সে বিয়ের নামে পাচার অনেকটাই রোখা সম্ভব হয়েছে।
এই প্রকল্পে কত মেয়ে উপকৃত হচ্ছে, সেই প্রসঙ্গে রোশনী জানান, কন্যাশ্রীর মাসিক অনুদান প্রকল্পে প্রায় ২৮ লক্ষের উপর ও এককালীন অনুদানে প্রায় ৭ লক্ষের উপর মেয়ে লাভবান হচ্ছে, পড়াশোনা চালাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি সরকারের ‘মুক্তির আলো’ ও ‘স্বাবলম্বন’ প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া মেয়েদের পুনর্বাসন দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি। এতে মেয়েরা সাবলম্বী হতে পারবে। ফলে যত দিন যাবে আরও বেশি হারে পাচারের সংখ্যা।
কিন্তু সেই কন্যাশ্রী প্রকল্প কি পুরোপুরি বিয়ের নামে পাচার রোধ করতে পেরেছে? রোশনী সেনের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রশ্নই তুলে দিলেন দিল্লি মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন স্বাতী মালিওয়াল। গাজিয়াবাদের হাসপাতাল থেকে উদ্ধার হওয়া মগরাহাটের বাসিন্দা আয়েশার (নাম পরিবর্তিত) উদাহরণ টেনে তিনি জানান, আয়েশাকে দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে অন্য এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেয় এক পাচারকারী। সে সময় আয়েশা ছিল দশম শ্রেণির ছাত্রী। অর্থাৎ, ‘কন্যাশ্রী’-র আওতায়। ফলে একটি সরকারি প্রকল্প দিয়ে পাচারের মতো সংগঠিত অপরাধ রোখা কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। তিনি জানান, পাচারকারীরা প্রলোভন দেখিয়ে যে পরিমাণ টাকা মেয়েদের পরিবারকে দেখায়, সামান্য মাসিক ভাতা দিয়ে তার মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব।
স্বাতীদেবীর কথায় সহমত পোষণ করেছেন এই কনক্লেভে অংশগ্রহণকারী এক সমাজকর্মী। তিনি আরও জানান, অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার আগেও মেয়েদের পাচারের ঘটনা ঘটছে। অর্থাৎ, কন্যাশ্রী-র আওতায় আসার আগেই পাচার হয়ে যাচ্ছে মেয়ে। এই সূত্রে তিনি সদ্য ২৪ ঘণ্টা আগে মালদহের চাঁচলে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির তিনটি মেয়েকে অপহরণের চেষ্টার উদাহরণ দিয়েছেন।
দিল্লির মহিলা কমিশন সূত্রের খবর, জি বি রোডে এখন কম বয়সের মেয়েদের চাহিদা বেড়েছে। এখন জি বি রোড থেকে মেয়েদের নিয়মিত পাচার করে দেওয়া হচ্ছে সৌদি আরব, আফ্রিকার মতো দেশে। আর সেখানে কম বয়সীদের যথেষ্ট কদর। এ কথা স্বীকার করে খোদ সিআইডি-র এক পুলিশকর্তা জানাচ্ছেন, পাচারের সংখ্যা যে কমেনি, তার প্রমাণ গত তিন মাসে তিনি জি বি রোড এলাকা থেকে সাতটি মেয়েকে উদ্ধার করেছেন।
কোনও একটি প্রকল্প এবং কোনও একটি সংস্থা বা সংগঠনের পক্ষে যে পাচার রোখা সম্ভব নয়, তা স্বীকার করেছেন খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সহসচিব রজনীশ কোয়েত্রা এবং উত্তর প্রদেশের স্বরাষ্ট্রসচিব কমল সাক্সেনা। কমলের বক্তব্য, সংগঠিত এই অপরাধ রুখতে গেলে সিবিআইয়ের মতো একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা গঠন করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গের মতো ঝাড়খণ্ডেও পাচারের পরিমাণ উদ্বেগজনক। তারা কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাচার রোধে। প্রথমত, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে পাচার সংক্রান্ত বিষয়টি নিচু ক্লাসের পাঠ্যক্রমে যোগ করছে। দ্বিতীয়ত, যে সংস্থাগুলি মেয়েদের চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়, তাদের উপরে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। তৃতীয়ত, মহিলা থানার সংখ্যা বাড়ানো হবে বলেও জানালেন সে রাজ্যের প্রাক্তন পুলিশ কর্তা পিএম নায়ার।
আলোচনাচক্রের জন্য শিলিগুড়িকে বাছাইয়ের পিছনে যে এই এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান বড় কারণ, তা স্পষ্ট করে দিলেন মার্কিন কনসাল-জেনারেল ক্রেগ হল। তাঁর কথায়, শিলিগুড়ি বর্তমানে এ রাজ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর। এর কাছে রয়েছে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল সীমান্ত। বাংলাদেশ এবং নেপাল থেকে পাচারের জন্য শিলিগড়ি বরাবরই একটি ‘ট্রানজিট’ পয়েন্ট। তাই এই এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধিই এমন আলোচনাচক্রের অন্যতম লক্ষ্য।
এই আলোচনাচক্র কতটা ফল দেবে? শক্তি বাহিনীর দাবি, একটি ছাতার তলায় সরকারি আমলা, বেসরকারি-সরকারি সংস্থাকে এনে সমস্যাগুলিকে বারবার তুলে ধরলে সচেতনতা অনেকটাই বেড়ে যায়। এখান থেকে যে সব সিদ্ধান্ত উঠে আসবে, তা কাজে লাগালে ফল না হওয়ার কারণ নেই।