Advertisement
E-Paper

খুচরো জমিয়ে শৌচাগার চাইলেন ভিক্ষাজীবী

এক টাকা, দু’টাকা, পাঁচ টাকার অজস্র কয়েন। সামান্য কিছু দশ-বিশ টাকার নোট। মলিন গামছার গিঁট খুলে সেই টাকা তিনি রাখছিলেন টেবিলের উপরে। সাতসকালে এমন খুচরো আপদ দেখে রীতিমতো রেগে গিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের বন্যেশ্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য খাইরুল আলম।

বিমান হাজরা

শেষ আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০১৫ ০০:৪৩
বাড়ির দাওয়ায় বসে হাসিবুর। ছবি: অর্কপ্রভ চট্টোপাধ্যায়

বাড়ির দাওয়ায় বসে হাসিবুর। ছবি: অর্কপ্রভ চট্টোপাধ্যায়

এক টাকা, দু’টাকা, পাঁচ টাকার অজস্র কয়েন। সামান্য কিছু দশ-বিশ টাকার নোট। মলিন গামছার গিঁট খুলে সেই টাকা তিনি রাখছিলেন টেবিলের উপরে। সাতসকালে এমন খুচরো আপদ দেখে রীতিমতো রেগে গিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের বন্যেশ্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য খাইরুল আলম। কিঞ্চিৎ মেজাজ হারিয়ে তিনি বলে ফেলেছিলেন, ‘‘আমি কি ভিক্ষা করতে বসেছি নাকি?’’

টেবিলের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি বেশ ঘাবড়ে গিয়ে কাঁচুমাচু মুখে বলেন, ‘‘ন’বছর ধরে ভিক্ষে করে এই ৩২০০ টাকা জমিয়েছি। বাড়িতে একটা শৌচাগারের ব্যবস্থা করে দাও ভাই।’’ পঞ্চায়েত সদস্যের বাড়ি লাগোয়া অফিস ঘরের ভিড়টা ততক্ষণে হামলে পড়েছে বছর পঁয়তাল্লিশের ওই প্রতিবন্ধীর উপরে।

হাসিবুর রহমান। সাকিন বাবুরগ্রাম। থানা সাগরদিঘি। এলাকার বেশিরভাগ মানুষ অবশ্য তাঁকে তোতা নামেই চেনেন। দু’চোখ অন্ধ। বাঁ হাত নেই। দুই ছেলেমেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে টানাটানির সংসার। নিজে ভিক্ষে করেন। স্ত্রী বিড়ি বাঁধেন। মেয়ে শেখদিঘি হাই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়া। বাবাকে নিয়ে ভিক্ষেয় বেরোতে হয় বলে স্কুলে ইতি টানতে হয়েছে ছেলেকে। বাবাকে সঙ্গে নিয়ে গত বৃহস্পতিবারে শৌচাগারের জন্য টাকা জমা দিতে এসেছিল বছর চোদ্দোর ওই কিশোর।

Advertisement

হাসিবুরের কথা শোনার পরে আর দেরি করেননি তৃণমূলের সদস্য খাইরুল। সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার টেনে তাঁকে বসিয়েছেন। হাসিবুরের সঞ্চয় করা সেই খুচরোর স্তূপ জমাও নিয়েছেন। খাইরুল কথা দিয়েছেন, নির্মল মিশন অভিযানে সবথেকে আগে হাসিবুরের বাড়িতেই শৌচাগার করে দেওয়া হবে।

মুর্শিদাবাদ জুড়ে এখন মিশন নির্মল বাংলা কর্মসূচি চলছে। প্রশাসনের লক্ষ্য ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ১০৬ টি গ্রাম পঞ্চায়েতে মোট দেড় লক্ষ শৌচাগার নির্মাণ করা। শৌচাগার নির্মাণের ক্ষেত্রে উপভোক্তাকে দিতে হবে ৩২০০ টাকা। বাকি দশ হাজার টাকা দেবে রাজ্য সরকার। পঞ্চায়েতের সদস্যরা নিজেদের এলাকায় শিবির করে সেই টাকাও জমা নিচ্ছেন। বন্যেশ্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় শৌচাগার নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে যে সংস্থা তার অন্যতম কর্তা মহিউল ইসলাম জানান, এই এলাকায় বহু লোককে বুঝিয়েও যেখানে রাজি করানো যাচ্ছে না সেখানে হাসিবুরের এই ঘটনা দৃষ্টান্ত তো বটেই।

সেই বারো বছর বয়সে খেলতে খেলতে পড়ে থাকা কৌটোয় লাথি মেরেছিলেন হাসিবুর। বুঝতে পারেননি আসলে সেটা ছিল বোমা। ওই দুর্ঘটনার পরে দু’চোখের দৃষ্টি চলে যায়। হাতের ক্ষত থেকে গ্যাংগ্রিন হয়ে কনুইয়ের নীচ থেকে বাদ যায় বাঁ হাত। সরকারি খাতায় আশি শতাংশ প্রতিবন্ধী হলেও কোনও সাহায্য পান না হাসিবুর। হাসতে হাসতেই বলেন, ‘‘আমাকে বোধহয় সরকারের খুব বড়লোক বলে মনে হয়। তাই বহুবার প্রশাসনের দোরে দোরে ঘুরেও বিপিএল কার্ড জোটেনি। মেলেনি বাড়ি তৈরির সাহায্যটুকু।’’

কোনওরকমে দিন চলে গেলেও হাসিবুরের সবথেকে বড় সমস্যা শৌচাগারের। বাড়ির অন্য সদস্যরা মাঠেঘাটে গেলেও তাঁর ওই শরীর নিয়ে বাইরে যাওয়াটা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। বিপাকে ফেলে চোখ দু’টো। হাসিবুর বলেন, ‘‘লজ্জার মাথা খেয়ে বাইরে শৌচকর্ম করতে বড্ড শরম লাগে।’’ বাড়িতে মাটি খুঁড়ে একটা ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন। কিন্তু সেটা এতটাই অস্বাস্থ্যকর যে আর ব্যবহারের অবস্থায় নেই। ঠিক এমন সময়ে মিশন নির্মল বাংলার কথা কানে আসে হাসিবুরের। আর কিছু না ভেবে তিলতিল করে জমানো ৩২০০ টাকা তিনি জমা দিয়ে এসেছেন শৌচাগারের জন্য।

হাসিবুরের এমন কীর্তি দেখে প্রত্যন্ত ওই গ্রামে এখন শৌচাগারের জন্য টাকা জমা দেওয়ার ধুম পড়ে গিয়েছে। মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক ওয়াই রত্নাকর রাও বলেন, ‘‘হাসিবুরের এই পদক্ষেপ জেলায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তাঁর এই সদিচ্ছার কথা আমরা মিশন নির্মল বাংলায় সকলের কাছ তুলে ধরব। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই তাঁর বাড়িতে শৌচাগারও করে দেওয়া হবে।’’

বন্যেশ্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান তৃণমূলের সহিনা বিবির আশ্বাস, ‘‘হাসিবুর যাতে সরকারি সাহায্য পান তার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে সুপারিশ করব।’’ বাড়ির দাওয়ায় বসে হাসিবুর অবশ্য বলছেন, ‘‘এ সব কথা তো সেই কবে থেকে শুনছি। আগে তো শৌচাগারটা হোক!’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy